সত্য জান‍‌তে চায় দেশ

  ১২ই অক্টোবর , ২০১৮

ফ্রান্স থেকে যুদ্ধ বিমান কেনার সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে যেদিন বিশদ জানতে চেয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত তার একদিন পরেই তিনদিনের সফরে ফ্রান্স পাড়ি দিয়েছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী নির্মলা সীতারামণ। ফ্রান্সের দাসাল্ট থেকে জঙ্গি বিমান কেনার চুক্তিকে কেন্দ্র করে বিতর্ক এখন তুঙ্গে। সমস্ত বিরোধী দল এই চুক্তির পেছনে দুর্নীতি, অনিয়ম, স্বজনপোষণের জোরালো অভিযোগ তুলেছে। চু‍‌ক্তির প্রক্রিয়ায় নানান অস্বচ্ছতা,নানান প্রশ্ন হাজির হলেও তার কোনও সন্তোষজনক উত্তর মিলছে না। বিরোধীরা যেসব প্রশ্ন তুলছেন তার কোনোটিরই সরাসরি উত্তর দেয়নি নরেন্দ্র মোদীর সরকার। নিরাপত্তার প্রশ্নে গোপনীয়তার দোহাই দিয়ে তারা সবকটি প্রশ্নকেই এড়িয়ে যাচ্ছে। অথচ যে প্রশ্নগুলি উঠছে তা কোনওভাবেই নিরাপত্তার বিষয়কে লঘু করছে না। মুখ্য প্রশ্নগুলির মধ্যে আছে (১) বহু বছর ধরে ধাপে ধাপে আলোচনার পর বিমান কেনার বিষয়টি চূড়ান্ত হলেও তা বাতিল করে চটজলদি নতুন চুক্তি করা হলো কেন? (২) বিমানবাহিনীর দীর্ঘদিনের চাহিদা অনুযায়ী ১২৬টি বিমান কেনার পরিকল্পনা হলে পরে তা কমিয়ে মাত্র ৩৬টি করা হলো কেন? ভারতীয় বিমান বাহিনীর যুদ্ধ বিমানের প্রয়োজন কি কমে গেছে? জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিপদ কি আগের মতো আর নেই? (৩) বিমান কেনার সিদ্ধান্ত দেশের মাটিতে ঘোষণা না করে কেন ‍‌শিল্পপতিদের সঙ্গে নিয়ে প্যারিসে বসে ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী? (৪) ভারতে জঙ্গি বিমান সরবরাহের জন্য আগে ভারতীয় সহযোগী সংস্থা ‍হিসাবে চিহ্নিত হয়েছিল রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ‘হ্যাল’। ‘হ্যাল’কে বাতিল করে অনিল আম্বানির সদ্যোজাত সংস্থাকে বেছে নেবার রহস্যটা কি? (৪) পুরানো চুক্তিতে প্রতিটি বিমানের দাম যা ধরা হয়েছিল নতুন চুক্তিতে তা তিনগুণ বেড়ে গেল কোন জাদুমন্ত্রে? রিলায়েন্সকে মোটা অর্থ পাইয়ে দেবার জন্য সরকারি অর্থের অপব্যবহার নয় তো?

প্রশ্নগুলি নিঃসন্দেহে গুরুতর। সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং যথার্থ পন্থা অবলম্বন মানুষ প্রত্যাশা করেন। সরকারকে তা পূরণ করেই প্রমাণ করতে হবে তারা দেশের ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ। মানুষ নিরাপত্তা সংক্রান্ত গোপনীয়তা নিয়ে কোনও কিছু জানতে চান না। জানতে চান সরকার সততা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে জনগণের করের টাকা খরচ করছে কিনা। জনগণের অর্থে ঘনিষ্ঠ শিল্পপতিদের পাইয়ে দেওয়া মানুষ মেনে নেবেন না।

রাফালে চুক্তিতে এটাই এখন সবচেয়ে গুরুতর বিতর্ক। প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা দেনার দায়ে প্রায় দেউলিয়া হয়ে যাবার অবস্থা যে শিল্প গোষ্ঠীর তাদের রাতারাতি যুদ্ধ বিমান তৈরির কাজে যুক্ত করার কোনও বিশ্বাসযোগ্য যুক্তি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সবচেয়ে বড় কথা এই শিল্পগোষ্ঠী কোনওদিন কোনও সামরিক উৎপাদনে যুক্ত ছিল না। তাদের এ ব্যাপারে কোনও অভিজ্ঞতা নেই। অথচ কাগজে কলমে এমন একটি কোম্পানি গঠনের পর পক্ষকাল কাটতেই দাসাল্টের মতো আন্তর্জাতিক স্তরে শীর্ষ সংস্থার সঙ্গে তাদের চুক্তি হয়ে ‍গেল। এমন একটি চুক্তির আগে একাধিক সংস্থার সঙ্গে নানা স্তরে আলোচনা হয়ে থাকে। সেটা সংবাদে প্রকাশও হয়ে‌ থাকে। এক্ষেত্রে তেমন কিছুই হয়নি। হঠাৎ করে দুনিয়া জানল আম্বানিদের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। বাতিল করা হ‍‌য়েছে ‘হ্যাল’কে। বুঝতে অসুবিধা হয় না এই সিদ্ধান্ত স্বাভাবিক নিয়মে হয়নি। সরকারের সর্বোচ্চ স্তরের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। ঘটনাক্রম থেকেই পরিষ্কার বিরোধীরা যে অভিযোগ তুলেছেন তাকে উড়িয়ে দেবার উপায় নেই। নেই বলেই মোদী সরকার কোনও প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছে না। মূল প্রশ্ন এড়িয়ে উলটোপালটা আক্রমণ করছে। যে সময় মোদী ফ্রান্সে গিয়ে চুক্তি করেছেন সেই সময়ে ফরাসি রাষ্ট্রপতি স্পষ্ট জানিয়েছেন ‘হ্যাল’কে বাদ দিয়ে আম্বানিদের সঙ্গে চুক্তিতে তাদের কোনও ভূমিকা ছিল না। ভারত সরকারই আম্বানিদের নাম ঠিক করে দিয়েছে। সম্প্রতি আরও জানা গেছে দাসাল্টের শীর্ষ কর্মকর্তা সেই সময় বলেছিলেন বরাত পাবার শর্তই ছিল আম্বানিদের সঙ্গে চুক্তি করা। বরাত যাতে হাতছাড়া না হয় তাই তারা বাধ্য হয়েছে আম্বানিদের সঙ্গে চুক্তি করতে। এখন দেখতে হবে কোন স্বার্থে কিসের বিনিময়ে মোদী আম্বানিদের মুনাফার ব্যবস্থা করতে বেপরোয়া হয়েছিলেন।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement