ধর্ষক তৃণমূল নেতা আটকও নন,
গ্রেপ্তার প্রতিবাদী গ্রামবাসীরাই

নিজস্ব সংবাদদাতা   ৯ই নভেম্বর , ২০১৮

ধূপগুড়ি, ৮ই নভেম্বর- অভিযুক্ত তৃণমূল নেতাকে গ্রেপ্তার তো দূরের কথা, আটকও করা হয়নি। পুলিশের তরফে সটান জবাব, কেন গ্রেপ্তার করা হবে? অভিযোগ তো কিছু নেই!

উলটোদিকে এই ঘটনাতেই অভিযুক্ত ধর্ষক তৃণমূল নেতা জনরোষের মুখে আক্রান্ত হওয়ায়, সেই ঘটনায় রাতভর তল্লাশি চালিয়ে এদিন দুপুর পর্যন্ত ১১জন সাধারণ গ্রামবাসীকে গ্রেপ্তার করল মমতা ব্যানার্জির পুলিশ প্রশাসন।

এই দুটো চিত্রই সম্ভবত আজকের বাংলার আইনশৃঙ্খলার প্রকৃত চেহারা।

গ্রামবাসীদের হাতে ধরা পড়ার পরে বেধড়ক মার খাওয়া অভিযুক্ত তৃণমূল নেতা এখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এলাকার দাপুটে নেতা এই কাশেম আলি। তাঁর দাদা জেলা তৃণমূলের নেতা। এলাকায় যথেষ্ট প্রভাবশালী। পুলিশ মহলেও যোগাযোগ। জনরোষের মুখে পড়লেও তার প্রভাবের ভয়ে এফ আই আর করে উঠতে পারেননি নির্যাতিতা ঐ মহিলা। তাঁর স্বামী একমাত্র ছেলেকে নিয়ে বাইরে গেছেন চিকিৎসা করাতে। বাড়িতে একাই থাকতেন। ভয়ে তিনি কোনও অভিযোগ করে উঠতে পারেননি।

আর সেই সুযোগকেই কাজ লাগিয়েছে শাসক তৃণমূল ও পুলিশ। বানারহাট থানার দাবি, ‘গ্রামবাসীরা মারধর করেছে কাশেম আলিকে। তবে কোন এফ আই আর হয়নি। কীসের অভিযোগ তাও তো জানি না। তাহলে কেন শুধু শুধু একজন মানুষকে আমরা গ্রেপ্তার করব?’ এই মন্তব্য যার সম্পর্কে সেই কাশেম আলিকে মঙ্গলবার গভীর রাতে গ্রামের এক মহিলাকে ধর্ষণের চেষ্টার সময় হাতেনাতে ধরে ফেলেন গ্রামবাসীরা। বিরোধীদের বিরুদ্ধে স্বতঃপ্রণোদিত মামলা রুজু করতে তৎপর পুলিশ প্রশাসন এই ঘটনার পরেও অভিযুক্ত তৃণমূল নেতার বিরুদ্ধে কোনও এফ আই আর রুজু করেনি। ফলে সে ‘নিরাপরাধ’ ব্যক্তি।

অথচ যে গ্রামবাসীরা এক মহিলার সম্ভ্রম রক্ষা করতে গভীর রাতে রাস্তায় নেমে এলেন, প্রতিবাদ জানালেন তাঁদেরই ধরে ধরে গ্রেপ্তার করতে শুরু করে পুলিশ প্রশাসন। বুধবার রাত থেকে এদিন সকাল পর্যন্ত ১১জন পুরুষ গ্রামবাসীকে গ্রেপ্তার করে বানারহাট থানার পুলিশ। এদিন সকালে ধূপগুড়ি ব্লকের বানারহাট থানার শালবাড়ি দুই নম্বর গ্রামপঞ্চায়েতের নুন খাওয়া ডাঙাগ্রামে গিয়ে দেখা গেল,সমস্ত দোকান পাট বন্ধ। রাস্তায় রাস্তায় মোতায়েন পুলিশ। গ্রাম জুড়ে নিস্তব্ধতা, আতঙ্কের চেহারা সর্বত্র।বাজারের উপর পুলিশ কাউকে দাঁড়াতে বা জটলা করতে দিচ্ছে না। গ্রামের বিভিন্ন পাড়ায় ঘুরে তল্লাশি করে পুরুষদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।গ্রামে থমথমে পরিবেশ। বেশিরভাগ ঘর পুরুষ শুন্য। মহিলারা আতঙ্কে কেউ বাড়ির বাইরে বের হচ্ছেন না। গ্রামের প্রায় প্রত্যেকের মোবাইল সুইচ অফ! কোন গ্রামবাসী আতঙ্কের জেরে ও পুলিশি তল্লাশির ভয়ে সেদিনের ঘটনা নিয়ে একটি শব্দও উচ্চারণ করতে রাজি হননি। দুদিনের ঘটনা প্রসঙ্গে কেউ মুখ খুলতে রাজি হলেন না।

