স্কুলে ফেরাচ্ছে, যুক্তি
শেখাচ্ছে কিশোর বাহিনী

রাজ্যজুড়ে বাড়ছে শাখাও

নিজস্ব প্রতিনিধি   ৯ই নভেম্বর , ২০১৮

কলকাতা, ৮ই নভেম্বর— স্কুলছুটদের ফের স্কুলে ফেরাচ্ছে কিশোর বাহিনী। এই অসময়েই রাজ্যজুড়ে বাড়ছে সংগঠনের শাখা।

পুরুলিয়া শহর থেকে বহু দূরে বলরামপুর থানার আমট্যাঁড় গ্রামের অনেক শিশুই এখন স্কুলমুখী। শুধু স্কুলেই যাওয়া নয়। সুস্থ জীবনবোধ গড়ে উঠছে তাদের। বাড়ছে স্বাস্থ্য সচেতনতা। দূর হচ্ছে মনের কুসংস্কার। গড়ে উঠছে যুক্তিবাদী মন।

স্বাধীনতা সংগ্রামী তিলকা মুর্মুর নামে তৈরি হয়েছে গ্রামে কিশোর বাহিনীর শাখা। ওই শাখার হাত ধরেই প্রথমে কচিকাঁচারা হয়েছে মাঠমুখী। নিয়ম করে খেলা, একসাথে বাঁচার সঙ্গে যৌথ জীবনবোধ ক্রমশ পালটে দিচ্ছে দিনমজুরের ঘরের সন্তানদের।

শিশুদের হাতে অস্ত্র ধরিয়ে মিছিল দেখেছে পশ্চিম বর্ধমানের ওয়ারিয়া। মাথায় গেরুয়া ফেট্টি বেঁধে শিশু কিশোরদের রাস্তায় নামিয়ে গোটা তল্লাটে অশুভ শক্তির দাপট দেখে সিঁটিয়ে ছিল মহল্লা। গত ২৫শে আগস্ট সেই উগ্রতার পরদিনই ওয়ারিয়ার রাস্তায় পাখা মেলেছিল রঙিন প্রজাপতি। সাদা পোশাকে, রঙিন পতাকায় বর্ণাঢ্য মিছিল থেকে সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে রাখিবন্ধনে মেতেছিলো ধর্ম, বর্ণ সম্প্রদায়ের মানুষ। আয়োজক সেই কিশোর বাহিনী।

‘আগে অভিভাবকদের একটা উদাস ভাব ছিল। গরিব ঘরের ছেলে মেয়ে কাজ করে খেতে হবে, স্কুলে গিয়ে কী হবে! ভাবতেন ওঁরা। এখন আমাদের শাখা তৈরি হওয়ার পর অভিভাবকদেরও মানসিকতা পালটাচ্ছে। ওঁরা সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে চাইছেন।’ বলছিলেন পুরুলিয়া জেলার কিশোর বাহিনীর সংগঠক জয়ন্ত প্রামাণিক।

প্রতিদিন একটু, একটু করে তাই প্রসারিত হচ্ছে কিশোর বাহিনীর শাখা। বিলুপ্ত হতে বসা জনজাতি বীরহোড় সম্প্রদায়ের শিশু কিশোরদের নিয়ে গড়ে উঠেছে ভূপতিপল্লী বীরহোড় নবদিগন্ত কিশোর বাহিনী শাখা। কোথায় সকাল, কোথাও বিকালে স্কুল ছুটির পর মাঠে জড়ো হয় শিশু কিশোররা। চলে খেলাধূলা। জীবনবোধ গড়ার পাঠও। সেই পাঠে আছে কুসংস্কার, ধর্মন্ধতা, উগ্রতার বিরুদ্ধে শিশুমনকে তৈরি করা। ডাইনি প্রথার বিরুদ্ধে শৈশব থেকেই যুক্তিবাদী মন নিয়ে গড়ে ওঠা।

আমট্যাঁড় গ্রামেই যেমন গরিব মানুষের শরীর খারাপ লেগে থাকতো। দিনমজুর মানুষের ভরসা ছিলো ওঝার ঝাড়ফুঁকে। মানুষের বিশ্বাস ছিল ডাইনির আক্রমণে এই অবস্থা গ্রামের। সেই গ্রামেই মাঠমুখী কিশোর, কিশোরীদের মারফত বদলেছে মানুষের ভাবনা। গ্রামের মানুষ এখন ডাইনিতে ডরায় না। আবার মানবাজার ২নং ব্লকের আদিবাসী গ্রাম কুটনির মেয়েরা শেখে তাইকোন্ডে। ৫০জন আদিবাসী কিশোরী রোজ আসে শাখার প্রশিক্ষণে।

শিশু কিশোরদের হাত ধরে এই বদল এখন চাহিদা বাড়াচ্ছে কিশোর বাহিনীর শাখার। ‘আমার কাছে মৌখিকভাবে ১৫জন অভিভাবক তাঁদের গ্রামে শাখা খোলার আবেদন করেছেন। আমরা ওইসব গ্রামে কিশোর বাহিনীর শাখা খুলব।’ বলছিলেন পুরুলিয়ার সংগঠক।

রাজ্যের সর্বত্রই গত তিন বছরে বাড়ছে কিশোর বাহিনীর শাখা। পশ্চিম মেদিনীপুরের শিলদা, হাওড়ার পাঁচলা থেকে মুর্শিদাবাদের কর্ণসুবর্ণ রাজ্যজুড়ে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে কিশোর মনে। ২০১১সালে রাজ্যে ৪৫৫থেকে ৪৭৫টির মতো শাখা ছিলো কিশোর বাহিনীর। গত তিন বছরে এই শাখার সংখ্যা এখন বেড়ে ৬০০ছাড়িয়েছে। আগ্রহ বাড়ছে অভিভাবকদেরও। ‘আগে কথা শুনতো না ছেলেমেয়েরা। এখন ওরা অনেক বাধ্য।’ বলছেন অভিভাবকরাও।

গোটা দেশে বাড়ছে ধর্মন্ধতার দাপট। রাষ্ট্র থেকে মদত পাচ্ছে কুসংস্কার। তারই বিরুদ্ধে শিশু মনকে গড়তে এই সময়ে তৎপর কিশোর বাহিনী। ‘ বিজ্ঞান আক্রান্ত। যুক্তিবাদী মন আক্রান্ত। তাই আমাদের শিবিরে এখন বিজ্ঞান চেতনাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ড্রিল, প্যারেড, গান, নাচের সঙ্গে হাতে কলমে তালিম দেওয়া হচ্ছে কুসংস্কারবিরোধী ও যুক্তিবাদী মানসিকতা গড়ার মনকে। ২০১৭সালের ডিসেম্বর মাসে রাজ্যে প্রথমবার বাঁকুড়ার বরজোড়ার কৃষ্ণনগর গ্রামে শিশু বিজ্ঞান উৎসব আয়োজিত হয়েছে। তার আগে নভেম্বর, ডিসেম্বর মাসজুড়ে প্রত্যের জেলায় আয়োজিত হয়েছে জেলা শিশু বিজ্ঞান উৎসব ।’ জানিয়েছেন কিশোর বাহিনীর মুখ্য সংগঠক পীযূষ ধর।

কুসংস্কারমুক্ত আর যুক্তিবাদী মানসিকতা গড়ে তোলা সময়ের দাবি। এরাজ্যের গ্রাম শহরে শিশু কিশোরদের জড়ো করে সেই কাজটাই নিঃশব্দে করে যাচ্ছে কিশোর বাহিনী। কোথাও এলাকার মানুষকে যুক্ত করে আয়োজন হচ্ছে বসন্ত উৎসব। ২৫শে বৈশাখে মুক্তমনা শিশু কিশোরদের প্রভাত ফেরি প্রভাব ফেলেছে মানুষের মনে।

মাঠে জড়ো হওয়া শিশুরা এখন চিনছেন রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুকান্তকে। জানছেন গৌরী লঙ্কেশ, গোবিন্দ পানসারে কালবুর্গীদের কথাও। মাঠ না মিললে পরোয়া করছে না শিশুরা। বাড়ির ছাদ, উঠোনেই চলছে শাখা।

আগামী ২৯শে ডিসেম্বর থেকে চারদিনের জন্য মুর্শিদাবাদে চতুর্দশ রাজ্য শিবির বসতে চলেছে। ২৯শে ডিসেম্বর থেকে শুরু হয়ে শিবির চলবে পয়লা জানুয়ারি পর্যন্ত। রাজ্যের সব শাখা থেকে কিশোর, কিশোরীরা জড়ো হবে মুর্শিদাবাদে। আলোচনা করবেন। বিনিময় করবেন অভিজ্ঞতার। গান, কবিতা, নাচ, খেলার মধ্যে দিয়ে আগামী দিনের রসদ সংগ্রহ করবে শিশু কিশোররা।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement