রোহিঙ্গা থেকে আল মাহমুদ,
মোহরকুঞ্জে ওপার

নিজস্ব প্রতিনিধি   ৯ই নভেম্বর , ২০১৮

কলকাতা, ৮ই নভেম্বর- ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, যশোর রোডে শরণার্থী স্রোত, উদ্বাস্তু শিবিরগুলিতে রাজাকার বাহিনীর চোরাগোপ্তা আক্রমণ, ভিটে মাটি ফেলে আসা মানুষদের নিয়ে এই কলকাতা শহরেই কবিতা লিখেছিলেন কবি অ্যালেন গিনসবার্গ।

১৯৭১-এ নিউইয়র্কের ম্যাডিসন সিটি স্কোয়ারের বাংলাদেশ কনসার্টে গিনসবার্গের ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ গিটার হাতে গেয়েছিলেন বব ডিলান।

১৯৭১ পেরিয়ে ২০১৮। বাংলাদেশের কক্সবাজারের সমুদ্র বরাবর টেকনাফ রোড ধরে একের পর রোহিঙ্গা শিবির, গোরুর মাংস আর ভাত খাওয়ার কষ্টের গল্প, রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের কাদা মাটির সংসার, রোহিঙ্গা মায়ের প্রসব যন্ত্রণা নিয়ে বাংলাদেশের প্রাবন্ধিক রাজীব নুর লিখেছেন ‘সেপ্টেম্বর অন টেকনাফ রোড’, প্রকাশ করেছে বাংলাদেশের প্রকাশন সংস্থা ‘শব্দ শৈলি’। বর্মার মিলিটারি জুন্টার অমানবিক আক্রমণ, সমুদ্রে ভেসে আসা রোহিঙ্গা, তাদের নিত্যনৈমিত্তিক সংকট নিয়ে রাহমান নাসির উদ্দিন লিখেছেন ‘রোহিঙ্গা নয় রোয়াইঙ্গা’, প্রকাশ করেছে ‘মূর্ধন্য’ প্রকাশন সংস্থা।

সোঁদামাটির বাংলাদেশ, নদী, চর, খাল বিল বা বাংলাদেশের চিরায়ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, প্রেম, দ্রোহই শুধু নয় অষ্টম বাংলাদেশ বইমেলায় রয়েছে সমকালীন বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি বা উন্নয়ন উচ্ছেদের দ্বন্দ্ব নিয়ে লেখাও একের পর এক ভাবনাকে আলোড়িত করা বই।

গত ২রা নভেম্বর মোহরকুঞ্জে শুরু হওয়া বাংলাদেশ বইমেলা চলবে ১১ই নভেম্বর পর্যন্ত। মোহরকুঞ্জ প্রাঙ্গণে ৬১টি স্টলে রয়েছে ৬৯টি প্রকাশনা সংস্থার বিপুল বইয়ের সম্ভার। প্রতিদিন সন্ধ্যায় মোহরকুঞ্জ হয়ে উঠছে এখন এক টুকরো ‘একুশের বইমেলা’ চত্বর।

বাংলাদেশ বইমেলায় ফুড কর্নার নেই, পপকর্ণ নেই, নেই বেনফিস বা আইসক্রিম। বাঙালি কি ক্রমশই বই বিমুখ হয়ে পড়ছে? মোহরকুঞ্জে বইমেলার স্টলগুলিতে ঢুঁ মারছেন হাতে গোনা কতিপয় মানুষ। ‘হয়তো এখানে দীপাবলির উৎসবের কারণেই সেভাবে ভিড় জমছে না, তবে যাঁরা আসছেন তাঁরা সিরিয়াস পাঠক’, জানিয়েছেন অক্ষর প্রকাশনা সংস্থার প্রতিনিধি।

বাংলা কবিতার দ্রাঘিমাংশে সার্বভৌম স্বাধীন কিংবদন্তি কবি আল মাহমুদ, শহীদ কাদরি বা রুদ্র মহম্মদ শরিয়াতুল্লার কবিতা সমগ্র প্রকাশ করেছে বেশ কয়েকটি প্রকাশনা সংস্থা। ‘মাওলা ব্রাদার্স’ প্রকাশনা সংস্থার স্টলে রয়েছে ‘রুদ্র সমগ্র’, দাম সাতশো পঞ্চান্ন টাকা, বইমেলা চত্বরে প্রতিটি বইয়ের উপরই ২৫শতাংশ ছাড় দিচ্ছেন বাংলাদেশের প্রকাশনা সংস্থাগুলি। বইমেলার স্টলে বিপুল চাহিদা আল মাহমুদ বা শহীদ কাদরির কবিতা সংকলনের। ‘শিকড়’ প্রকাশনার স্টলে রয়েছে আল মাহমুদের ‘সোনালি কাবিন ও নির্বাচিত ১০০ কবিতা’, ‘এ কি অশ্রু এ কি রক্ত’-র মত বই। আল মাহমুদ বা রুদ্রর পাশাপাশি মহাদেব সাহা বা নির্মলেন্দু গুণের কবিতার বইও খুঁজে নিচ্ছেন স্টলগুলিতে বই নেড়ে চেড়ে দেখা তরুণ প্রজন্মও।

হাক্কানি পাবলিশার্স প্রকাশ করেছে ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের উপর তদানীন্তন গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারির নানান তথ্য সমৃদ্ধ বই ‘সিক্রেট ডকুমেন্টস অব ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব নেশন বাংলাদেশ শেখ মুজিবর রহমান’, বইটির ভূমিকা লিখেছেন মুজিব কন্যা বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি শেখ হাসিনা। ‘শেখ মুজিবর রহমান স্মৃতি জাদুঘর’-এর স্টলে রয়েছে বঙ্গবন্ধুর লেখা ‘কারাগারের রোজনামচা’, ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বা হুমায়ন আহমেদের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিকায় লেখা ‘নির্বাসন’, ‘১৯৭১’, ‘আগুণের পরশমণি’, ‘সূর্যের দিন’-র মতো উপন্যাসগুলির সংকলন।

বাংলাদেশ শিশু আকাদেমির স্টলে নজর কেড়েছে বঙ্গবন্ধুর পুত্র শেখ রাসেলকে নিয়ে লেখা বাংলাদেশের কবি নাছিমা বেগমের লেখা ছড়ার বই। বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেল মাত্র ৯বছর বয়সে খুন হন সেই ১৯৭৫-র ১৫ই আগস্ট। শৈশবের দুরন্তপনায় রাসেলের উড়ে বেড়ানো বা হাজারো দস্যিপনার ডানা মেলা নিয়ে শিশুমনের সুকুমার অনুভূতি নিয়ে লিখেছেন নাছিমা বেগম। মুক্তিযুদ্ধের উপর লেখা উপন্যাস, কবিতা, মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিকায় লেখা মন মাতানো কিশোর উপন্যাস রয়েছে ‘প্রথমা’, ‘সৃজনী’ বা ‘জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ’-র স্টলগুলিতে।

‘বালাদেশের চলচ্চিত্র চলচ্চিত্রে বাংলাদেশ’, ‘মুখোমুখি ঋত্বিক-সত্যজিৎ’, ইরানিয় পরিচালক আব্বাস কিয়ারোস্তামির ছবি নিয়ে লেখা ‘কিয়ারোস্তামির সিনে রাস্তা’, ‘আন্তনিওনির সিনে জগৎ’-র মত একাধিক সিনেমার বইয়ের সন্ধান পেতে হলে ঢুঁ মারতেই গবে ‘ভাষাচিত্র’-র স্টলে। ইসলাম ধর্ম, দর্শন বা সুফি দর্শন থেকে লালন সাঁই হাসন রাজার বই রয়েছে ‘রেমন পাবলিকেশন’-র স্টলে।

বাংলাদেশ বইমেলায় সেভাবে বামপন্থী প্রকাশনার বই না থাকলেও ‘জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ’ বা ‘সৃজনী’, ‘বর্ণায়ন’, ‘শোভা প্রকাশন’-র মতো একের পর এক স্টলে রয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট নেতা হায়দর আকবার খান রণো-র লেখা ‘রাজনৈতিক মতাদর্শ ও অন্যান্য প্রসঙ্গ’, মোহম্মদ দরবেশ আলি খানের লেখা ‘যুদ্ধ রাজনীতি দর্শন’, মোহম্মদ আব্দুল আলিমের লেখা ‘বাংলাদেশের বাম রাজনীতি বিভ্রান্তি ও বিভক্তি’, বদরুদ্দিন উমরের লেখা ‘বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনে সমস্যা ’, অঙ্কুর প্রকাশনীর ‘ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম’-র মতো বইগুলি।

বাংলাদেশের উপন্যাস মানে দুই বাংলার কৈশোর যৌবনকে মাতিয়ে রাখে ‘মিসির আলি’ বা ঢাকার রাস্তায় হলুদ পাঞ্জাবী পড়ে হেঁটে চলা ‘হিমু’। হুমায়ুন আহমেদের ‘হিমু রচনাবলী’ বা ‘সেরা মিসির আলি’-র ব্যাপক চাহিদা সংখ্যায় কম হলেও যাঁরা রোজ সন্ধ্যায় আসছেন বইমেলায় তাঁদের মধ্যে। জীবনানন্দের ‘জলপাইহাটি’ বা ‘মাল্যবান’-র মতো উপন্যাস রয়েছে ‘অন্য প্রকাশন’-র স্টলে।

রোজ সন্ধ্যায় মোহরকুঞ্জ প্রাঙ্গণে চলছে আলোচনাসভা, গান, কবিতা পাঠের আসর। অংশ নিচ্ছেন দুই বাংলার কবি সাহিত্যিক চিন্তাবিদরা।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement