সুদীপ্ত সেনের মন্তব্যে
বেকায়দায় তৃণমূল

নিজস্ব প্রতিনিধি   ১৫ই সেপ্টেম্বর , ২০১৮

কলকাতা, ১৪ই সেপ্টেম্বর— ঝুলি থেকে ফের বেরিয়ে এল বিড়াল!

প্রায় শীতঘুমে চলে যাওয়া সারদাকাণ্ডে সি বি আই তদন্ত গত এক মাসে নতুন করে গা ঝাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করেছে। তারই মধ্যে ফের সারদাকাণ্ডে শাসকদলের মাথাদের ইঙ্গিত করে সুদীপ্ত সেনের মন্তব্য নতুন করে সামনে নিয়ে এলো চিট ফান্ডের সঙ্গে তৃণমূলের ঘনিষ্ঠতাকে। সাংবাদিকদের সামনে জেলবন্দি সুদীপ্ত সেনের মন্তব্যকে গুরুত্ব দিচ্ছে সি বি আই’ও। যদিও কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার এক আধিকারিকের কথায়, ইতিমধ্যে লিখিত বয়ানেও সুদীপ্ত সেন ইঙ্গিত দিয়েছেন কীভাবে সারদাকাণ্ডকে সাজানো হয়, যারা মদত দিয়েছেন তারা কীভাবে মাথা উঁচু করে বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তাহলে সেই দায় তো সি বি আই’র ওপরেও বর্তায়? গোয়েন্দা সংস্থার দাবি, তদন্ত এখনও শেষ হয়নি। চূড়ান্ত চার্জশিটও দায়ের হয়নি।

সারদা কর্ণধার প্রতারক সুদীপ্ত সেন বৃহস্পতিবার বারাসত আদালতে একটি মামলায় হাজিরা দিতে এসে সাংবাদিকদের কাছে বলেছিলেন, ‘আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে আমি প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু টাকা ফেরত না-দেওয়ার জন্য আমার উপরে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। যাঁরা সেই সময় এমন চাপ দিয়েছিলেন, তাঁদের সকলেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন।’

সারদাকণ্ডের তদন্তের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়েই সেই সকল ব্যক্তির হদিশ পেয়েছিল সি বি আই যারা টাকা ফেরতে শুধু বাধাই দেয়নি এমনকি সুদীপ্ত সেনকে পালাতেও সাহায্য করেছিল। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে সেই তদন্ত আর গতি পায়নি। একদা তৃণমূলের দুনম্বর ক্ষমতাশীল ব্যক্তি, বর্তমানে বি জে পি নেতা মুকুল রায়কে জেরার পরেই সেই তদন্তের গতি থমকে যায়। মুকুল রায়ও আর দ্বিতীয়বার তলব পাননি সারদাকাণ্ডে। যদিও কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থারই দাবি ছিল, খোদ দলের নির্দেশেই মুকুল রায়ের সঙ্গেই কলকাতা ছেড়ে পালানোর আগে নিজাম প্যালেসে বৈঠকে বসেছিলেন সুদীপ্ত সেন। সারদাকাণ্ড ফাঁস হওয়ার পরে সর্বস্ব হারানো, প্রতারিত আমানতকারীরা যখন মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবন ও তৃণমূল কার্যালয়ে বিক্ষোভ দেখায় সে সময় মুকুল রায়ই তাঁদের সঙ্গে দেখা করে বিষয়টি মেটানোর আশ্বাস দিয়েছিলেন। এমনকি মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গেও যে চ্যানেল তৈরি ও পর্যটনের লগ্নির বিষয়ে সুদীপ্ত সেন বৈঠক করেছিলেন সেকথাও সাংবাদিকদের সামনেই জানিয়েছিলেন মুকুল রায়।

তাহলে একদিকে বর্তমান বি জে পি-র নেতৃত্ব অন্যদিকে শাসক তৃণমূলের শীর্ষস্তরের সিংহভাগ নেতা, নেত্রী- সুদীপ্ত সেনের মন্তব্যের ইঙ্গিত তাঁদের দিকেই বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহলও। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সি বি আই এই সমীকরণেই কি তদন্তের অগ্রগতিতে অস্বস্তিতে? উঠছে প্রশ্ন। ডেলো থেকে দিল্লি এবং কলকাতার দুটি স্থানে, একাধিকবার সারদা কর্তার সঙ্গে কেন মিটিং করতে হয়েছে তৎকালীন তৃণমূল নেতা মুকুল রায়কে? সারদা ঘনিষ্ঠতার আরও বেশ কিছু তথ্য এমনকি আসিফ খানকে জেরা করেও মিলেছে বলে জানা গেছে। সারদার অর্থ অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া থেকে ‘ব্যবসার মসৃণ পথ’ তৈরি করা এমনকি ‘এই মুহূর্তে টাকা ফেরতের প্রয়োজন নেই, পরে দেখা যাবে’—এই পরামর্শও মিলেছে তৃণমূলের শীর্ষস্তর থেকেও।

সুদীপ্ত সেনের মন্তব্য স্বাভাবিকভাবেই তাই আতঙ্ক ছড়িয়েছে শাসক শিবিরেও। সারদাকাণ্ডে এই মুহূর্তে সুদীপ্ত সেন ও দেবযানী মুখার্জি ছাড়া কেউ জেলে নেই। সকলেই জামিন পেয়েছেন। সারদাকর্তার ক্ষোভের ইঙ্গিত কি সেদিকেই? প্রতারিত আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে চাইলেও কে বা কারা তাহলে সেই টাকা ফেরত দিতে বাধা দিল? কলকাতা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় কলকাতা থেকেই শাসকদলের কোনও নেতারা যোগাযোগ রাখছিলেন? কেন আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে বাধা দেওয়া হলো? উঠছে একাধিক প্রশ্ন। এমনকি তদন্তে গোয়েন্দা সংস্থা জানতে পারে সুদীপ্ত সেন ফেরার হওয়ার আগে বিরাট অঙ্কের টাকাও রেখে আসে শাসকদলের নির্দিষ্ট একটি মহলের কাছে। সি বি আই জেরাতেও সে কথা জানান সুদীপ্ত সেন। জেলে থাকার সময়তেই সারদার বিরাট পরিমাণ সম্পত্তি লুট হচ্ছে এই অভিযোগও সি বি আই-র কাছে ইতিমধ্যেই জানিয়েছেন সুদীপ্ত সেন।

এই প্রসঙ্গেই কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার এক আধিকারিকের কথায়, সোনমার্গের হোটেল থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল সুদীপ্ত সেন ও দেবযানী মুখার্জিকে। তার প্রায় এক বছর পরে আমরা সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের তদন্তের দায়িত্বভার পাই। মাঝের ঐ একবছরের তদন্তে পুলিশের কাছে সুদীপ্ত সেন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছিলেন। কিছু নথিও তুলে দেয়। যার বেশিরভাগ আমরা আজও হাতে পাইনি।

ফলে সারদাকাণ্ডের বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের তদন্ত তৃণমূল এবং বি জে পি দুই শাসকদলেই টান পড়বে সেই শঙ্কাতেই কি থমকে সি বি আই তদন্ত? রাজনৈতিক মহলে এমন প্রশ্নও উঠতে শুরু করেছে।

এদিকে এর মাঝেই শুক্রবার দুপুর সাড়ে বারোটা থেকে টানা কয়েকঘণ্টা জেরার মুখে পড়েন তৃণমূল ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী শিবাজী পাঁজা। এদিন সল্টলেকে সি জি ও কমপ্লেক্সে হাজিরা দেন এই ব্যবসায়ী। দিল্লিতে একটি ব্যাঙ্কের সঙ্গে আর্থিক প্রতারণার মামলায় চলতি বছরেই মুখ্যমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী শিবাজী পাঁজাকে গ্রেপ্তার করেছিল সি বি আই। পরে জামিনও পান। এদিন তাঁকে মূলত সারদাকাণ্ডে টাকা পাচারের বিষয়ে জেরা করা হয়। সারদার বিপুল পরিমাণ টাকা পাচারের তদন্তে বারেবারে এই ব্যবসায়ীর নাম উঠে আসে।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement