এবার কি উচ্ছেদ?আতঙ্কেই
দিন কাটছে নারায়ণপল্লিবাসীর

নিজস্ব প্রতিনিধি   ২২শে অক্টোবর , ২০১৮

কলকাতা, ২০শে অক্টোবর—শারদোৎসবের পর কী হবে? আতঙ্ক ফিরছে গরিব মানুষের।

নির্বিঘ্নে উৎসব কাটলেও আতঙ্ক কাটেনি। এরপর কী হবে? সেই চিন্তাই তাড়া করছে ২৫পরিবারকে। ‘পুজোর মধ্যেই আমরা সবাই বসেছিলাম। তখনই একবার আলোচনা ওঠে। সবাই আশায় ছিলাম, এখন তো পুজো এখন কিছু হবে না। কিন্তু পুজোর পর কী হবে? সেই চিন্তাই এখন বাড়ছে।’ বলছিলেন এক কলোনিবাসী।

পুজোর আগেই ঘর দুয়ারের ভিতরে ঢুকে মাপজোক করে গিয়েছে সরকারি লোকজন। পাড়া, রাস্তা, উঠোন সবই ঢুকেছে সরকারি মাপের খাতায়। উৎসবের আগেই তাই উচ্ছেদ আতঙ্ক গ্রাস করেছে নারায়ণপল্লিকে।

গরিব মানুষের এই পল্লিতে দুর্গাপুজো হয়। কিন্তু এবছর পুজোর দুদিন আগে প্যান্ডেল হয়েছে। নতুন জামাকাপড় কারোর পরনে ছিল কিনা নিজেরাই জানেন না। আতঙ্কের মধ্যে উৎসব কাটিয়ে এখন নয়া আশঙ্কা।

গত সেপ্টেম্বর মাসে এক সকালে ১২থেকে ১৫জনের একটা দল আসে নারায়ণপল্লির বস্তিতে। ঢোকার পর থেকে শুরু হয়ে যায় ফিতে ফেলে মাপজোক। এলাকাবাসী পরিচয় জানতে চেয়েছিলেন? উত্তর এসেছিল, সরকারের মাপজোক চলছে। কোন সরকার? জবাব এসেছিল, জানেন না সরকার কটা? সি এম-র অর্ডার আছে জানিয়ে ঘরের মধ্যে বস্তির ঘরে ঢুকে চলে মাপামাপি। ‘ওঁদের এমন উগ্র মেজাজ ছিল পারলে যেন সেদিনই আমাদের কলোনিকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে যাবে,’ বলছিলেন এক বাসিন্দা। ওই সময় কলোনিতে পুরুষরা সব কাজে। বেশিরভাগই মহিলা। তাঁরাই কাজে বাধা দেন সরকারি কর্মীদের। পরিচয় জানতে চান। জানতে চান উচ্ছেদ করার জন্য মাপজোক করছেন, তাহলে আমাদের পুনর্বাসনের কথা বলুন। জবাব এসেছিল, আমরা ওসব কিছু জানি না। মাপজোক থামিয়ে দিয়ে কলোনির বাসিন্দারা জানিয়ে দেন, পুনর্বাসন দিতে যখন জানেন না, তাহলে ভাঙতে এসেছেন কেন? বাধা পেয়ে ফিরে যায় সরকারি লোকজন।

কোনা এক্সপ্রেস ওয়ে যেখানে দক্ষিণ-পূর্ব রেলপথের ওপর দিয়ে ফ্লাইওভারে উঠেছে সেখানে বাস বস্তিবাসী নারায়ণপল্লির গরিব মানুষের। নারায়ণপল্লির পাশ ধরে একের পর এক গরিব মানুষের গেরস্থালি। বঙ্গলক্ষী কলোনি, সরস্বতী কলোনি, সর্বমঙ্গলা কলোনি, ইন্দিরা কলোনি— খেটে খাওয়া মানুষের আস্তানা। টালির চাল, দরমার বেড়া। সেই ভিটেতেই এখন উচ্ছেদ আতঙ্ক। সবমিলিয়ে ৮০০থেকে ১হাজার পরিবারের ওপর কোথাও রেল কোথাও রাজ্য সরকারের উচ্ছেদ হওয়ার নোটিস। ‘রেল এখন চুপচাপ আছে। রাজ্য সরকার এখন নারায়ণপল্লির মানুষের ওপর উচ্ছেদের আতঙ্ক তৈরি করেছে। আমরা বলছি, পুনর্বাসন ছাড়া কোনোভাবে একজনকেও উচ্ছেদ করা যাবে না।’ জানিয়েছেন সি পি আই (এম) দক্ষিণ হাওড়া এরিয়া কমিটির সম্পাদক সুমিত্রা অধিকারী।

সামনে কোনা এক্সপ্রেসওয়ে। পিছনে দক্ষিণ-পূর্ব রেলের সাঁতরাগাছি শালিমার রেলপথ। দুই সরকারের সাঁড়াশি চাপে এখন নারায়ণপল্লির মানুষ। এক বছর আগে রেল মন্ত্রক জমির জন্য সাত পরিবারকে উচ্ছেদ হতে হয়েছে। তখন কলোনির মধ্যেই নিজেদের জায়গা ছেড়ে উচ্ছেদ হওয়া পরিবারের স্থান করে দেওয়া হয়েছে। ওই সময়ই কলোনি উন্নয়ন সম্পাদককেই ক্লাব ঘরে পরিবার নিয়ে থাকতে হচ্ছে। সেই সময় পরিস্থিতি সামলে নেওয়া গেলেও এখন নয়া বিপদ কোনা এক্সপ্রেসওয়ের চওড়া করার পরিকল্পনা নেওয়াতে।

সাঁতরাগাছির ওপর দিয়ে নতুন ফ্লাইওভার নামবে। রাস্তা চওড়া হবে। তাই উচ্ছেদ হতে হবে বস্তিবাসী মানুষকে। সরকারের পরিকল্পনা রূপায়ণ হোক, চান কলোনির বাসিন্দারা। কিন্তু পরিকল্পনার সঙ্গে চাই উচ্ছেদ হওয়া মানুষের পুনর্বাসন। সেই দাবিও করছেন এলাকার মানুষ। কিন্তু সেই পুনর্বাসন নিয়ে একটি কথাও বলছে না প্রশাসন। বরং মোপজোক করতে আসা সরকারি কর্মচারীদের পুনর্বাসনের দাবি করায় জবাব এসেছিল, ‘পুনর্বাসন দিতে গেলে তো উন্নয়ন করাই যাবে না।’

১৯৯৬সালে চার লেনের কোনা এক্সপ্রেস তৈরির সময় উচ্ছেদ হতে হয়েছিল নারায়ণপল্লির ৮টি পরিবারকে। রাজ্যে তখন বামফ্রন্ট সরকার। উচ্ছেদ এলাকা থেকে সামান্য দূরে হাওড়া ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্টের (এইচ আই টি) জমিতে পুনর্বাসন দেওয়া হয়েছিল। এখনও বালির মাঠ এলাকায় এইচ আই টি-র জমি পড়ে আছে। ওই জমিতেই উচ্ছেদ হওয়া মানুষের পুনর্বাসনের দাবির কথাও তুলেছেন নারায়ণপল্লির বাসিন্দারা। ‘‘৩২টা প্লট খালি পড়ে আছে। আর আর (উদ্বাস্তু পুনর্বাসন) দপ্তরে আমরা তালিকা করে রিপোর্টও জমা দিয়েছিলাম। আমরা যেতে ইচ্ছুক বলে জানিয়েছি। কিন্তু উদ্বাস্তু পুনর্বাসন দপ্তর থেকে কোনও কিছু বলা হচ্ছে না।’ জানিয়েছেন নারায়ণপল্লি উন্নয়ন সমিতির নির্বাচিত সম্পাদক সুভাষ রায়।

সরকার মামজোক করার তোড়জোড় করতেই নিজেদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হওয়ার আশঙ্কায় এখন চেপে বসেছে কলোনির বাসিন্দাদের। ‘আমরা এইচ আই টি, আর আর, পি ডব্লিউ ডি, জেলাশাসক সবার কাছে ডেপুটেশন দিয়েছি। কিন্তু কারোর কোনও হেলদোল নেই,’ বলছিলেন সম্মিলিত কেন্দ্রীয় বাস্তুহারা পরিষদ (ইউ সি আর সি)-র হাওড়া জেলা সম্পাদক অমিত চক্রবর্তী।

গত সেপ্টেম্বর থেকে এখন উচ্ছেদ আতঙ্ক নারায়ণপল্লির। এরইমধ্যে গত ২৩শে অক্টোবর কলোনির কমিটি নির্বাচনে ইস্যু ছিল উচ্ছেদ। সেই উচ্ছেদের বিরুদ্ধে মানুষ ভোট দিয়ে ইউ সি আর সি-র সাত প্রতিনিধিকে নির্বাচিত করেছে। দুজন নির্দল জয়ী হয়েছেন। উচ্ছেদের বিরুদ্ধে গত ৯ই অক্টোবর গণকনভেনশন আয়োজন করেছিল কলোনির মানুষ। সেখানে উপস্থিত ছিলেন প্রাক্তন সাংসদ জ্যোতির্ময়ী শিকদার। পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ হলে মানবে না মানুষ, জানিয়ে দিয়েছে কনভেনশনও।

উৎসব ছিল বলে হাত গুটিয়ে বসে আছে প্রশাসন। উৎসব মিটেছে। এরপর কী হবে? আতঙ্কে গরিব মানুষ।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement