দশভূজার ত্রিশূলে মহিষাসুরের মৃত্যুতে
এখনও কষ্ট পায় অসুর সম্প্রদায়

নিজস্ব সংবাদদাতা   ১২ই অক্টোবর , ২০১৮

আলিপুরদুয়ার, ১১ই অক্টোবর - দেবীপক্ষে ওদের এখন অন্য উৎসবের আয়োজন। দুর্গার আবাহনে অন্যরা যখন ব্যস্ত তখন রক্ত দিয়ে সংকট মোচনের আর্তি প্রকাশ করেন আজকের অসুরেরা। ডুয়ার্সের নাগরাকাটা থেকে আলিপুরদুয়ার ও মাথাভাঙায় অসুর সমাজের এটাই রীতি। পুরানো রীতি আজও বয়ে নিয়ে চলেছেন সমাজের প্রবীণরা। তাদের মধ্যে রয়ে গেছে পুরানো বিশ্বাসও। তাঁরা যে মহিষাসুরের বংশধর এই ধারণা আজও অটল। ভরা আশ্বিনে যখন সবাই মেতে উঠেছে দেবীর আবাহনে, তখন অসুররা বংশরক্ষায় ব্যস্ত।

তাঁদের বাড়ির নিকোনো উঠোনে এখন চলছে ‘নাওয়াখানি’ উৎসবের প্রস্তুতি।

আবার কোনও অসুরের বাড়িতে ‘হারিয়ালি’ পুজোর আয়োজন। বিজয়া দশমীর পরেই শুরু হবে উৎসবের তিথি। এখন সমাজের প্রবীণেরা তারই প্রতীক্ষায় রয়েছেন।

প্রবীণ বিসাধু অসুর শোনালেন সেই উৎসবের কাহিনি। সোনালি রঙের পালকের মুরগির রক্ত দিয়ে সাজানো হবে সংকট মোচনের নৈবেদ্য।

সোনালি পালকের মুরগি তো সাধারণত পাওয়া যায় না। উত্তরে মুচকি হেসে বিসাধু অসুর বললেন, বনবস্তির বাসিন্দাদের কার ঘরে তেমন মুরগি আছে তার খোঁজ শুরু হয় ৬মাস আগে থেকে। বায়না দিয়ে রেখে দেওয়া হয়। মওকা বুঝে চড়া দাম হাঁকেন মুরগি মালিক। আর বনে-বাদাড়ে খুঁজতে হয় অসুর পুজোর অন্যতম উপকরণ ‘যাত্রাশী’ গাছের পাতা।

ইতিহাস বলে, অস্ট্রিক-দ্রাবিড় গোষ্ঠীর বংশধর অসুরদের বিহার, ছত্তিসগড় থেকে চা বাগানের কাজ করতে আনা হয়েছিল। সেই থেকে তাঁরা ডুয়ার্সের কয়েকটি চা বাগানে থাকতে শুরু করেন। পরে সমতলেও বাস করতে শুরু করেন। জনগণনার হিসাব অনুযায়ী ডুয়ার্স ও সমতলে হাজার তিনেক অসুর আছেন যারা সংখ্যায় ক্রমশই কমছেন। নিজের গোষ্ঠীতে উপযুক্ত পাত্র না পেয়ে মেয়েদের অন্যত্র বিয়ে দিতে হচ্ছে। ছেলেরাও অন্যত্র বিয়ে করছেন। বিসাধু অসুরের ছেলে ঝিনাই অসুরের বক্তব্য, অসুর সমাজের সংস্কৃতি এখন মিশ্র সংস্কৃতি।

মূলত চা বাগানে ও পাহাড়ে পাথর ভাঙার কাজ করেন অসুরেরা। সমতলের অসুরেরা কৃষিকেই জীবিকা হিসেবে বেছে নিয়েছেন।

ডুয়ার্সের প্রবীণ অসুরেরা নিজেদের লিপিতেই কথা বলেন। নতুন প্রজন্মের কথায় রাজবংশী সুর ধরা পড়ে। তাঁদের জীবনযাত্রায় পরতে পরতে জড়িয়ে আছে কুসংস্কার। এখনও প্রসূতিদের হাসপাতালে নিয়ে যেতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না তাঁরা। অসুরদের নিয়ে একাধিক গবেষণা হয়েছে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। অসুররা যে অস্ট্রিক-দ্রাবিড় গোষ্ঠী উদ্ভুত তা প্রমাণ হলেও তাঁরা যে মহিষাসুরের বংশধর তেমন প্রমাণ নেই। অথচ সেই বিশ্বাসেই টিকে আছে প্রথা।

সমতল ও ডুয়ার্সের অসুর সম্প্রদায় রীতিনীতিও কিছুটা বদলে গেছে। ওঁদের পুজোয় ব্রাহ্মণের ঠাঁই নেই। পুজোর হকদার বাড়ির প্রবীণ ব্যক্তি। প্রবীণ কেউ না থাকলে বড় ছেলে পাবেন পুজোর অধিকার এমনটাই জানালেন লোকসংস্কৃতি গবেষকরা। নৈবেদ্যর তালিকায় থাকবেই ‘হাড়িয়া’ আর ‘আতপচাল’। বলির মুরগির মাংস খাবেন বাড়ির সকলে। বিবাহিত মহিলাদের ওই মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ। অসুরদের রান্না ঘরে তিনটি থান থাকে। যেকোনও পদ রান্না হলে পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে সেই থানে রান্না করা খাবার দেওয়া হয়। আবার সমতলে অসুরেরা দেবীপক্ষের আগেই প্রাক্‌ নবান্ন উৎসবে মেতে ওঠেন। নতুন কৃষিবর্ষের সূচনাকে সামনে রেখে পুজো চলে সমাজে।

চারিদিকে যখন শিউলির গন্ধ, অসুরদের পাড়ায় তখন বিষাদের সুর। আগমনীর সুর ছড়িয়ে পড়লেই অসুররা ঘরবন্দি করে নেন নিজেদের। কারণ, ওঁরা অসুর! প্রবীণরা রীতি মেনে চললেও নতুন প্রজন্ম এখন মেতে উঠছে উৎসবে। লক্ষ্মী অসুর, লাবন্তী অসুরেরা এখন পুজোর চাঁদা দেয়, চাঁদা তোলে। রাত জেগে ঘুরে বেরায় প্যান্ডেলে।

তবুও দশভূজার ত্রিশূলে, ‘ট্র্যাজিক হিরো’ মহিষাসুরের মৃত্যুকে মেনে নিতে অসুরদের এখনও কষ্ট হয়।

পুজো এলেই আজও প্রবীণ অসুরেরা বন্ধ ঘরে মন খারাপ করে বসে থাকেন। হয়তো ঢাকের বোলে মন খারাপ চাপা পড়ে যায়।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement