নাট্যকার শিব শর্মা’র জীবনাবসান

নিজস্ব প্রতিনিধি   ১২ই অক্টোবর , ২০১৮

কলকাতা, ১১ই অক্টোবর — বিশিষ্ট নাট্যকার শিব শর্মার জীবনাবসান হয়েছে। বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় দীর্ঘ কয়েক বছর ঢাকুরিয়ার বাড়িতেই ছিলেন। কিন্তু জীবন থেকে নাটককে কখনও বিদায় জানাননি। বৃহস্পতিবার জীবনাবসানের সময় বয়স হয়েছিল ৮১। কয়েক বছর আগেই স্ত্রী প্রয়াত হয়েছেন। এক কন্যা বর্তমান। রেখে গেছেন অসংখ্য নাট্যকর্মী। শিব শর্মার জীবনাবসানে শোক জ্ঞাপন করেছেন পশ্চিমবঙ্গ গণতান্ত্রিক লেখক শিল্পী সঙ্ঘের যুগ্ম সম্পাদক পার্থ রাহা ও রজত বন্দ্যোপাধ্যায়। এক শোকবার্তায় তাঁরা বলেছেন, লেখক শিল্পী সঙ্ঘের সঙ্গে নাট্যকার শিব শর্মার সম্পর্ক প্রায় সূচনালগ্ন থেকেই। সন্ত্রাসের সেই কালোদিনগুলিতে শিব শর্মার নাটক পথের দিশা দিয়েছে। ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘ, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির পক্ষে দিব্যেন্দু চট্টোপাধ্যায় এক শোকবার্তায় উল্লেখ করেছেন ভারতীয় গণনাট্য সংঘের পরম আত্মজ - সুহৃদ, নাট্যকার, গ্রুপ থিয়েটার পত্রিকার সম্পাদক, প্রগতি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম অগ্রণী ব্যক্তিত্ব শিব শর্মা গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনকে সমৃদ্ধ করেছেন। গ্রুপ থিয়েটার পত্রিকার সম্পাদক দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় শোক প্রকাশ করে বলেছেন শিবদা ছিলেন গ্রুপ থিয়েটার পত্রিকার প্রাণশক্তি ও অভিভাবকের মতো।

শিব শর্মার প্রকৃত নাম প্রমথেশ চন্দ্র মজুমদার। অধুনা বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলায় ১৯৩৭সালের ২৯শে জুলাই তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পিতা অধ্যাপক দীনেশচন্দ্র মজুমদার। দেশভাগের পর ঢাকুরিয়ায় উদ্বাস্তু (বাপুজী) কলোনিতে চলে আসেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞানে স্নাতক হন। রাজ্য সেচ দপ্তরের অধীন রিভার রিসার্চ ইনস্টিটিউটে কর্মজীবন শুরু আর এখান থেকেই ১৯৯৬ সালে অবসর গ্রহণ করেন। কর্মজীবনে সরকারি কর্মচারী আন্দোলনের সাথে যুক্ত হন। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারি কর্মচারী সমিতির মুখপত্র ‘সমন্বয়’ পত্রিকায় আড়াই দশকের বেশি সম্পাদক ছিলেন। ১৯৭৮সালে গ্রুপ থিয়েটার পত্রিকার সাথে যুক্ত হন এবং শেষজীবনে প্রধান সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে গেছেন। প্রথমজীবনে তিনি কিশোরবাহিনীরও অন্যতম সংগঠক ছিলেন। প্রতিবছর কিশোরবাহিনীর প্রতিষ্ঠা দিবসে শিশু কিশোরদের উপযোগী নাটক লিখে পরিচালনা করতেন। গত শতাব্দীর সাতের দশকে তাঁর ওপর আক্রমণ নেমে আসে এবং ১৯৭২ থেকে ১৯৭৭পর্যন্ত এলাকা ছাড়া ছিলেন। তিনি সি পি আই (এম)- র সদস্য ছিলেন। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি পার্টির সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন।

নাট্যকার শিব শর্মা লিখেছেন ছোটবড় অসংখ্য নাটক। কাশীনাথের জন্মান্তর তাঁর প্রথম নাটক। এছাড়া নয়নপুরের পদ্ম, স্বাধীনতার বর্ণমালা, খুনির খোঁজে (স্তালিনের জন্মশতবর্ষে), আহ্বান ( লেনিন জন্মশতবর্ষে), মরা গাঙে বান, রক্ত থেকে জন্ম, সাধুবাবা, আজ কাল পরশু, জয়াদের কথা, বিধ্বস্ত দিন, হারানো প্রাপ্তি, আত্মহত্যা, কেনাবেচার গল্প, তদন্ত সংবাদ, রাজাধিরাজ দর্শন উল্লেখযোগ্য। ২০০৯সালে পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমির শ্রেষ্ঠ নাট্যকারের পুরস্কার পান। লিখেছেন নির্বাচনী সংগ্রামে বামফ্রন্টের সমর্থনে পথনাটক। পশ্চিমবাংলার বিভিন্ন নাট্যদল এখনও শিব শর্মার নাটক মঞ্চস্থ করে চলেছে।

নাট্যকার শিব শর্মার অন্তিমযাত্রায় রক্তপতাকা দিয়ে শ্রদ্ধা জানান স্থানীয় পার্টিনেতা অচ্যুৎ চক্রবর্তী ও সৌভিক বসু। ঢাকুরিয়ার বাড়িতে ফুলমালা দিয়ে শ্রদ্ধা জানান ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘ, পশ্চিমবঙ্গ, গ্রুপ থিয়েটার পত্রিকা, নাট্যকার সুমিত দে, তাপস চক্রবর্তী, স্থানীয় পৌরপ্রতিনিধি মধুছন্দা দেব, নাগরিক কমিটির পক্ষে অমিতাভ মুখোপাধ্যায়, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারি কর্মচারী পেনশনার সমিতির পক্ষে ভানুদেব চক্রবর্তী, অলকেন্দু চট্টোপাধ্যায়, সুজিত দাশগুপ্ত, ইউ সি আর সি-র পক্ষে গৌতম দাশগুপ্ত, বাপুজী নগর কলোনি কমিটির পক্ষে সমীর দাশগুপ্ত, সি আই টি ইউ ও বনলতা মহিলা সাংস্কৃতিক সংস্থা। রাজ্য সরকারি কর্মচারী সমিতির কেন্দ্রীয় দপ্তরে দেহ আনা হলে সেখানে মাল্যদান করেন রাজ্য কো-অর্ডিনেশন কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিজয়শংকর সিনহা ও নেতৃবৃন্দ। বৃহস্পতিবার দুপুরেই কেওড়াতলা শ্মশানে নাট্যকারের শেষকৃত্য হয়।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement