আগমন ইচ্ছাদোলায়,ফল মস্তি

অম্লানকুসুম চক্রবর্তী   ১২ই অক্টোবর , ২০১৮

‘স্কুলের ব্যাগটা বড্ড ভারী, আমরা কি আর বইতে পারি’-র উপমা মাখা কয়েক লক্ষ শিশুর একটি (আমার-আপনার ইচ্ছেমতো) সম্প্রতি রাজপথে চিকেন ড্রামস্টিক খেতে খেতে একটা আলটপকা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল। হয়ত রক্তদান শিবির উৎসব চলছিল কোথাও। মাইকে তারস্বরে গান বাজছিল, ভোকাট্টা তোমার ভালোবাসা। শিশুর প্রশ্ন, হোয়াট ইজ দিস ভোকাট্টা মাম্মি? সানগ্লাস-টিশার্ট-টর্নড জিন্স-আইলাইনার শোভিতা বছর ত্রিশ-একত্রিশের মাতৃদেবী কয়েক সেকেন্ড ঠোঁট কামড়ালেন। তারপরে বললেন, বেবি, এটা বিশ্বকর্মা পুজোর থিম সঙ। সারাদিনের দুষ্টুমিতে বিন্দুমাত্রও পুষ্টি বাকি ছিল না সেই ভরপুর স্মার্ট বাচ্চার। কুইজ শো-র বাজার রাউন্ডের মতো তার পরের প্রশ্ন, দেন হু ইজ দিস বিশ্বকর্মা, মাম্মি? মা হয়তো জানতেন, কিন্তু বোঝাতে হবে তো! বিপাকে পড়ে, সানগ্লাসটা কপালের উপরে তুলে, সেই আধুনিক মা অগত্যা গুগলের শরণাপন্ন হলেন। স্মার্টফোনে গুগল ইমেজে হাতির উপরে বসা, হাতে ঘুড়ি ধরা একজন লোক। বেবি, লুক। প্রসঙ্গত, দিনটা ছিল গণেশ চতুর্থী। তার তিন-চার দিন পরেই ছিল বিশ্বকর্মা পুজো। শিল্পীদেবতার ইদানীং বাজার ভালো যাচ্ছে না মোটে। হাজার হাজার সিদ্ধিদেবতার ভিড়ে বিশ্বকর্মা যেন অনেকটা নিরুদ্দেশ সম্পর্কিত ঘোষণার মতোই রয়ে গেলেন।

গ্রিন করিডর করে, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, ভিন রাজ্য থেকে অঙ্গ এনে প্রতিস্থাপন করলেও অনেক সময় গ্রহীতার শরীর তা মেনে নিতে চায় না। অনেক অসুবিধার মধ্যে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের অন্যতম অসুবিধা এটাও। তবে ‘কালচার’ প্রতিস্থাপনে কোনও অশুভ শক্তির দৃষ্টি নেই। জয় বাঙালির জয়। হতে পারি দীন তবু নহি মোরা হীন। বারো মাসে তেরো পার্বণের পরেও যা যা কম পড়িয়াছিল, নিজেদের সুবিধামতো সেগুলো আমরা ট্রান্সপ্লান্ট করে নিয়েছি আমাদের কালচার-শরীরে। ভীমের লৌহমূর্তিকে ধৃতরাষ্ট্রের সেই বিখ্যাত আলিঙ্গনের থেকেও প্রবল প্রতাপ নিয়ে আমরা আষ্টেপৃষ্টে বেঁধেছি ভিন-সংস্কৃতি। যেতে নাহি দিব। আমাদের স্কুল জীবনে অনেক পুজো শুরু করার আগে গণেশপুজো ছিল। একদন্তং মহাকায়ং লম্বোদরং গজাননং। কিন্তু একশো ডেসিবেলের গণপতি বাপ্পা মোরিয়া ছিলেন না। কালীপুজো জানতাম। কিন্তু ধন ধনা ধন ধনতেরাস ধনবর্ষা ছিল না। সিদ্ধিদাতার পুজো প্রতি বছর দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে-আকারে-প্রচারে যেভাবে বাড়ছে তাতে মনে হয় মুম্বাইকে টেক্কা দিতে আর বেশি দিন লাগবে না। অফিস ফেরত বাড়ি আসার পথে, গণেশ সপ্তাহে, এবারে দুকানে দুটো পুজোর ডিজে বক্সের আওয়াজ সহ্য করেছি। আর প্রতি দু-আড়াইশো মিটার অন্তর অন্তর সেই জগঝম্পের কম্বিনেশন বদলেছে। সিদ্ধিদাতার মূর্তি পিছনে রেখে প্রতি পুজোতেই সন্ধে নামার পরে সাংস্কৃতিক সিদ্ধিলাভ হয়েছে। সেই সংস্কৃতিচর্চার আওয়াজ নাগেরবাজারের সকেট বোমার থেকে খুব একটা কম ছিল বলে মনে হয় না। প্রতিটা পুজোপ্যান্ডেলের বাইরেই শয়ে শয়ে পথচলতি মানুষ লাইন দিয়ে খিচুড়িভোগ খেয়েছেন। এ পুজোয় খাওয়ার পর আবার অন্য পুজোয় খেয়েছেন। অন্য পুজোর পর ফের অন্য কোথা, অন্য কোনওখানে। কিংবা ক পুজোর পোলাওয়ের পর খ পুজোর আলুর দম। সঙ্গে গ পুজোর পায়েস। দুহাত ভরে পুজো কমিটিকে আশীর্বাদ করেছেন মানুষ। আসছে বছর ‘ভক্তের ভগবান’ তোমাদের যেন আরও বেশি করে দেন। বাজেট আরও বাড়ুক।

ফি বছর পয়লা বৈশাখের দিনকয়েক আগে বাড়িতে আসত বেণীমাধব শীলের ফুল পঞ্জিকা। প্রবাদপ্রতিম সেই বই খুলে সবার আগে যেটা দেখতাম তা হলো দুর্গাপুজো কবে! মনে আছে, পাতাজোড়া দেবী দুর্গার ছবি থাকত। দশভুজাকে দেখে শরীরে-মনে শিহরণ। হাফ-ইয়ারলি পরীক্ষার পরেই ছুটির মজা। সেই ফেলে আসা স্কুলজীবন। বেচারা না খেতে পাওয়া আমাদের আনস্মার্ট বাংলা মিডিয়াম। নতুন শতাব্দী আসতে তখনও আর কয়েকটা বছর বাকি। আজ তা হয়ত পাতা হলুদ হয়ে যাওয়া একটা বই। কিন্তু তখন পুজো আসত পুজোর সময়ে। পুজোর থেকেও পুজো আসছে পুজো আসছে, এই ভাবটা ছিল আনন্দের। সপ্তমী, অষ্টমীর পরেই সেই মন কেমন করা নবমী নিশি, যেও না, প্লিজ যেও না। দুগ্গাঠাকুর তখনও কার্নিভালের প্রতীক হয়ে যাননি। তাঁর আসা যাওয়ার মধ্যে একটা নিয়ম ছিল। আজ মনে হয়, দেবী কবে আসবেন, অর্থাৎ তাঁকে আনা হবে কবে, তার ট্রাফিক সিগন্যাল আমাদেরই হাতে। কোনও হাইটেক পঞ্জিকা থাকলে হয়ত লিখত, নৌকায় নয়, ঘোটকে কিংবা গজেও নয়, মা দুর্গার আগমন ইচ্ছাদোলায়। ফল মস্তি। তাঁর গমনও ওই দোলাতেই, ইচ্ছায় ভর করে। এই লেখা লিখছি যখন, তখনও মহালয়ার দিন দুয়েক বাকি। কিন্তু শহরে মহাপুজোর উদ্বোধন হওয়া শুরু হয়ে গিয়েছে। তুমুল জনপ্রিয় জনপ্রতিনিধিই ফিতে কেটে এসেছেন। রাস্তায় এক সত্তরোর্ধ্ব ব্যক্তিকে কাল সকালে চশমার কাচ মুছতে মুছতে মৃদু গলায় বলতে শুনলাম, বীরেন ভদ্রের গলা শোনার আগেই দেবীর মুখ দেখা যায়, এমনটা দেখতে হবে জীবনে কোনোদিন ভাবিনি ভাই।

এখন তো ডিজিটাল সুতোয় টান মারলেই দুর্গাপুজো। আগের দিন শপিং কাম ইটিং আউটে পেটে একটু বেশি পানি পড়ে গেলেও পরের দিন ভোররাতে মহিষাসুরমর্দিনী শোনার জন্য উঠে পড়ার কোনও তাড়া নেই। আপনার সময় হলে, আপনার মরজিমতো মোবাইলে আসবেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। স্তোত্রপাঠ করবেন, ঠিক আপনি যে ক’চামচ চান। উবের-ওলা বুক করার পরে ড্রাইভার আসতে যতটুকু সময় লাগে ততক্ষণ শুনে নেওয়া যেতে পারে মহালয়ার ফিলার। গাড়িতে উঠলেই তো ঝিঙ্কা-চিকা। অথবা মনে করা যাক, যেমনটা চলেছিল মেট্রোরেলে, গত বছর। জাগো দুর্গা, জাগো দশপ্রহরণ...পরবর্তী স্টেশন চাঁদনি চক, প্লাটফর্ম ডানদিকে...হারিনী, অভয়াশক্তি বলপ্রদায়িনী তুমি..স্টেশন চাঁদনিচক...জাগো। এ বারও হয়ত চলবে। জানি না।

এ ভাবেই দেবী আসছেন। প্রতি বছর। কে বলে ষষ্ঠীতে পুজোর উদ্বোধন? দরজা খুলুন। এক্ষুনি। দেখবেন দেবী দাঁড়িয়ে আছেন, আপনারই জন্য। কলিং বেল বাজাতে তিনিই হয়ত ইতস্তত করছেন। এখনই মোটামুটি দিন পনেরোর কার্নিভাল। প্রতি বছর দেখি দু-তিন দিন করে বাড়ে। এভাবে যদি চলতে থাকে, আর কয়েক বছর পরে মাসখানেকের উৎসবে পরিণত হবে দুর্গাপুজো। রাজ্য সরকারি কর্মীদের চিন্তা নেই। ছুটি পেয়ে যাবেন! বেসরকারি চাকরি যাঁরা করেন তাঁরা পড়বেন মহা বিপদে। চারদিকে পুজো পুজো গন্ধ। কিন্তু সেই গন্ধে ঘাম।

এক গুরুজন বলেছিলেন, প্রতিমা নিরঞ্জনের আগে নাকি শুভ বিজয়া বলতে নেই। দক্ষিণ কলকাতায় আমার এক আত্মীয়কে গতবার পাঁচবার বিজয়ার শুভেচ্ছা জানিয়েও ফিরিয়ে নিতে হয়েছিল। প্রতিবারই শুনতে হয়েছিল, ‘এখন তো শুভেচ্ছা নেওয়া যাবে না বাবা। মণ্ডপে প্রতিমা রয়েছেন।’ ও দিকে আমাদের বাড়িতে হয়ত লক্ষ্মীপুজোর ফর্দ রেডি। তাঁদের পাড়ার পুজোর ভারতজোড়া নাম। এই বছর তিনি কথা দিয়েছেন, নিরঞ্জনের পরে নিজেই অন্যদের জানিয়ে দেবেন, ‘এ বারে শুভেচ্ছা পাঠাতে পারো!’

গণেশ চতুর্থীর সঙ্গে ক্যালেন্ডারের পাতায় টক্কর দেওয়ার জন্যই হয়ত দৌড়ে ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছেন বিশ্বকর্মা। কম্পিটিশন অব দ্য ফিটেস্ট। কিচ্ছু করার নেই। সম্প্রতি এক অণুপ্রেরিতকে অণুপ্রেরণামাখা বাসস্ট্যান্ডে রাত সাড়ে এগারোটা নাগাদ বলতে শুনেছিলাম, ‘কচুয়াকে মেগা ইভেন্ট বানিয়ে দিয়েছি। গণেশও দারুণ অ্যাচিভ করছে। নেক্সট ইয়ার ইচ্ছে আছে মা শীতলা আর মা মনসাকে বড় করার। ওই সময়টা খুব ড্রাই যায়।’ পাশ থেকে কোরাস, ‘ইয়েস, গুরু, ইয়েস।’

INTRO

উৎসব আমাদের সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটায়। কিন্তু বাঙালি কি উৎসবে আদৌ নিজের সংস্কৃতির চর্চা করছে? নাকি চারিপাশের অন্ধকার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে রাখতে নানা অছিলায় আমাদের কেবল ভোগ স্ফূর্তিতে ডুবিয়ে রাখা হচ্ছে? পুজোর নামে চলতি রমরমার মধ্যে ঐতিহ্যের শিকড় নয়, ‘মেগা ইভেন্ট’এর উদ্দেশ্য দেখতে পেয়েছেন লেখক, তুলে ধরেছেন এই নিবন্ধে।





Current Affairs

Featured Posts

Advertisement