নোটবাতিলের দুবছর
নতুন ব্যাখ্যা, গরমিল অঙ্কেও

নিজস্ব প্রতিনিধি   ৯ই নভেম্বর , ২০১৮

নয়াদিল্লি, ৮ই নভেম্বর- নোট বাতিলের দ্বিতীয় বার্ষিকীর দিন কেন্দ্রের অর্থমন্ত্রী দাবি করলেন নগদ টাকা বাজেয়াপ্ত করা সরকারের উদ্দেশ্য ছিল না। উদ্দেশ্য ছিল ‘আনুষ্ঠানিক’ অর্থনীতির জোর বাড়ানো এবং করের ভিত্তি সম্প্রসারিত করা। তা সফলও হয়েছে বলে বৃহস্পতিবার দাবি করেছে অরুণ জেটলি। গত দুবছর ধরেই নোট বাতিলের উদ্দেশ্য কী, তা নিয়ে ক্রমাগত নতুন নতুন ভাষ্য পেশ করেছে কেন্দ্র। সেই ধারা বজায় রেখেই এদিন আবার একগুচ্ছ নতুন কারণ সামনে এনেছেন জেটলি।

২০১৬-র ৮ই নভেম্বর নোট বাতিলের কথা ঘোষণার সময়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম দাবি ছিল ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট প্রত্যাহার করে নিলে কালো টাকা ধরা পড়ে যাবে। তখন জেটলিরা দাবি করছিলেন, বিপুল অংশের নগদ, এমনকি ৩০শতাংশ পর্যন্ত নগদ ব্যাঙ্কে ফেরত আসবে না। ওই টাকা ‘কালো টাকা’। শেষ পর্যন্ত ৯৯.৩শতাংশ টাকাই ফেরত এসেছে। এখন জেটলি বলেছেন, লোকে বাধ্য হয়ে ওই টাকা ফেরত দিয়েছে। যার অর্থ দাঁড়াচ্ছে কালো টাকাও বৈধতা পেয়ে গেছে। বস্তুত বিরোধীদের অনেকেই অভিযোগ করেছেন, কালো টাকা সাদা করার একটি প্রক্রিয়াই ছিল নোট বাতিল।

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার অন্য দুটি অংশ জেটলি উল্লেখই করেননি। প্রধানমন্ত্রীর দ্বিতীয় দাবি ছিল জাল টাকার কারবার বন্ধ হয়ে যাবে। তা হয়নি। নতুন সিরিজের ২হাজার টাকার নোট চালু হবার পরে সেই নোটও জাল হচ্ছে। তার পরিমাণ রীতিমতো উল্লেখযোগ্য বলে সরকারি হিসাবেই জানা গেছে। সন্ত্রাসবাদ বন্ধ হয়ে যাবার তৃতীয় দাবি সম্পর্কেও অর্থমন্ত্রী রা কাড়েননি।

তবে, বিরোধীরা দুবছর আগেই যে সন্দেহের কথা বলেছিলেন এদিন জেটলি তাঁর ব্লগে তা স্বীকার করেছেন। জেটলি দাবি করেছেন, ওই নগদ জমা পড়ায় ব্যাঙ্কগুলির ঋণ দেবার ক্ষমতা বেড়েছে। অনাদায়ী ঋণের প্রকোপে ব্যাঙ্কগুলির তহবিলের হাল খারাপ এবং সেই তহবিল ভরাতেই সাধারণ মানুষের হাতে থাকা টাকা নিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে অর্থনীতিবিদদের অনেকেও শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। ব্যাঙ্ক থেকে এই ঋণের সিংহভাগই ফের যাচ্ছে কর্পোরেটেরই হাতে।

জেটলি দাবি করেছেন, নোট বাতিলের পরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর সংগ্রহ বেড়েছে। করদাতা হিসাবে রিটার্ন জমা দেবার পরিমাণ বেড়েছে। তবে তার সঙ্গে পণ্য পরিষেবা করের প্রসঙ্গও যুক্ত করে দিয়েছেন তিনি। জেটলির হিসাব, প্রত্যক্ষ কর সংগ্রহ ২০১৮-১৯-এ এখনও পর্যন্ত বেড়েছে ২০শতাংশ। নোট বাতিলের পরের বছর বেড়েছিল ১৮ শতাংশ। জেটলির দাবি সম্পর্কে অর্থনীতিবিদদের বক্তব্য ২০১০-১১-তেও বৃদ্ধির হার ছিল ১৮শতাংশ। এই বৃদ্ধি স্থায়ীও হয় না, অনেক সময়েই হ্রাস পায়। পরোক্ষ করের ক্ষেত্রে এখন পণ্য পরিষেবা কর চালু হয়েছে। ২০১২-১৩-তে পরোক্ষ কর বৃদ্ধির হার ছিল ১২.৬৪শতাংশ, ২০১৩-১৪-তে ছিল ২০শতাংশ, ২০১৬-১৭-তে ২৮ শতাংশ ( নোট বাতিলের আগে ৮মাসসহ), ২০১৭-১৮-তে ২০শতাংশ। ২০১৭-১৮-তে হয়েছে ৫.৬শতাংশ, ২০১৮-১৯-এর প্রথম ছমাসে ১.৮৩ শতাংশ। জেটলির অঙ্কে বিস্তর গরমিল। এই প্রশ্নও উঠেছে জেটলির দাবিমতো কর সংগ্রহ দারুণ বৃদ্ধি পাবার পরেও রিজার্ভ ব্যাঙ্কের মূলধনী তহবিল থেকে সাড়ে তিন লক্ষ কোটি টাকা কেন চাইছে সরকার?

অন্যদিকে, বিরোধীরা এদিন ফের তুলোধনা করেছেন নোট বাতিলের পদক্ষেপকে। সি পি আই (এম) পলিট ব্যুরো বলেছে, দুবছর কেটে গেলেও অর্থনীতি ও জনগণের ওপরে প্রধানমন্ত্রী মোদীর চাপিয়ে দেওয়া বিপর্যয় থেকে এখনও দেশ উদ্ধার পায়নি। লক্ষ লক্ষ কোটি কালো টাকা উদ্ধার হবে, দুর্নীতির অবসান হবে বলে বাগাড়ম্বর অসত্য প্রমাণিত হয়েছে। উলটে ৯৯.৩শতাংশ টাকা ফেরত এসেছে। সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের কালো টাকা সাদা করতেই ওই প্রক্রিয়া সহায়ক হয়েছে। রোজকারের নগদের ওপরে নির্ভরশীল কোটি কোটি মানুষ বিপর্যস্ত হয়েছেন। অসংগঠিত ক্ষেত্রে ৩৫ লক্ষ মানুষ কাজ হারিয়েছেন। ছোট ও মাঝারি উদ্যোগগুলির রাজস্বের ক্ষতি হয়েছে। মোদী সন্ত্রাসবাদ বন্ধ হবে বলে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তার কোনোই লক্ষণ নেই। সরকারি তথ্য বরং বলছে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে গেছে সন্ত্রাসবাদের ঘটনা।

পলিট ব্যুরো বলেছে, অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি অর্থনীতিতে এই নৈরাজ্য তৈরির জন্য সমানভাবে দায়ী। তাঁর সাফাই নির্লজ্জ।

প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বলেছেন, কথায় বলে সময় গড়ালে ক্ষত শুকোয়। কিন্তু নোট বাতিলের ক্ষত দিন যত যাচ্ছে ততই প্রকট হচ্ছে। নোট বাতিল বয়স, লিঙ্গ, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিককে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার শুধু অনেকটাই কমে যায়নি নোটবাতিলের কুফল আরও ফুটে বেরোচ্ছে। ভারতীয় অর্থনীতির অন্যতম মেরুদণ্ড ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পক্ষেত্র নোট বাতিলের ধাক্কা এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি। কর্মসংস্থানে তার প্রভাব পড়েছে। নোট বাতিলের জন্য নগদের টান পড়ায় পরিকাঠামো ক্ষেত্রে ঋণদানকারী সংস্থা ও নন ব্যাঙ্কিং আর্থিক সংস্থা সংকটে পড়েছে।

কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ ধনীদের কালো টাকা সাদা করার জন্য পরিকল্পিত চক্রান্ত ছিল নোট বাতিল।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement