সুভাষচন্দ্রের ঐতিহ্যকে আত্মসাতের
চেষ্টা করলেন ভোটমুখী মোদী

নিজস্ব প্রতিনিধি   ২২শে অক্টোবর , ২০১৮

নয়াদিল্লি, ২১শে অক্টোবর— আর কয়েক মাস পরেই লোকসভা নির্বাচন। এবার সুভাষচন্দ্র বসুর ঐতিহ্যকে আত্মসাৎ করার চেষ্টা করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। রবিবার আজাদ হিন্দ সরকার ঘোষণার ৭৫ তম বার্ষিকী উপলক্ষে লালকেল্লায় জাতীয় পতাকা তুলে মোদী যে ভাষণ দিলেন তাতে সেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য তেমন গোপন থাকেনি। মোদী বললেন, সুভাষচন্দ্র পূর্ব ও উত্তর পূর্ব ভারতে জোর দিয়েছিলেন। এতদিন এই দুই এলাকা অবহেলিত ছিল। এখন তাঁর সরকার উত্তর পূর্ব ভারতকে ‘বৃদ্ধির চালিকাশক্তি’ হিসাবে দেখছে। লোকসভা ভোটে বি জে পি-র বিশেষ নজর রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ, ওডিশা, উত্তর পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলিতে। এই এলাকা থেকে আসন সংখ্যা বাড়ানো দলের পক্ষে খুবই জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে। সারা ভারতেই সম্মানিত সুভাষচন্দ্রের পশ্চিমবঙ্গে প্রভাব ঐতিহাসিক, ওডিশাতেও তাঁর গভীর প্রভাব রয়েছে। আজাদ হিন্দ বাহিনী এসেছিল মণিপুর পর্যন্ত।

প্রধানমন্ত্রী এদিনের ভাষণে আক্রমণ করেন নেহরু-গান্ধী পরিবারকে। তাঁর অভিযোগ, ‘এক পরিবারকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে বল্লভভাই প্যাটেল, আম্বেদকর, সুভাষচন্দ্রের অবদানকে ভুলিয়ে দেবার চেষ্টা হয়েছে।’ স্বাধীনতাউত্তর ভারতে সরকারি ইতিহাসের ভাষ্যে সুভাষচন্দ্র ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যান্য বিপ্লবী ধারাগুলির অবদানকে খাটো করার অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু মোদী যে মতাদর্শগত ও সাংগঠনিক ধারার প্রতিনিধিত্ব করেন স্বাধীনতা সংগ্রামে তাদের কোনও ভূমিকাই ছিল না। বরং সুভাষচন্দ্র যখন নানা পদ্ধতিতে দেশের স্বাধীনতার জন্য দুঃসাহসী লড়াই চালাচ্ছেন তখন হিন্দু মহাসভা, আর এস এস ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে নাম লেখাতে ব্যস্ত। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বদলে ধর্মীয় গৃহযুদ্ধেরই প্রস্তুতি নিয়েছেন হিন্দুত্ববাদী নেতারা। সাভারকার থেকে শ্যামাপ্রসাদ সুভাষচন্দ্র ও স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রবহমান ধারার বিরোধিতা করেছিলেন।

আজাদ হিন্দ বাহিনীর পরিচিত টুপি মাথায় পরে প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে বলেন, ‘সুভাষচন্দ্র চেয়েছিলেন এমন এক ভারত যেখানে সকলের সমান অধিকার ও সুযোগ থাকবে। ভাগ কর ও শাসন কর নীতির তিনি বিরোধিতা করেছিলেন।’ মোদী সরকারের বিরুদ্ধে বৃহত্তম অভিযোগ দেশের মানুষের মধ্যে মেরুকরণের। ধর্মীয় পরিচিতিকে ব্যবহার করে ঘৃণা ও বৈরিতার বাতাবরণ তৈরি করা হচ্ছে। সঙ্ঘ পরিবারের সমস্ত সংগঠন সংখ্যালঘু-বিদ্বেষ, দলিত-বিদ্বেষ তৈরি করছে। আজাদ হিন্দ বাহিনী ছিল দেশের জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে ঐক্যের প্রতীক। স্বভাবতই ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষার প্রশ্নটিকেই সচেতন ভাবে এড়িয়ে গিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সুভাষচন্দ্র সাম্প্রদায়িক শক্তিকে, হিন্দুত্ববাদী শক্তিকে ঘৃণা করতেন— ইতিহাসের এই সত্যের ধারকাছ দিয়েও যাননি মোদী।

এদিনটি প্রতি বছরই পালিত হয় পুলিশ দিবস হিসাবে। প্রধানমন্ত্রী সুভাষচন্দ্রকে জড়িয়ে দেন পুলিশের ‘আত্মত্যাগের’ সঙ্গেও। তিনি ঘোষণা করেন এবার থেকে সুভাষচন্দ্রের নামে সাহসী কাজের জন্য পুলিশকর্মীদের সম্মান দেওয়া হবে।

এদিন প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের সমালোচনা করে কংগ্রেস বলেছে, যাদের নিজেদের স্বাধীনতা সংগ্রামে কোনওই অবদান নেই, নিজেদের কোনও বীর নেই, তারা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নাম ব্যবহার করে জাতীয়তাবাদী সাজতে চাইছে। প্রধানমন্ত্রী ঠিক তাই করেছেন। আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন, লালকেল্লায় আই এন এ বন্দিদের বিচারের সময়ে কোনও সঙ্ঘী তাদের সমর্থনে নেমেছিলেন? উত্তর হলো—না।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement