উজালা যোজনার দফারফা
গ্যাসের দামে নাভিশ্বাস
গরিব মানুষের

পীযূষ ব্যানার্জি   ২২শে অক্টোবর , ২০১৮

কলকাতা, ২১শে অক্টোবর— সিলিন্ডার থেকে সরে আবার কেরোসিন কয়লায় ফিরছে গরিবের হেঁসেল।

সরকারের কথায় ভরতুকি পেয়ে গ্যাসের সংযোগ নিয়েছিলেন বি পি এল তালিকায় থাকা গরিব মহিলা। কিন্তু রান্নার গ্যাসের চড়া দামে এখন আর পেরে উঠতে পারছেন না। সুযোগ নিয়েও ব্যবহার করাই এখন দুষ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে গরিব মানুষের। বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন সিলিন্ডারের ব্যবহার।

‘গত সপ্তাহে গ্যাস দিতে এসেছিল ৯০৭টাকা নিয়ে গেছে। গ্যাসের এত দাম, এখন কী কাজে লাগবে। গ্যাসটা সাজানো আছে বাড়িতে।’ বলছিলেন উলুবেড়িয়ার ময়নাপুর গ্রামের মলিনা ঘোড়া। দারিদ্রসীমার নিচে থাকা মলিনা দেবী দুবছর আগে প্রধানমন্ত্রী উজালা যোজনায় রান্নার গ্যাস নিয়েছিলেন। গত দুবছরে উনি মাত্র সাত বার সিলিন্ডার পালটাতে পেরেছেন।

বি পি এল তালিকায় থাকা পরিবারের মহিলাদের জন্য সিলিন্ডারে রান্নার সুযোগ দেওয়ার জন্য ২০১৬সালে প্রধানমন্ত্রী উজালা যোজনা চালু করেছিল কেন্দ্রীয় সরকার। কাঠ কয়লা, শুকনো ডালপালা, কেরোসিনের দূষণ থেকে গরিব মানুষকে রক্ষা করতে ‘আচ্ছে দিন’ আনার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বি পি এল পরিবারের গ্যাসের জন্য ১৬০০টাকা করে ভরতুকির ব্যবস্থা করে সরকার। সিকিউরিটি ডিপোজিটের ১৬০০টাকা দিতে হবে না। কিন্তু সাড়ে ১৪কেজি ওজনের সিলিন্ডারের পুরো টাকাটাই দিতে হবে গরিব মানুষকে। আর তা কিনতে গিয়ে এখন নাভিশ্বাস গরিব মানুষের।

গত এপ্রিল মাসে রান্নার গ্যাসের দাম ছিল ৬৭৪টাকা। পাঁচ মাস পর চলতি অক্টোবর মাসে কলকাতা শহরে রান্নার গ্যাসের দাম ৯০৭টাকা ৫০পয়সা। ২৩১টাকা দাম বেড়েছে। ৩৪শতাংশ এই বাড়তি দাম দিতে গিয়ে গ্যাসের ব্যবহার করাই বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছে বি পি এল রান্নার গ্যাসের গ্রাহকরা। ‘ব্যাঙ্কে কখন টাকা ঢুকবে সেই হিসাব রাখলে আমাদের গরিব মানুষের চলবে। আমাকে তো এখন ৯০৭টাকা দিয়ে গ্যাস কিনতে হবে। প্রতি মাসে যেভাবে দাম বাড়ছে গ্যাস ব্যবহার করা বন্ধ করে দিয়েছি। আবার শুকনো ডালপালা, নারকেল পাতা শুকিয়ে জ্বালানি করছি।’ বলছিলেন প্রধানমন্ত্রী উজালা যোজনার এক গ্রাহক।

প্রধানমন্ত্রীর ছবি দিয়ে উজালা যোজনার এই প্রকল্প রূপায়ণের সময়ে সরকারের ভরতুকি পেয়ে গোটা দেশেই বহু গরিব মানুষ রান্নার গ্যাসের সংযোগও নেন। প্রতিদিন কাঠকুটো জোগাড় করে, কয়লা-কেরোসিন পুড়িয়ে রান্নার করার ব্যবস্থায় শুরুতে পরিবর্তনও এসেছিল গরিবের হেঁসেলে। কিন্তু এখন গোটা দেশ তো বটেই এরাজ্যেও দ্রুত কমছে প্রধানমন্ত্রী উজালা যোজনায় পাওয়া রান্নার গ্যাসের ব্যবহার।

ঘুরিয়ে এর ফল ভুগতে হচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত গ্যাস কোম্পানিগুলিকেও। রান্নার গ্যাসের সংযোগের জন্য উজালা যোজনায় সিকিউরিটি ডিপোজিটের ১৬০০টাকা দিতে হয় না গ্রাহকদের। কিন্তু তার বাইরে উনুন (ওভেন), গ্যাস, পাইপ সহ নতুন সংযোগের জন্য প্রায় ২হাজার টাকা খরচ হয়। গরিব মানুষের জন্য কিস্তিতে টাকা মেটানোর ব্যবস্থা আছে প্রধানমন্ত্রী উজালা যোজনায়। সিলিন্ডার শেষ হওয়ার নতুন সিলিন্ডার নেওয়ার সময় কিস্তির টাকা মেটাতে হবে। কিন্তু সেই কিস্তির টাকাই এখন আর ফেরত পাচ্ছে না রাষ্ট্রায়ত্ত গ্যাস কোম্পানিগুলি। কারণ, রান্নার গ্যাসের চড়া দামে গরিব মানুষ কার্যত সিলিন্ডার ব্যবহার করাই বন্ধ করে দিয়েছেন। ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির কোটি টাকা উদ্ধার করা বড় মাথাব্যথা হয়ে গেছে।

প্রধানমন্ত্রী উজালা যোজনায় শীর্ষে উত্তর প্রদেশ। তারপর পশ্চিমবঙ্গ। সাড়ে ১৯লক্ষ গ্রাহক আছে এরাজ্যে। কিন্তু এখন অনেক গরিব মানুষের কাছেও রান্নার গ্যাস বড় বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গত ছয় মাসে গ্যাসের দাম চড়া হারে বেড়েছে। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে সিলিন্ডারের জন্য দাম পড়তো ৬৭৬টাকা। মে মাসে দুটাকা কমে হয়েছিল ৬৭৪টাকা। তারপর থেকে চড়া হারে বেড়েছে গ্যাসের দাম। জুন মাসে এক ধাক্কায় সিলিন্ডারের দাম পৌঁছায় ৭২৪টাকা। ৫০টাকা দাম বাড়ে। পরের মাসেই ৫৭টাকা ৫০পয়সা দাম বেড়ে গ্যাসের দাম হয়ে যায় ৭৮১টাকা। জুলাই মাসের পর আগস্ট, সেপ্টেম্বর এই দুই মাসে পরপর ৩৬টাকা ও ৩১টাকা দাম বেড়ে সিলিন্ডার পিছু দাম দাঁড়ায় যথাক্রমে ৮১৭টাকা ৫০পয়সা ও ৮৪৯টাকা ৫০পয়সা। উৎসবের মাস অক্টোবরে রান্নার গ্যাসের দাম বেড়ে হয় ৯০৭টাকা। এক মাসে আবার ৫৮টাকা বেড়ে যায় দাম।

এখন যে ৯০৭ টাকা সিলিন্ডারের জন্য দিতে হচ্ছে তাতে গ্যাসের দাম আসলে ৫০৬টাকা। সরকার ভরতুকি দিচ্ছে ৪০১টাকা। ভরতুকির এই টাকা গ্রাহকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে যাচ্ছে। কিন্তু কখন এই টাকা ব্যাঙ্কে ঢুকবে তারও কোনও নিশ্চয়তা নেই।

বছর তিনেক আগে রান্নার গ্যাসের দাম কম ছিল। তখন সরকারের ‘গিভ ইট আপ’ পরিকল্পনায় সাড়া দিয়ে অনেকেই ভরতুকি ছেড়ে দেয়। কিন্তু এখন অনেকেই গ্যাসের চড়া দর দেখে ফের পুরনো পথেই ফিরতে চাইছে।

শুধু গৃহস্থালির রান্নার গ্যাসের দামই চড়া হারে বাড়ছে না। হু হু করে বাড়ছে হোটেল, রেস্টুরেন্ট, মিষ্টির দোকানে ব্যবহৃত বাণিজ্যিক প্রয়োজনে সিলিন্ডারের দামও। একমাস আগেও ১৪৭৫টাকা ছিল সিলিন্ডার। এখন সেই সিলিন্ডারের দাম ৮৮টাকা বেড়ে ১৫৬৩টাকা। ফলে মিষ্টিসহ খাবারের দামও বাড়ছে।

=============================

রান্নার গ্যাসের দাম

এপ্রিল ২০১৮- ৬৭৬টাকা

মে ২০১৮- ৬৭৪টাকা

জুন ২০১৮- ৭২৪টাকা ৫০পয়সা ( ৫০টাকা বেশি)

জুলাই ২০১৮-৭৮১টাকা ৫০পয়সা (৫৭টাকা ৫০পয়সা বেশি)

আগস্ট ২০১৮-৮১৭টাকা ৫০পয়সা (৩৬টাকা বেশি)।

সেপ্টেম্বর ২০১৮-৮৪৯টাকা ৫০পয়সা (৩১টাকা ৫০পয়সা)

অক্টোবর ২০১৮- ৯০৭টাকা ৫০পয়সা (৫৮টাকা বেশি)।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement