আদালতের ভর্ৎসনা সত্ত্বেও
কাশীপুরে বেআইনি নির্মাণ

নিজস্ব প্রতিনিধি   ৯ই নভেম্বর , ২০১৮

কলকাতা, ৮ই নভেম্বর— কলকাতা জুড়ে চলছে বেআইনি প্রোমোটিংয়ের রমরমা। তারই মধ্যে কাশীপুরে একসঙ্গে ৩৩টি বেআইনি বহুতল নির্মাণ নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র চাঞ্চল্য। এই ৩৩টি নির্মাণের মধ্যে ১৮টি নির্মাণে আগেই নিষেধাজ্ঞা ছিল কলকাতা হাইকোর্টের। তাও চলেছে সেই নির্মাণের কাজ। এবার বেআইনি নির্মাণের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছে। কর্পোরেশনের আধিকারিক থেকে পুলিশ, কাউন্সিলর, বিধায়কের নাকের ডগায় কি করে এই নির্মাণ চলছে তা নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে যথেষ্টই গুঞ্জন। এর বিরুদ্ধে আরও একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের হলো কলকাতা হাইকোর্টে।

অবসরকালীন ডিভিসন বেঞ্চে শুনানির পর মামলাটি বর্তমানে প্রধান বিচারপতির ডিভিসন বেঞ্চে গিয়েছে। মামলাটির পরবর্তী শুনানি হবে ছুটির পর। এর আগের এই ধরনের একটি মামলায় (গত ৬ই আগস্ট) একটি বেআইনি নির্মাণে পুলিশ ও মিউনিসিপালিটির ভূমিকায় ক্ষোভ প্রকাশ করে সি বি আই-কে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া ও রিপোর্ট দেওয়ার নির্দেশ দেয় দিল্লি হাইকোর্ট। সেই নির্দেশকে মাথায় রেখে কাশীপুরের এই বেআইনি নির্মাণ কাজেও সি বি আই এবং ই ডি-র হস্তক্ষেপ চাইছেন মামলাকারী জনৈক রাজেশ চৌরাশিয়া। তিনি দুর্নীতি দমন শাখারও উদ্যোগ চাইছেন। অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে এই দুর্নীতির সমাধান চেয়ে আদালতের কাছে পিটিশন দাখিল করেছেন তিনি। বউবাজারের বাসিন্দা রাজেশ চৌরাশিয়া গত ৩০শে অক্টোবর অবসরকালীন বেঞ্চে এই মামলা করেন। কলকাতা কর্পোরেশনের ১ নম্বর বরোর কাশীপুর রোড, রুস্তমজি পার্শি রোড, প্রাণনাথ চৌধুরি লেন, খগেন চ্যাটার্জি রোডসহ আরও কিছু এলাকার একটি বড় অংশ ঠিকা প্রজাস্বত্বের অন্তর্ভুক্ত। এই বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে রমরম করে চলছে বেআইনি বহুতল নির্মাণ।

এই নিয়ে বছর তিনেক আগে জনৈক মণিপ্রসাদ সিং একটি জনস্বার্থ মামলা করেন হাইকোর্টে। কয়েক প্রস্থ শুনানির পর আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য এই মামলায় আদালত বান্ধব হিসেবে নিযুক্ত হন। হাইকোর্টের বিচারপতিরা বারে বারেই জানতে চেয়েছিলেন ঐ বাড়িগুলি বর্তমানে কি অবস্থায় আছে, সেগুলি ভেঙে ফেলা হচ্ছে না কেন। সেগুলিতে জল, বিদ্যুৎ, নিকাশি—সব বন্ধ করতে বলা হয়েছিল, ডেপুটি কমিশনার- (নর্থ)-কে বিষয়টি দেখতে বলা হয়েছিল- তা মানা হয়েছে কিনা। এই মামলায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধেই বা কি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে- জানতে চেয়েছিল উচ্চ আদালত। কিন্তু কোনোবারই এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেনি কলকাতা কর্পোরেশন বা পুলিশ কেউই।

ফলে কাশীপুর গান অ্যান্ড শেল ফ্যাক্টরি সংলগ্ন ৯৬- ৯৯ নম্বর অলিগলিতে সরকারের ভেস্টেড জমিতে রমরমিয়ে গজিয়ে উঠেছে বহুতল যা হাইকোর্টের বক্তব্য অনুসারে প্রথম থেকেই বেআইনি। বস্তি উচ্ছেদ করেই দিনের পর দিন সেখানে চলছে প্রোমোটিংয়ের কাজ। সেগুলিকে ভাঙার নির্দেশ দেয় কোর্ট। সেই অনুযায়ী কিছু কিছু ভাঙা হয়, আবার সেখানে পুনর্নির্মাণ শুরু হয়। সব শুনে সমস্ত তথ্য চেয়ে পাঠায় হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির এজলাস। কেন বহুতল তৈরির এই কাজ বন্ধ হলো না তা জানতে চেয়ে কর্পোরেশনের কমিশনারকে তীব্র ভর্ৎসনাও করেছিলেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি মঞ্জুলা চেল্লুর। সেই মামলার পরিপ্রেক্ষিতে কলকাতা কর্পোরেশনের কমিশনার খলিল আহমেদ ও ১ নম্বর বরোর এক্সিকিটিভ ইঞ্জিনিয়ার তাপস লাহাকে ২৯শে জুলাই হাজির হতে বলেন প্রধান বিচারপতি। তিনি তীব্র ভর্ৎসনা করে জানতে চান কোন চাপে বেআইনি নির্মাণ বন্ধ হচ্ছে না?

এরপর বরো ইঞ্জিনিয়ার তাপস লাহাকে সাসপেন্ড করে কর্পোরেশন। কোর্টের নির্দেশে আবার বাড়ি ভাঙার কাজ শুরু হয়। কিন্তু আশ্চর্যভাবে সেখানে ফের নির্মাণের কাজ শুরু হয়ে যায়। প্রধান বিচারপতি কড়া পদক্ষেপ নিয়ে নির্মাণকারীদের নাম ও বেআইনি বাড়িগুলির ফটোগ্রাফ জমা দিতে বলেন, যাতে রিট পিটিশনার এই নামগুলি নথিভুক্ত করতে পারেন। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি গিরিশচন্দ্র গুপ্তর এজলাসে এই মামলায় বেআইনি নির্মাণকারীদের বিরুদ্ধে ইনজাংশন জারি করে কোর্ট। এরপর মামলাকারী নিজেকে মামলা থেকে সরিয়ে নিতে চাইলে প্রধান বিচারপতির ডিভিসন বেঞ্চ তাঁর প্রার্থনা মঞ্জুর করেন। এরপর বিচারপতি হাইকোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে পিটিশনারের স্থলাভিষিক্ত করেন। তিনিই ওই মামলা চালাবেন বলে স্থির হয়। এবং আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যকে আদালত বান্ধব নিযুক্ত করে কোর্ট। কিন্তু আদালতে আর কোন শুনানি না হওয়ায় ঐ এলাকায় বেআইনি নির্মাণ চলতেই থাকে।

এবার বেআইনি নির্মাণের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করলেন রাজেশ চৌরাশিয়া। এই মামলার আইনজীবী অনুপম ভট্টাচার্য ও নগেন্দ্রপ্রসাদ গুপ্তা। তাঁদের বক্তব্য, গোটা কলকাতা কর্পোরেশন এলাকায় বহু ওয়ার্ডেই এই ধরনের বেআইনি নির্মাণ গড়ে উঠছে। পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভুমিকায় বিভিন্ন মামলায় বারবারই ক্ষোভ প্রকাশ করছেন আদালত। এছাড়াও আরও একটির জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়েছে ঐ কাশীপুর এলাকারই ৪৬টি বেআইনি বহুতল নিয়ে। জনৈক মৃত্যুঞ্জয় সাহা নিজেই কোর্টে দাঁড়িয়ে (ইন পার্সন) এই মামলা করেছেন।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement