সময় : সেতু বাঁধার

বনবাণী ভট্টাচার্য   ২৫শে সেপ্টেম্বর , ২০১৮

সেতু ভাঙছে। প্রাণহানি হচ্ছে। নির্মাণ বা রক্ষণাবেক্ষণের ত্রুটি নিয়ে তদন্ত হচ্ছে। শাস্তি পাচ্ছে অপরাধীরা। কিন্তু আরও বড় অপরাধ সম্প্রীতির সেতু ভাঙা। সেই ভাঙনকে রুখে সেতু বাঁধাই আজকের গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

না — বঙ্গভঙ্গ নয় — এখন কথা সেতু ভঙ্গের। তবে যে রেটে সেতু ভাঙছে, তাতে বড় কোনও ভাঙ্গন না কোনোদিন ঘটে যায়। আছে তো, বিচ্ছিন্নতাবাদী সাম্র্ দায়িক শক্তি আর তাদের মাথায় হাত রাখা কেন্দ্রে ও রাজ্যের শক্তপোক্ত ক্ষমতাবানেরা।

বাড়ির পাশের ধনুকের মতো বাঁকা নদীর উপরের সাঁ‍‌কোটির কথা বলতে গিয়ে কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখলেন —

বাঁশের সাঁকোটি শিশু শিল্পীর আঁকা

হেলানো বটের ডালে দোল খায় ছুটি।

অপটু হাতে ‌আঁকা সেতুর মতন পড়শি নদীর উপরের হালকা সাঁকোতে দোলখাওয়া, শৈশবের ছুটির আনন্দ। আর, কলকাতার ৫৪ বছরের পুরানো মাঝেরহাট ব্রিজ ভেঙে পড়ায় সরকারি হিসাবে মৃত্যু হয়েছে তিনজনের। বেসরকারি হিসাবে প্রাণ চলে গেলেও তা বোধহয় মৃত্যুর মর্যাদা পায় না — তার উল্লেখ না করাই ভালো। কিন্তু ক্ষতির তো বহু মুখ। মানুষের মৃত্যু, রুজি-রোজগারের মৃত্যু, যাতায়াতের সুগমতার মৃত্যু। এখানে শোক, এখানে দায় এড়ানোর অসংগত চেষ্টা, পরস্পরের দোষারোপ আর আগামী লাভ-লোকসানের কুটিল দুরভিসন্ধি। এই সেতু বিপর্যয়ে আনন্দের লেশমাত্র নেই। বরং স্মৃতিতে ঘন হয়ে আসে নির্মীয়মাণ পোস্তা সেতুর চাঙড়ের তলায় চাপাপড়া ট্যাক্সি ড্রাইভারের অসহায় গোঙানি।

তবু আশা করা যায় এক বছরে না হয় দুবছরে, না হয় কয়েকবছর পরেই মাঝেরহাট সেতু নতুন চেহারা, নতুন শক্তি নিয়ে একদিন দেখা দেবে। নিহত মজুরের সাথে বিয়ের সব ঠিক হয়েছিল বলে যে মেয়েটি দিন গুনছিল সে মেয়েটি নতুন জীবনের — তারও একদিন হয়ত স্বপ্ন সফল হবে নতুন জীবন গড়ে উঠবে।

কিন্তু এমন সেতুও আছে যা ভাঙলে আর গড়ে ওঠে না — যা আনে ধ্বংস আর ধ্বংস। একের পর এক সেতু ভাঙা কি প্রতীকী? এ কি মহাধ্বংসের ভয়ংকর ইঙ্গিত এক?

ভারতজুড়ে চলেছে এখন সেতু ভাঙার কাজ। সেতু ভাঙা হচ্ছে ধর্ম থেকে ধর্মান্তরে, বর্ণ থেকে বর্ণান্তরে, জাতি থেকে জাত্যন্তরের। আসলে এক মানুষ, আর এক মানুষের যে মিলনের সেতু, সেই সেতুগুলোই ভাঙা হচ্ছে একটু একটু করে। আর একটুও দ্বিধা না রেখে স্পষ্ট করেই বলা যায়, ২০১৪ সালে ভারত শাসনের ক্ষমতায় যারা এল, আর এস এস-এর সেই রাজনৈতিক দল বি জে পি এবং তার বন্ধুরা এই সেতু ভেঙে দিকে দিকে সেতু নির্মাণে রামচন্দ্রের বানর সেনার মতো যত্নে লালিত তাদের বাহিনীগুলিকে ছড়িয়ে দিয়েছে।

ভারত বহুত্ববাদী এবং বহুমাত্রিক দেশ; বহু সম্প্রদায়ের বাস। সম্প্রদায় কথাটার মধ্যে যে সামগ্রিকতা এবং সর্বজনীনতার ব্যঞ্জনা আছে, ভারতে বহুকাল যাবৎই মান্যতা নেই তার। সম্প্রদায় বা কমিউনিটি শব্দের এখন মূল‍‌ বৈশিষ্ট্যই বিভাজন। এক অত্যন্ত সংকীর্ণ ধারণা থেকে সম্প্রদায়কে তার বৃহত্তর পরিসর থেকে বিচ্ছিন্ন করে গণ্ডিবদ্ধ করা হয়েছে এবং ভারতে সাম্প্রদায়িকতার প্রধান ভিত্তি হিন্দু মুসলমানের বিরোধ।

সম্প্রদায়ের সার্বিক এবং অবিভাজিত ধারণাকে একটু একটু করে বিনষ্ট করেছে ব্রিটিশের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থচিন্তা। ঐশ্বর্যশালী ভারতকে লুণ্ঠনের বাধা হিসাবে ইংরেজ শাসক, সঠিকভাবেই ঐক্যবদ্ধ ভারতীয় জনগণকে চিহ্নিত করেছে। হিন্দু মুসলমানের সম্মিলিত সিপাহী বিদ্রোহ ১৮৫৭ সালেই তাদের টনক নাড়িয়ে দিয়েছিল। কারণ, সৈনিকের পোশাকে সিপাহীরা ছিল ব্রিটিশ শোষণে জর্জরিত কৃষকের ঘরের ছেলেরা। ফলে সিপাহীদের বিদ্রোহ আসলে ঐ এনফিল বন্দুক, না কৃষক শোষণের বিরুদ্ধে তা বুঝতে অসুবিধা হয়নি ঐ ধূর্ত শাসকদের। তাই, হিন্দুদের পবিত্র ভারতভূমিতে নিজেদের দখল প্রতিষ্ঠা করতে বারে বারে যবনেরা এই দেশটাকে আক্রমণ করেছে, করেছে অন্যায় শাসন। ব্রিটিশ ঐতিহাসিকদের এই বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গিই ক্রমে ক্রমে ভারতীয় জনগণের ধর্মীয় পরিচিতি সত্তাকেই প্রধান হিসাবে জনমানসে ইংরেজ শাসক প্রোথিত করেছে। হিন্দু না মুসলিম — বিভেদের এই ভয়ংকর প্রশ্নটা ছারখার করে চলেছে ভারতের শক্তিকে।

ভারতের সাম্প্রদায়িকতা আপাদমস্তক সাম্রাজ্যবাদী মতাদর্শের জারকে সিক্ত। এ কথা ঠিকই যে, মোদী শাসনেই সাম্প্রদায়িকতা দেখা দিয়েছে এমন নয়। সাম্প্রতিক অতীতে বাবরি মসজিদ ভাঙা, গুজরাট গণহত্যার মতো গা শিউরে ওঠা ঘটনাগুলি যেমন আছে, তেমনি এর আগেও হিন্দু মুসলিম বিরোধও দেখা দিয়েছে। কিন্তু মোদী জমানায় যেমন রাষ্ট্রনীতির প্রধান অভিমুখই এই মেরুকরণ — শাসকদলের রাজনীতির মূল অক্ষরেখাই হলো সাম্প্রদায়িকতা এমনটা অতীতে ছিল না। মোদীর শাসনে সাম্প্রদায়িকতা, লাভ জিহাদ-ঘরওয়াপসি-গোমতারক্ষা-দেশদ্রোহিতার মতন মহাচাতুর্য এবং প্রায় স্বৈরতান্ত্রিক উগ্রতা নিয়ে ভারতের সাধারণ সম্প্রীতির ঐতিহ্যকে চুরমার করার অবাধ ছাড়পত্র পেয়েছে। মোদী ও তার বি জে পি-র উত্থানের সময়কাল তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্বায়ন ও তার উদারবাদী নীতির ধামাকার প্রেক্ষিতে দক্ষিণপন্থার রমরমা এবং ফিনান্স পুঁজির বল্গাহীন গতির যুগে ঘোষিত হিন্দুত্ববাদী আর এস এস-এর রাজনৈতিক দল বি জে পি-র তুমুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে শাসন ক্ষমতায় আরোহণ।

আসলে, আজকের লগ্নিপুঁজি যার উত্তরসূরি সেই উপনিবেশবাদী সাম্রাজ্যবাদের বিভেদ সৃষ্টির ব্যাটনখানা, ১৯২৫-এ হিন্দু মহাসভার পরীক্ষিত ব্যর্থতার পটভূমিতে যে আর এস এস-এর জন্ম ১৯৪৭ তারাই মাথায় ঠেকিয়ে তা গ্রহণ করেছে উত্তরকালের ভারতের জন্যে। আশু স্বার্থসিদ্ধির জন্য, বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলি অতীতে কখনও ধর্মীয় আবেগ-অনুভূতিকে সুকৌশলে ব্যবহার করেনি। তা হয়ত নয়। কিন্তু আর এস এস-এর রাজনৈতিক মুখ বি জে পি-র কাছে হিন্দুত্ব যে একটা মতাদর্শ যার জন্য হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সর্বশক্তি নিয়োগ। আর সেই কারণেই বি জে পি-র হিন্দুত্বে ধার্মিকতা নেই — ঈশ্বর নিজেই। এটা পুরোপুরি একটা রাজনৈতিক লক্ষ্য। গোলওয়ালকারের ‘হিন্দু কে’? (হু ইজ অ্যা হিন্দু) বইতে সাভারকারের বক্তব্য — ‘‘হিন্দুত্বের সঙ্গে হিন্দু ধর্মের কোনও সম্পর্ক নেই, এটি একটি বিশুদ্ধ রাজনৈতিক প্রকল্প ক্ষমতা দখলের।’’ ফলে, সেদিন পরাধীন ভারতেও দেশের স্বাধীনতার থেকে তাদের কাছে বেশি মূল্যবান হয়ে দাঁড়িয়েছিল হিন্দুদের সংগঠিত করা, আজকে মোদী যুগেও যখন ফিনান্স পুঁজির দাক্ষিণ্যে কৃষির সংকটে কৃষকের আত্মহত্যার সংখ্যা অতীতের সাথে যুক্ত হয়ে ৩ লাখ ছাড়িয়ে যায়, বছরে ২ কোটির নতুন চাকরির বদলে কর্মচ্যুত মানুষের সংখ্যা রকেট গতিতে বেড়ে যায়, সাধারণ মানুষের বাজারের আগুন লেলিহান ক্ষুধার্ত দেশের তালিকায় এ দেশের নাম বেশ উপরের দিকে থাকে, শিক্ষিতের হারে তালিকায় নিচের দিকে, লিঙ্গ বৈষ্যম্যে পৃথিবীজুড়ে নাম-ডাক পড়েছে। দুর্নীতিতে যথেষ্ট সামনের সারিতে, তখনও এদের হিন্দুত্বের উন্মত্ততা ভয়ংকর থেকে ভয়ংকরতর হয়ে উঠছে। তাই, নোটবন্দিতে নিরপরাধ মানুষের হয়রানি, ব্যাঙ্কের লাইনে দাঁড়িয়ে অসহায় উৎকণ্ঠার মৃত্যু, মেয়ের বিয়ে বাতিল করতে বাধ্য হওয়ার অসম্মান সহ্য করেও কোনও গরিব মানুষের অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকার এক প‌য়সা জমা না পড়াতেও, মেক ইন ইন্ডিয়া এক সুপার ফ্লপ হলেও, জনধন প্রকল্প শেষ ব্যাখ্যায় জোচ্চুরিতে গিয়ে দাঁড়ালেও, গোমাতা নামে পিটিয়ে পিটিয়ে সংখ্যালঘু বা দলিতকে ইহলোক ত্যাগ করালেও, পরপর কাঠুয়া উন্নাও হরিয়ানার ভয়ংকর পাশবিকতাতেও হিন্দুত্ব আবেগে ভাটা পড়ে না। পড়ে না নানা কারণের প্রধান হলো দুধ দেওয়া গোরুর লাথি খাওয়া অর্থাৎ সে কর্পোরেট প্রভুরা শুধু প্রধানমন্ত্রীর মসনদে ক্রীতদাস বসাবার জন্য দশ কোটি টাকা ফুৎকারে খরচ করে সেই প্রভুদের সেবায় আসলে খামতি না থাকে। তাই, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের বল্গাহীন দামবৃদ্ধি কর্পোরেটমুখীকরণ নীতি, রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগকে প্রায় শূন্যে নিয়ে যাওয়া কালাধনের কলঙ্ক মোছার নোটবন্দির ফিকিরের অবতারণা। এসবের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিতে হয় অত্যন্ত সজাগ দৃষ্টিতেই অত্যন্ত সচেতনভাবে কারণ এদে‍‌শে সংখ্যাগুরু হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ করার গুরুদায়িত্ব যে এদেরই কাঁধে। এই জন্যে ব্রিটিশের বিরুদ্ধেও লড়াইটা করতে পারেনি। পারছে না শ্রেণি শোষণের বিরুদ্ধেও। আজ লড়াইটা করতে পারছে না দেশকে ভালোবেসে, দেশের মানুষকে ভালোবেসে মানবতাবাদী হতে; হয়ে রইল কেবল উগ্র হিন্দুজাতীয়তাবাদী, ফলে গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার বিরোধী।

তবুও প্রধানমন্ত্রীর নাটুকেপনা, তাঁর স্বপ্ন ফেরি করা, চমক এবং মিডিয়ায় তা ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ায়, বি জে পি মোহের হ্যাং ওভারে এখনও দেশ ও সমাজ। সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাকে কোনও মতেই হেয় করা যা‍‌বে না। এমনকি বি জে পি-তে আসছে দলিতরা যাদের বেঁধে রেখে নিজের শরীরের বর্জ্য জলীয় শাস্তি হিসাবে তাদের মুখে ঢেলে দিয়ে বি জে পি সমর্থক উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণরা উৎকট উল্লাস করে, যাদের শিশুর মৃত্যুকে পথের কুকুরের বাচ্চার মৃত্যুর মতন মনে করে বি জে পি নেতারা। কিন্তু আদিবাসী, দলিত প্রভৃতি অনগ্রসর অংশ এমন কি মুসলিমদেরও একাংশ আর এস এস-এর ছাতার তলায়। আর এস এস-এর নানামুখ — সেগুলোর ভিতরে সাম্য, ছোট বড় নেই। কিন্তু বাইরের জগতে তো এদের পিছিয়ে থাকাই এবং বৈষম্যের শিকার হওয়াই ভবিতব্য। তাহলে অন্তত সংরক্ষণ শিক্ষায় কাজে তো একটা ছোট উপায় হতে পারে। কিন্তু অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য বজায় রাখতে উদার আর এস এস-এর হাতে আছে দ্বন্দ্বহীন, বৈষম্যহীন, অভিন্ন হিন্দুত্বের মন্ত্র। আর হিন্দুত্বের মোহজালে আবদ্ধ হয়ে বি জে পি-আর এস এস যাদের পায়ের তলায় পিষে রাখে, সেই অনগ্রসররাও বি জে পি-কেই পছন্দ করে হয়ত ভোটও দেয়। তাদের ন্যায্য দাবিকে দাবিয়ে রাখে হিন্দুত্বের বোলচাল। তারই মায়ায় ঢাকা পড়ে শ্রেণি বিভাজন, শ্রেণি শোষণ, অধিকারের সংগ্রাম।

রাষ্ট্রনীতি রাজনীতি আর ধর্ম এখন একাকার। এটাই বি জে পি-র প্রধান কদর্য অবদান ভারতীয় রাজনীতির অঙ্গনে এবং রাজনীতির পরিসরে ধর্মের প্রবেশ (অনুপ্রবেশ)। আসলে জীবনজীবিকা ও নাগরিক স্বাধীনতার মতন অর্থনৈতিক সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বের প্রশ্নগুলিকে সযত্নে চাপা দেওয়া। আর এই ফাঁকে জাতীয় আন্তর্জাতিক বা ফিনান্স পুঁজি গুছিয়ে বসে তাদের মৌরসি পাট্টা চালায়, ১৩০ কোটি মানুষের অধিকার ও সুখ কেড়ে নিয়ে।

জুলুম ছাড়া পুঁজির প্রতিষ্ঠা ও বিস্তার সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক পুঁজির সহযোগিতায় নাম লেখানো মোদী সরকারকে তাই স্বৈরাচারের পথে নামতে হয়েছে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষে। গৌরী লঙ্কেশদের হত্যা, ভারভারাদের মতন বুদ্ধিজীবী ও সমাজচিন্তকদের ‘শহুরে নকশাল’ বলে দেগে দেওয়াটা জরুরি। জরুরি জে এন ইউ-র বেয়াড়া ছাত্রগুলি — ঐ কানহাইয়া কুমার, উমর খালিদ, অনির্বাণদের দেশদ্রোহিতার দোহাইয়ে, গরাদে ঢোকানো বা উমর খালিদের মতন বন্দুকের নিশানা করা; প্রয়োজন, যুদ্ধবিমানে মহিলাকে পাইলট করে নারী স্বাধীনতা ও সমানাধিকারের ধ্বজা উড়িয়েও দীপিকা রাজাওয়াত, তিস্তা শীতলবাদের মতন উদ্ধত বেয়াড়া মেয়েদের সংখ্যার বাড়বাড়ন্ত রুখতে বিশ্ববিদ্যালয় (ভোপাল) স্তরে গৃহবধূ কোর্সের প্রশিক্ষণ চালু করা, প্রয়োজন ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার খর্ব করা।

ফ্যাসিবাদ হলো — পুঁজির সব থেকে প্রতিক্রিয়াশীল কুৎসিত হিংস্ররূপ। জর্জি ডিমিট্রভ জার্মানির ফ্যাসিবাদ প্রসঙ্গে যা বলেছেন তা স্মরণ করলে ইতিহাসের শিক্ষাটা ঝালিয়ে নেওয়া যায় — ‘ফ্যাসিবাদ আসলে চূড়ান্ত সাম্রাজ্যবাদীদেরই স্বার্থরক্ষা করে, কিন্তু এমন‍‌ই একটা ভান করে, যাতে জনগণের মনে হবে যে তার প্রকৃত লক্ষ্য হলো বঞ্চিত, লাঞ্ছিত একটি দে‍‌শের মানুষের উপকার করা। এইভাবেই ফ্যাসিবাদ বিধ্বস্ত জাতীয় আবেগকে নাড়িয়ে দেয়।’ স্বচ্ছ ভারত, আচ্ছে দিনের স্বপ্ন দেখানো জাতির ত্রাতা মঁসি‍য়ে হিসাবে মোদীকে উপস্থিত করালো দেশি-বিদেশি কর্পোরেট প্রভুরা। বর্তমান সরকারের শাসনটার বর্ণনা ডিমিট্রভের কথায় আছে — ‘‘ফ্যাসিবাদ জনগণকে এমন একটা শাসন শক্তির কবলে ফেলে রাখে, যেটা বস্তুত চূড়ান্ত অসৎ এবং ভয়ংকরী হলেও, আপাতদর্শনে তাদেরই কাছে প্রগাঢ় সততা, সাধুতার দাবি নিয়ে হাজির হয়ে থাকে! জনগণের ব্যাপকভাবে মোহমুক্তি ঘটে পাছে, তাই তারা বাকচাতুরির সাহায্যে অদ্ভুত সব নতুন নতুন পরিস্থিতি সামাল দেয়।’’

তবে ভারত এখনও ফ্যাসিবাদ উত্থানের সময়কালের জার্মানি হয়ে ওঠেনি। পশ্চিমবঙ্গের তো প্রশ্নই ওঠে না। একটা অঙ্গরাজ্যে শুধু ফ্যাসিবাদ দেখা দি‍‌তে পারে না। কিন্তু দুই সরকারের গতি প্রকৃতি, প্রচার প্রকরণে ফ্যাসিবাদী ঢংটা স্পষ্ট। দুই সরকারই ব্যক্তিকেন্দ্রিক ম‌তুসিয়ে মাফিক বিশ্ব সংসারে পারে না হেন কাজ নেই। জনগণের জন্য চোখের জলে বুক ভাসিয়ে দিতে পারে আবার বিন্দুমাত্র অপছন্দের সুর শুনলে গরাদে ঢুকিয়ে দিতে যে পারে কানহাইয়া কুমার থেকে শুরু করে এরাজ্যে ১৪দিন জেলখাটা জঙ্গলমহলের যুবক তার জলজ্যান্ত উদাহরণ। দেশজুড়ে আছে বেটি পড়াও বেটি বাঁচাও — বাংলায় আছে রূপশ্রী, কন্যাশ্রী অথচ কাঠুয়া-উন্নাওয়ে আসিফারা আর কামদুনি-কাকদ্বীপে শিপ্রা, স্বপ্নাদের জোটে মরণশ্রী। চা দোকানির ছেলে প্রধানমন্ত্রীর কাঁধে হাত দিয়ে চলা নীরব মোদীর বিজয় মালিয়াদের মতো চোরেরা দেশান্তরী — কালীঘাটের কুঁড়েঘরের বাসিন্দা মুখ্যমন্ত্রীর হাওয়াই চটি দেখা যায় ডেলো বাংলোর বারান্দায় প্রতারক সুদীপ্ত সেন, গৌতম কুণ্ডুদের জুতোর পাশে যারা এখন দিনের পর দিন জেলে, আর মুখ্যমন্ত্রীর ভাইয়েরা হয় জেলে নয় তোয়ালেতে মুড়ে ঘুষের টাকা নেয়। অথচ দুজনেই যেন মূর্ত সততা আর সত্যবাদী যুধিষ্ঠিরের একেবারে গায়ে গায়ে ভাইবোন। মিথ্যার জাল বোনায় দক্ষ দুই কারিগরের নিজেদের বোঝাপড়াটাও নিখুঁত। দুজনেই চতুর ধর্মব্যবসায়ী, রামনবমী থেকে বজরঙবলি, সতীমা থেকে গণেশজীতে ভক্তির বান ডাকিয়ে ঈদের ইফ্‌তার থেকে মহরমের তাজিয়ায় সহাস্যমুখ এদের।

অথচ এদেরই জন্য আসানসোলের ইমামের কি‍‌শোর পুত্রের কচি প্রাণটা দাঙ্গার ত্রিশূলে শেষ হয়ে যায় — ফেজটুপির দায়ে ছোট্ট ছেলে জুনেইদের লাশটা পড়ে থাকে — গোমাংসের গুজবে প্রৌঢ় একলাখকে প্রাণহীন করে ফেলা হয়। এদেরই মেরুকরণের ষড়যন্ত্রে চরম অসহিষ্ণুতা গোটা সমাজটাকে অক্টোপাসের মতো জ‍‌ড়িয়ে ধরছে। যে মন্দির মসজিদ একদিন ছিল শুধু উপাসনা নয়, সামাজিক মিলনের ক্ষেত্র, মত আদান-প্রদানের কেন্দ্র, কুশল বিনিময়ের যোগাযোগ স্থান, আজ সেখানের ভক্তরা থাকে গাঁইতি-শাবল হাতে পরস্পরের উপাসনাগৃহ ধ্বংসের জন্য। মুসলিম পরিবারগুলো এখন কলকাতাতেও বাড়িভাড়া পায় না — কেজি স্কুলের শিশুও জানে ওরা আলাদা ওরা মুসলিম।

ধর্মনিরপেক্ষ বহুত্ববাদের দেশে ছোট ছোট শিশুরা শিখে ফেলছে ‘ওরা-আমরা’। এই বিচ্ছিন্নতাবোধ শাসননীতির ফল। ভেঙে ফেলা হচ্ছে মিলনের সেতুগুলি চরম অসহিষ্ণুতার কারণে। এক ভারতীয় আর এক ভারতীয়র কাছে ক্রমশ অচেনা অগম্য হয়ে উঠছে। কেউ কারোর মনের দরজায় পৌঁছাতে পারছে না। উপমহাদেশের মানুষের আজ এক একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হচ্ছে। তাহলে ভারতটা কার? শুধুই মোদী মমতাদের সব ধ্বংস করার জন্যে?

মানুষে মানুষে বিভেদ বিচ্ছিন্নতা, কোনও দেশে কোনও কালে সিংহাসনকে চিরদিনের জন্য নিরাপদ করে না — করেনি। মানুষ তার নিজের প্রয়োজনেই সেতু বাঁধে। আর সেই সেতু নির্মাণ হয় বলেই কিন্তু মুসোলিনি ল্যাম্পপোস্টে ঝুলেছে —পরাজিত হিটলারের দেহের ছাইটুকুই পাওয়া গেছে শুধু।

পশ্চিমবঙ্গে মাঝেরহাট ব্রিজ ভেঙে পড়ার পর কিন্তু দেখা যাচ্ছে আরও এগারোটা সেতু বিপজ্জনক অবস্থায় যেকোনও সময় ভেঙে পড়তে পারে। কবি তার বন্ধুকে বলেছেন — ‘‘সাঁকোটা দুলছে, এই আমি তোর কাছে’’। সাঁকোর দুলুনিতে বন্ধু দুজন কাছাকাছি হয়। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বিপর্যয় মানুষকে কাছাকাছি করে মিলিয়ে দেয়। জনগণের সেতু সাময়িক ভা‍‌ঙে, কিন্তু জনগণ আর শাসকের সেতু নড়বড়ে হয়ে ভেঙে পড়ে একসময়ে। ভারতের এবং রাজ্যের যে স্বৈরশাসকেরা মিথ্যা প্রতিশ্রুতি স্বপ্ন আর চমকে এতদিন যে সেতু গড়েছে আবারও সেই মিথ্যাতেই ভর করে ভারতের মসনদে ফিরে আসার বা ফেডারেল সরকারের স্বপ্নে বিভোর, জনগণের সাথে তাদের সেতু ক্রমশ ভেঙে পড়ছে ঐ ১১টা সেতুর মতনই তাদের স্বৈরাচার প্রতারণা দুর্নীতি সাম্প্রদায়িকতার জন্য। মহামান্য শাসক দুজন, সেতু ভাঙার জন্য সেতু নির্মাণের শব্দ শুনুন জে এন ইউ-তে। আপনাদের সেনা ভি এইচ পি-র অত লম্ফ, ঝম্ফ সত্ত্বেও এস এফ আইসহ বামপন্থী ছাত্র সমাজের বিজয় নিশান উড়ছে সেখানে। যন্তরমন্তরে লাখো মহিলার শক্ত মুঠোয় ছিল লড়াইয়ের পতাকা, মুখে ছিল প্রতিবাদের ভাষা আর দিল্লি কেঁপেছে লাখো লাখো শ্রমিক-কৃষকের পদভারে। ভারতব্যাপী সাধারণ ধর্মঘটে শত বাধা সত্ত্বেও স্তব্ধতা‍‌ই ছিল সোচ্চার আর এখন চলছে বাংলার ঘরে ঘরে সাঁকো আরও শক্ত করে বাঁধার জন্য মানুষের কাছে মানুষের ঘরে মানুষের সম্মিলিত অধিকার যাত্রা; পঞ্চাশ হাজার পথ উজান ঠেলে মানুষ তার কেড়ে নেওয়া গণতান্ত্রিক অধিকার, তার সম্প্রীতির ঐতিহ্য ফিরে পেতে যাত্রা শুরু করেছে। এই যাত্রা এই সমাবেশ ছিন্ন করবে শাসকের মোহজাল — দিল্লির শাসক আর রাজ্যের শাসকের মুখ কেমন করে এক হয়ে যায় সে রহস্যের উন্মোচনও হবে অতিদ্রুত। রাজ্য শাসনের বশ্যতা বর্বরতা স্বৈরাচারের দাওয়াই যে দেশের শাসকদল নয়, ত্রিপুরা চোখের সামনে যেমন তা স্পষ্ট করছে তেমনি এ রাজ্যের চোরের দলকে বাঁচিয়ে দিয়ে রাজ্যের শাসকদলেই যে আস্থা ভারত সম্রাটের, তার ক্ষমতাকে সুরক্ষা দিতে সে অন্ধকারও ফিকে হয়ে উঠছে। দুই সরকারই পরস্পরকে বলে চলেছে ‘‘আমি তোমারই, তোমারই, তোমারই গান গাই/ আমার গান গাও তুমি।’’

তাই, মজুর কৃষক ছাত্র যুব মহিলা মধ্যবিত্ত ও বুদ্ধিজীবী পরান মাঝির মতন হাঁক দিয়েছে — ‘এবার আমার প্রাণ তুলে দিয়ে/ অন্ধকারে কাঁদবো না/ এবার আমরা তুলসীতলায়/ মনকে বেঁধে রাখব না।’

এবার সেতু ভাঙার জন্য সেতু বাঁধার পালা/ হাতে হাতে ধরে এবার চলা — ‘বাঁধি সেতু, বাঁধিরে’র অভিমুখে।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement