ছাত্র খুনিদের ক্ষমা নেই

  ২৫শে সেপ্টেম্বর , ২০১৮

এরাজ্যে শিক্ষাক্ষেত্রে যে নৈরাজ্য আর বর্বরতা চলছে, তার সর্বশেষ নজির উত্তর দিনাজপুর জেলার ইসলামপুরে দাড়িভিট বিদ্যালয়ে। শিক্ষক নিয়োগকে কেন্দ্র করে প্রবল ছাত্র বিক্ষোভ দমন করতে গিয়ে মমতা ব্যানার্জির পুলিশ বেপরোয়া গুলি চালিয়ে খুন করেছে দুজন ছাত্রকে। গুলিবিদ্ধ আরও কয়েকজন ছাত্র মারা না গেলেও, হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছে। ছাত্রদের দাবি যদি যুক্তিসংগত হয় এবং সেই দাবির প্রতি যদি অভিভাবকদের সমর্থন থাকে, এমনকি স্থানীয় জনসাধারণেরও পূর্ণ সমর্থন থাকে, তাহলে সেই বিক্ষোভ জোরালো হওয়াই স্বাভাবিক। বিক্ষোভ প্রতিবাদ যত জোরালো ও তীব্রই হোক না কেন, মনে রাখতে হবে সেটা ছাত্রদের বিক্ষোভ। এরা বয়সে যেমন ছোট, তেমনি সংগত কারণেই আবেগপ্রবণ। এই বয়সের ছাত্রছাত্রীরা হঠাৎ যেমন উত্তেজিত হয়, তেমনি শান্তও হয়ে যায়। আইন-শৃঙ্খলা তথা শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করা যে পুলিশের প্রধান দায়িত্ব, তাদের এই মনস্তত্ত্বটা সর্বাগ্রে জানা প্রয়োজন। যদি তা জানা না থাকে তবে তাদের পুলিশ হবার কোন যোগ্যতাই নেই। দুর্ভাগ্য হলেও এরাজ্যে এমন অপদার্থ দলদাসরাই পুলিশের উর্দি পরে শাসকদলের সেবায় নিয়োজিত। গুলি চালানোর আগে একথাটাও ভাবা দরকার ছিল যে, বিক্ষোভকারীরা দাগী আসামী বা দুষ্কৃতী নয়, তারা ছাত্রছাত্রী। তারা যত উত্তেজিতই হোক না কেন, বড়জোর দু-একটা টেবিল-চেয়ার উলটে দিতে পারে, তার বেশি কিছু নয়। ন্যূনতম যোগ্যতা থাকলে যে-কোনও পুলিশ অফিসারের পক্ষেই এই পরিস্থিতি সহজে মোকাবিলা করা যেত। তেমনি যে পুলিশ গুলি চালিয়েছে বা গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছে, তাদের এই ন্যূনতম শিক্ষাটাও নেই যে একান্তই যদি গুলি চালাতে হয় তবে সন্তানসম ছাত্রছাত্রীদের মেরে ফেলার জন্য বুকে গুলি নয়, জখম করার জন্য পায়ে গুলি করতে হয়। আস‍‌লে শাসকদলের দলদাসত্ব যখন সার্বিকভাবে গ্রাস করে, তখন পুলিশের বিবেকবোধ তো দূরের কথা, ন্যূনতম কর্তব্যবোধটুকুও লোপ পেয়ে যায়। এরাজ্যের পুলিশের সেটাই হয়েছে। যে পুলিশ গুলি করেছে বা নির্দেশ দিয়েছে, তারা নিশ্চয়ই দুটি ছাত্রকে খুন করে অনুশোচিত নয়, বরং পুলিশমন্ত্রীর কাছে তাদের নাম্বার বৃদ্ধির আনন্দে উল্লসিত।

ছাত্ররা তো অন্যায় কিছু করেনি। তাদের বক্তব্য, স্কুলে অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের শিক্ষক নেই। ফলে তাদের সেই সেই ক্লাস হচ্ছে না। সেইসব জরুরি বিষয়ের শিক্ষক নিয়োগ না করে সরকার উর্দু শিক্ষক নিয়োগ করেছে যে বিষয়ে কার্যত কোনও ছাত্রই নেই। ছাত্র-অভিভাবক-গ্রামবাসীরা অপ্রয়োজনীয় বিষয়ের শিক্ষকের বদলে প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগের দাবি করেছে এবং উর্দু শিক্ষককে কাজে যোগদানে বাধা দিয়েছে। প্রশ্ন এখানে অগ্রাধিকারের বিষয়ের বদলে অনাগ্রাধিকারের বিষয়ের শিক্ষক নিয়োগে সরকার এত বেপরোয়া কেন? শিক্ষক নিয়োগের উদ্দেশ্য কি বৃহত্তর ছাত্রস্বার্থ, না শাসক নেতার ঘনিষ্ঠকে চাকরি পাইয়ে দেওয়া? ঘটনা তো এমন নয় যে, রাজ্যে অগ্রাধিকারের বিষয়ে শিক্ষক মিলছে না। শাসকদলের নেতা-মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠকে চাকরি দেবার জন্য বিদ্যালয়ে এই অরাজকতা সৃষ্টি করা হয়েছে সচেতনভাবে। যোগদানে বাধা পেয়ে যখন নতুন শিক্ষক ফিরে যান, তখন আসরে নামেন মন্ত্রী, বিধায়ক ও তাদের বাহিনী। পরদিনই মন্ত্রী হাজির হন স্কুলে দলবল নিয়ে। হুমকি দেওয়া হয় বিক্ষোভকারীদের। অতঃপর বিপুল পুলিশ ও গুন্ডাবাহিনীসহযোগে সেই শিক্ষককে নিয়ে আসা হয় কাজে যোগদানের জন্য। ছাত্র-অভিভাবকদের সঙ্গে বসে আলোচনা করে শূন্যপদে শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা করা যেতে পারত। সরকারি পদাধিকারীরা এসে বলতে পারত, কতদিনের মধ্যে শিক্ষক মিলবে। আপাতত বিতর্কিত শিক্ষকের নিয়োগ স্থগিত রাখা যেত। অর্থাৎ শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের রাস্তায় না গিয়ে জোর করে শাসকের হুকুম চাপিয়ে দেওয়া হলো। কোন বাধা-প্রতিবাদ চলবে না। শাসকের ইচ্ছাই শেষ কথা। অতএব পুলিশের দায়িত্ব যেভাবেই হোক বিক্ষোভ দমন করা। সঙ্গে থাকবে সশস্ত্র উন্নয়নবাহিনী। তাতে দু-চারটে ছাত্র মরে মরুক। শাসকের কিছু যায় আসে না। ইসলামপুরে এমনটাই হয়েছে। প্রতিবাদে রাজ্য উত্তাল। এইভাবে ছাত্রহত্যার বর্বরতা মেনে নেয়নি রাজ্যের মানুষ। প্রতিবাদে ভীত শাসক দায় এড়াতে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে বলতে চাইছে পুলিশ গুলি করেনি। করেছে বহিরাগতরা। বস্তুত সেই বহিরাগতরাও শাসকেরই দুষ্কৃতীবাহিনী। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ধুরন্ধর বি জে পি, আর এস এস সাম্প্রদায়িক প্রচার জোরদার করে পরিবেশকে বিষাক্ত করতে চাইছে। তাই বন্‌ধ বা সি বি আই তদন্ত নয়। বিচারবিভাগীয় তদন্ত করে সত্য উদ্‌ঘাটন হোক। মুখোশ খুলে দেওয়া হোক শাসক তৃণমূল ও সাম্প্রদায়িক বি জে পি-র।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement