কেন্দ্রে বন্ধ করল বিকো লরি,
এন জে এম সি

পুনরুজ্জীবনের দাবি তুলে লড়াইয়ে সি আই টি ইউ

নিজস্ব প্রতিনিধি   ১২ই অক্টোবর , ২০১৮

নয়াদিল্লি, ১১ই অক্টোবর- রাজ্যের দুই রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বন্ধ করেছে কেন্দ্র। সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আন্দোলনে নামছে সি আই টি ইউসহ একাধিক ট্রেড ইউনিয়ন। যৌথভাবে চিঠি পাঠানো হচ্ছে কেন্দ্রীয় মন্ত্রকে। কেন্দ্রের সঙ্গে কথা বলার দাবিতে শ্রমিক আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ চিঠি দিচ্ছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিকেও।

শ্রমিকনেতাদের বক্তব্য নির্দিষ্ট। দুই সংস্থারই পুনরুজ্জীবন সম্ভব। দুই সংস্থা বন্ধ করার পিছনে বেসরকারি বৃহৎ ব্যবসার স্বার্থ রয়েছে। সিদ্ধান্ত কেন্দ্রের বি জে পি জোট সরকারের হলেও রাজ্যের তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের নিষ্ক্রিয়তায় ক্ষুব্ধ শ্রমিক আন্দোলনের নেতারা। টিটাগড়ের কিন্নিসন মিল এবং খড়দহ মিলও পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে এই সিদ্ধান্তে। বার্ন স্ট্যান্ডার্ড বন্ধ বা ব্রিজ অ্যান্ড রুফের মতো রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বন্ধের কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের বেলায় নড়াচড়া নেই তৃণমূলের।

বুধবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভা সিদ্ধান্ত নিয়েছে পুরোপুরি তালা ঝোলানো হবে ন্যাশানাল জুট ম্যানুফাকচারার্স কর্পোরেশন (এন জে এম সি) এবং বিকো লরি লিমিটেড ( বি এল এল)। এন জে এম সি-র সহযোগী সংস্থা রাজ্যে অবস্থিত বার্ডস জুট অ্যান্ড এক্সপোর্টস লিমিটেড (বি জে ই এল)-ও বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভার অর্থনীতি বিষয়ক কমিটি। রীতিমাফিক বৈঠকে সভাপতি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, ভোটের প্রচারে যিনি ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ পরিকল্পনার সাফল্য দাবি করে থাকেন।

সি আই টি ইউ নেতা দেবাঞ্জন চক্রবর্তী বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন, বি এল এল বন্ধের বিরোধিতায় ট্রেড ইউনিয়নগুলির চিঠি যাচ্ছে কেন্দ্রীয় পেট্রলিয়াম এবং প্রাকৃতিক গ্যাসমন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের কাছে। বি এল এল-র পুনরুজ্জীবনের নির্দিষ্ট পরিকল্পনা হাজির করছে সি আই টি ইউসহ বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন। প্রধানত দুটি বিকল্পের দাবি তোলা হচ্ছে। এক, কেন্দ্রীয় পেট্রলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রক নিজেই সংস্থাটিতে পুনরুজ্জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের ব্যবস্থা করতে পারে। তা করা হোক দ্রুত। দুই, কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত কোনও তেল সংস্থার সঙ্গে বিকো লরির সংযুক্তিকরণ সম্ভব। বহুবার এমন আলোচনা হয়েছে। শ্রমিক বা আধিকারিকদের স্বার্থে আঘাত করে না এমনভাবে সংযুক্তিকরণ করা যায়। পেট্রপণ্য এবং বৈদ্যুতিন সরঞ্জাম সংক্রান্ত পরিষেবার ক্ষেত্রে দক্ষ এই সংস্থা তুলে দেওয়ার কোনও কারণ থাকতে পারে না। আসলে, রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রটিই তুলে দিতে নেমেছে কেন্দ্রের বি জে পি সরকার।

এক বছর বাদেই শতবর্ষ পালন করতে পারত বিকো লরি। ১৯১৯-এ তৈরি এই সংস্থা রাষ্ট্রায়ত্ত হয় ১৯৭২। সংস্থার ওয়েবসাইট বলছে, ১৯৭৯-তে কেন্দ্রীয় পেট্রলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রকের অধীনে আনা হয় এই সংস্থাকে। ২০১১-তে পুঁজি পুনর্গঠন হয়। অয়েল ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপমেন্ট বোর্ড ৬৭.৩৩শতাংশ এবং কেন্দ্রীয় সরকারের ৩২.৩৩শতাংশ অংশীদারিত্ব থাকে। বাকি সামান্য অংশ অপর কয়েকটি হাতে।

একাধিক উৎপাদন ও পরিষেবার মধ্যে রয়েছে ক্রেতার প্রয়োজন অনুযায়ী লুব্রিক্যান্ট বানানোর পরিকাঠামো। তৈরি হয় সুইচ গিয়ার। বৈদ্যুতিন ট্রান্সফরমার সারানো বা নতুন করে বসানোর কাজ করার সক্ষমতা জানাচ্ছে সংস্থা। অর্থনীতির পক্ষে অতি প্রয়োজনীয় এই সংস্থাটিকে তুলে দেওয়ার প্রস্তাবে অতীতে প্রশ্ন তুলেছিল সংসদের সংশ্লিষ্ট স্ট্যান্ডিং কমিটিও। পেট্রলিয়াম মন্ত্রকে সক্রিয় হওয়ার সুপারিশও করা হয়েছে ২০১৪-১৫ মেয়াদের স্ট্যান্ডিং কমিটির রিপোর্টে।

সংস্থা বন্ধের সমর্থনে কেন্দ্রের বক্তব্য, মন্ত্রক বিভিন্ন সময় পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা করেছে। কিন্তু, তা করা যাচ্ছে না। এই ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার পরিবেশে দরকার বিপুল পুঁজির বিনিয়োগ। ধারাবাহিক লোকসানে চলায় সংস্থাটিকে টেনে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। সংস্থার মোট লোকসানের অঙ্ক ১৫৩.৯৫কোটি। প্রশ্ন উঠছে কেন্দ্রের এই হিসাবেই। যে দক্ষতা সংস্থার রয়েছে সেখানে মাত্র দেড়শো কোটি টাকার লোকসানের জন্য সংস্থা সংস্থা বন্ধ করা হবে কেন। সেই সূত্রেই শ্রমিনেতারা মনে করছেন, বেসরকারি ব্যবসাকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার ধারাবাহিক মতলবটিতেই পূর্ণতা দেওয়া হয়েছে এবার। বিরোধিতা করা হচ্ছে স্বেচ্ছাবসরে কেন্দ্রীয় প্রস্তাবের।

একই অভিজ্ঞতার কথা জানা গিয়েছে ন্যাশনাল জুট ম্যানুফাকচারার্স কর্পোরেশন সম্পর্কেও। চটশিল্পের এই সংস্থা এন জে এম সি এবং সহযোগী বি জে ই এল বন্ধের পক্ষে কেন্দ্র বলেছে, সরকারি কোষগারে খরচ কমানো যাবে রুগ্‌ণ এই রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বন্ধ হলে।

চট উৎপাদন সংস্থার পুনরুজ্জীবন প্রকল্পে রাজ্য সরকারের তরফে সাড়া না পাওয়ার অভিযোগও তুলেছে কেন্দ্র। বলা হয়েছে বি জে ই এল-র জমি অন্য উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা করা যেত। কিন্তু, এই প্রস্তাবে রাজ্য সরকার সাড়া দেয়নি। পারস্পরিক আলোচনার জন্য তৈরি কমিটিতে প্রতিনিধি পাঠাতে তিন বছর দেরি করেছে রাজ্য। এন জে এম সি-র যে মিলগুলি পুনরুজ্জীবন প্রকল্পে বিবেচিত হয়েছে তার দুটি পশ্চিমবঙ্গের। টিটাগড়ের কিন্নিসন মিল এবং খড়দহ মিল। বিহারের কাটিহারে আরেকটি ইউনিটের কাজও বন্ধ রাখা হয় ২০১৬-র আগস্ট থেকে।

দেবাঞ্জন চক্রবর্তী বলেছেন, দুটি শিল্পের ক্ষেত্রেই রাজ্যের তৃণমূল সরকারের নিষ্ক্রিয়তা আশ্চর্যজনক। চটশিল্প নিয়ে রাজ্যের মন্ত্রীকে স্মারকলিপিও দেওয়া হয়েছিল কিছুদিন আগে। জানানো হয়েছে ক্ষোভও। সি আই টি ইউ মনে করিয়েছে যে অতীতে বামফ্রন্ট পরিচালিত রাজ্য সরকার নির্দিষ্ট হস্তক্ষেপের চেষ্টা চালিয়েছে। কেন্দ্রের সঙ্গে আলোচনায় বসেছেন বামফ্রন্টের সাংসদরা। সি আই টি ইউ সাধারণ সম্পাদক তপন সেন সাংসদ ছিলেন যখন, একাধিকবার চিঠি পাঠিয়েছেন। পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে আলোচনায় থেকেছেন। আন্দোলন গড়েছে বেঙ্গল চটকল মজদুর ইউনিয়ন। সাংসদ, সরকার সবই আছে। সেই সক্রিয়তা নেই তৃণমূলের। তাঁর মত, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা না থাকলে বেসরকারি সংস্থাগুলির সঙ্গে দর কষাকষির সমস্যা বাড়ে। ‘জুট ব্যারন’-রা সেই সুযোগ নিতে চাইছে। বরাবর রয়েছে সিন্থেটিক লবির চাপ। কেন্দ্রের সিদ্ধান্তে তার প্রভাব পড়েছে।







Current Affairs

Featured Posts

Advertisement