মঙ্গলবার দীপাবলির রাতে গ্রামের ওই মহিলার বাড়িতে ঢোকে তৃণমূল নেতা কাশেম আলি। বাড়িতে ওই মহিলা একাই ছিলেন। সেই সুযোগই নেয় অভিযুক্ত তৃণমূল নেতা। গভীর রাতে ঘরে ঢুকে তাঁকে ধর্ষণের চেষ্টা করে। গ্রামের লোকজন টের পায়। উৎসবের রাতে জেগে থাকা গ্রামবাসীদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এই সংবাদ। কয়েকশ গ্রামবাসী মানুষ জড়ো হয়ে হাতেনাতে এই নেতাকে ধরে ফেলেন। তীব্র জনরোষের মুখে পড়তে হয় ঐ তৃণমূল নেতাকে। চলে উত্তম মধ্যম। গ্রামবাসীরা দড়ি দিয়ে গাছের সাথে বেঁধে মারধর করেন। রাত দুটো নাগাদ খবর পেয়ে বানারহাট থানা থেকে পুলিশ আসে এবং রক্তাক্ত অবস্থায় অভিযুক্ত তৃণমূল নেতাকে উদ্ধার করে। পুলিশ থানায় সাক্ষ্য দেওয়ার নাম করে দুজন মহিলা ও দুজন পুরুষকে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে দুজন মহিলাকে ছাড়া হলেও বাকি দুই গ্রামবাসীকে গ্রেপ্তার করে। এদিন রাত পর্যন্ত মোট ১১জন গ্রেপ্তার হয়।

পুলিশের অভিযোগ বুধবার বিক্ষোভের নামে পুলিশের কাজে বাধা দেওয়া হয়, এমনকি হামলাও হয়। কয়েকজন জখম হয়। পাশাপাশি তৃণমূল নেতাকেও মারধর করেন গ্রামবাসীরা। যদিও ঘটনা হলো পুলিশ তৃণমূল নেতাকে ছেড়ে গ্রামবাসীদের গ্রেপ্তার করায় বুধবার তীব্র উত্তেজনা ছড়ায় এলাকায়। পুলিশকে ঘিরে ধরে চলে তুমুল বিক্ষোভ। গ্রামের মহিলারা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। গ্রামবাসীরা রাজ্য সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভে বসে পড়েন। বিক্ষোভের মেজাজ দেখে গ্রামে আসা পুলিশ আধিকারিক থানায় যোগাযোগ করে জানায় মহিলা দুজনকে ছেড়ে দেওয়া গেলেও পুরুষ দুই গ্রামবাসীকে ছাড়া যাবে না। পুলিশের মনোভাব দেখে ক্ষোভের পারদ আরও চড়তে থাকে এবং বেলা বাড়ার সাথে সাথে লাগোয়া গ্রামের মানুষরাও এসে বিক্ষোভে যোগ দেন। বিকেল চারটা নাগাদ বিশাল পুলিশ বাহিনী, র‌্যাফ গ্রামে আসে। সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে আসার পর পুলিশ নির্বিচারে লাঠি চালায়।

এইক্ষেত্রে পুলিশ নিজেই তৎপর হয়ে গ্রামবাসীদের গ্রেপ্তার করলেও যে ঘটনা থেকে সূত্রপাত সেই ধর্ষণের চেষ্টার ঘটনায় তৃণমূল নেতাকে ‘নিরাপরাধ’ বলেই জানিয়ে দিয়েছে পুলিশ।

দশম শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণ করে রেললাইনে ধারে ফেলে রাখার ঘটনা থেকে শুরু করে সপ্তাহ দুয়েক আগে এক আদিবাসী গৃহবধূকে ধর্ষণ করে শরীরে লোহার রড ঢুকিয়ে খুনের চেষ্টা- একের পর এক নারী নির্যাতনে ঘটনা ধূপগুড়িতে। তারপরেও পুলিশ প্রশাসনের এই চেহারা যে অপরাধীদের মনোবল জোগাবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement