ব্যটারি নয়, জল ব্যবহারেই
এবার সৌর শক্তি সঞ্চয়

নিজস্ব প্রতিনিধি   ৯ই নভেম্বর , ২০১৮

কলকাতা, ৮ই নভেম্বর — সৌর বিদ্যুতে ব্যাটারি বিদায় নিতে চলল। ব্যাটারি ছাড়াই এবারে সৌর শক্তি ব্যবহার করা যাবে। সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনে দিন-রাতের পার্থক্য মুছে দিয়ে বিশ্বকে নতুন পথের দিশা দিলেন দেশের বিশিষ্ট সৌরবিজ্ঞানী ড. শান্তিপদ গণচৌধুরি। দেশকে নতুন দিশা দেখানোর ‘মিশন ইনোভেশন’ প্রকল্পের সেরার সেরা পাঁচটি উদ্ভাবনীর একটির সঙ্গে জুড়ে গেল অধ্যাপক গণচৌধুরীর নাম।

সৌর শক্তিকে ব্যাটারি ছাড়া কী করে সঞ্চয় করে রাখা যায় তাই নিয়ে গোটা বিশ্ব জুড়ে চলছে লাগাতার আর্ন্তজাতিক গবেষণা। ব্যাটারিতে প্রচুর সৌরশক্তি ধরে রাখার অনেক সমস্যা। মেরে কেটে পাঁচ কিলোওয়াট পর্যন্ত শক্তিকে রাখা যায়। তাতে খরচ অনেক। এর ওপর ব্যাটারি তৈরি করতে যেসব উপাদান ব্যবহার করা হয় তার সবটাই পরিবেশের পক্ষে হানিকর।

সেজন্য পরিবেশের কথা ভেবেই ‘সবুজ শক্তি’কে ব্যবহারে ব্যাটারিকে বাতিলের পক্ষে সবাই। কিন্তু ব্যাটারি ছাড়া সৌর কোষ থেকে তৈরি সৌরবিদ্যুৎকে কোথায় ধরে রাখা হবে তা নিয়ে চিন্তা সকলের। উন্নত দেশে এর উপায় বার করতে চলছে বিজ্ঞানীদের মধ্যে মরণপণ গবেষণা। সেই গবেষণায় এবার ভারত পথ দেখাবে বিশ্বকে।

এখন পর্যন্ত সৌরশক্তির সাহায্যে দিনের বেলা বাতাসকে গরম করে তা উচ্চচাপে সিলিন্ডারে বন্ধ করে তা রাতে বিদ্যুৎ শক্তি উৎপাদনে কাজে লাগানো হচ্ছে। কিন্তু এই প্রযুক্তি বেশ ব্যয়বহুল, সমস্যাও অনেক। কোনও কোনও বিজ্ঞানী আবার নুনের ব্যাটারি তৈরি করে সেখানে সৌরশক্তি মজুত করার লক্ষ্যে গবেষণা চালাচ্ছেন। কিন্তু বিশ্বের তাবড় তাবড় সৌর বিজ্ঞানীদের পিছনে ফেলে শেষ হাসিটি হাসলেন এই রাজ্যের সৌরশক্তি পুরোধা ড. শান্তিপদ গণচৌধুরি।

তিনি হাতেকলমে করে দেখালেন জল দিয়ে কীভাবে সৌরশক্তিকে সঞ্চয় করে রাখা যায়। তাঁর দেখানো নতুন প্রযুক্তিতে প্রথমে দিনের বেলায় সৌর পাম্প চালিয়ে জলকে বেশি উচ্চতার ট্যাঙ্কে জমা করা হয়। এরপর প্রয়োজন মতো সেই জলই ছেড়ে দিয়ে মাইক্রো হাইডেল যন্ত্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। এতে খরচও অনেক কম। একই জলকে বারবার ব্যবহার করা যাবে।

এই পদ্ধতিতে কোনও ব্যবহারিক প্রকল্প বানাতে খরচ পড়বে কিলোওয়াট পিছু মাত্র ১লক্ষ ২০হাজার টাকা। সৌর-জল ওই সংকর যন্ত্রটি দেখতে হবে কেমন, তা দেখাতেই ইস্ট ক্যালকাটা টাউনশিপে অর্ক রিনিউয়েবল কলেজের ল্যাবরেটরিতে তৈরি করা হয়েছে একটি ছোট অবিকল যন্ত্র। বৃহস্পতিবার তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করলেন অধ্যাপক গণচৌধুরি।

সৌরশক্তি ও জল শক্তিকে একযোগে ব্যবহার করে কী করে সাফল্যের সঙ্গে কাজ করানো যায় তার এদিন তিনি ব্যাখাও দিয়েছেন। চিরস্থায়ী বিদ্যুৎ শক্তি উৎপাদনে শুধু ‘ওয়ার্কিং প্রোটোটাইপ’ যন্ত্র তৈরি নয়, তা ব্যবহারিক ক্ষেত্রে বসানোর জন্যও স্থানও ঠিক করে ফেলা হয়েছে। তা বসতে চলেছ অসমের পূর্ব কামরূপ জেলায়।

ড. গণচৌধুরি জানিয়েছেন, ভারত সরকারের আর্থিক আনুকূল্যে পূর্ব কামরূপ জেলায় বসানোর হবে একটি ১৫কিলোওয়াটের সংকর যন্ত্র। সেখানে সৌরশক্তি ব্যবহার করে নিচের চৌবাচ্চার জলকে দিনের বেলায় ৬০ফুট উচ্চতায় জল তুলে রাখা হবে। এরপর রাতে বা যেকোনও সময় তা নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় ছোট হাইডেল যন্ত্র চালিয়ে অনায়াসে তৈরি করা যাবে বিদ্যুৎ। সৌরবিদ্যুৎ আর জলবিদ্যুতের এই অনবদ্য মিশেল ভারততো বটেও বিশ্বের কোথায় এখনো পর্যন্ত বসানো হয়নি। অভিনব চিন্তায় মাত করে দিলেন দেশের প্রথম সারির সৌরবিজ্ঞানী অধ্যাপক গণচৌধুরি।

অধ্যাপক গণচৌধুরি জানাচ্ছেন, ‘মিশন ইনোভেশন’-এ সাড়া পাওয়ার পরেই গবেষণা ও রূপায়ণের জন্য ভারত সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রক ২কোটি ৬০লক্ষ টাকা অনুমোদন করেছেন। আসমের প্রকল্পটি রূপায়ণে অর্ক রিনিউয়েবল কলেজের সহযোগী সংস্থা এন বি আই আর টি-র সঙ্গে যোগ দিয়েছেন বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা। অচিরাচরিত বিদ্যুৎ উৎপাদনে এই পদ্ধতি যেকোনও অঞ্চলেই সুদূরপ্রসারী ফল আনতে চলেছেন।

অধ্যাপক গণচৌধুরির ভাষায় — গ্রীষ্মকালে দেশের যেসব জল প্রকল্প ধুঁকতে থাকে, সেখানে এই সৌর-জল সংকর প্রযুক্তি দারুণ কাজ দেবে। এতে পরিবেশ যেমন রক্ষা পাবে, তেমনি রূপায়ণে খরচও পড়বে কম। যেকোনও পরিসরেই এই প্রকল্প চাহিদামতো তৈরি করা যাবে। ব্যাটারি ওপর ভরসা করে বড় প্রকল্প হাতে নেওয়া ক্ষেত্রে আর পিছপা হতে হবে না। প্রকল্প খরচ কম থাকার জন্য যেকোনও ছোট এলাকা বা বাড়িতেও একইভাবে কাজে আসবে এই প্রযুক্তি পরিকল্পনা।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement