রাজ্যে দুবছরে ফসল বিমার
বাইরে ৫৫% কৃষক

কৃষকের সুরক্ষা কেড়ে একই পথের পথিক মমতা- বি জে পি

নিজস্ব প্রতিনিধি   ৯ই নভেম্বর , ২০১৮

কলকাতা, ৮ই নভেম্বর — ধর্ম, মন্দির, ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে দুজনে যেন মুখোমুখি। এমনটাই প্রচার দেখে মনে হচ্ছে।

কৃষকের জান ফসলের সুরক্ষা যেখানে প্রশ্ন, সেখানে নরেন্দ্র মোদী আর মমতা ব্যানার্জির ‘তৎপরতা’ একইরকম। তার প্রচার নেই। দুজনের কেউই তা নিয়ে ভাষণ দিচ্ছেন না। তাই এই ক্ষেত্রে, তাঁদের সরকারি নথিই ভরসা।

আর সেই নথির মোদ্দা কথা — হিন্দু কৃষক অথবা মুসলমান কৃষক, মার খেয়েছেন দুই সরকারের কাছেই। আর এই ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ, গুজরাট, রাজস্থানের প্রভেদ নেই।

সরকারি নথি বলছে পশ্চিমবঙ্গে ফসলের বিমার আওতা থেকে ৫৫ শতাংশ কৃষক ছিটকে গেছেন। সময় লেগেছে মাত্র দুবছর। খরিফ মরশুমের এই হিসাব, কৃষকদের বিমার আওতা থেকে ছিটকে যাওয়ার বিষয়ে রাজ্যের কৃষিমন্ত্রী আশিস ব্যানার্জিকে ফোন করা হয়েছিল। তিনি ফোন তোলেননি। ফোন ধরেননি রাজ্যের কৃষি উপদেষ্টা প্রদীপ মজুমদারও। রাজ্যের কৃষি দপ্তরের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক রীতিমত বিরক্তি সহকারে বৃহস্পতিবার বলেছেন,‘‘পঞ্চায়েতে ফরম পাঠালে কৃষকরা পান না। বিলি হয় না। কে পি এস-দের ফসল বিমার কাজে গতি আনার দায়িত্ব। অনেক ব্লকে কে পি এস নেই। যেখানে আছে, তাঁদের ঘাড়ে কাজের বোঝা। কোন কাজ ছেড়ে কোন কাজ করবে? বিমা কোম্পানির লোকবল নেই। কৃষকদেরও আগ্রহ কমছে। কেউ দেখার নেই।’’

কে বলল কেউ দেখার নেই? নিজেকে ‘পাহারাদার’ ঘোষণা করে ফেলেছেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পিছনে ‘কৃষকের স্বার্থ রক্ষার’ ঘোষণার বিরাট অবদান ছিল। তাঁরই তো দেখার কথা। কিন্তু রাজ্য সরকারের কোনও পর্যায়েই দেখা হচ্ছে না।

কী হারে কমছে? খরিফের ক্ষেত্রের পরিসংখ্যান বলছে ২০১৬-তে রাজ্যে ফসল বিমা যোজনার আওতায় ছিলেন ৩২লক্ষ ৩৬ হাজার কৃষক। তার মধ্যে ব্যাঙ্ক, সমবায় থেকে কিষান ক্রেডিট কার্ডের ভিত্তিতে ঋণ নেওয়া (লোনী) কৃষক ছিলেন ১৭লক্ষ ২৮ হাজার। আর নন-লোনী (অর্থাৎ যাঁরা কোনও সমবায়, ব্যাঙ্ক থেকে চাষের জন্য ঋণ নেননি) কৃষক ছিলেন ১৫লক্ষ ৮ হাজার।

২০১৮-র খরিফে তা কোথায় পৌঁছেছে? গত ৩১শে জুলাই পশ্চিমবঙ্গে খরিফ মরশুমে ফসল বিমার জন্য আবেদনের শেষদিন ছিল। ইতিমধ্যেই তালিকা চূড়ান্ত। রাজ্যের কৃষি দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮-র খরিফে রাজ্যের ১৪লক্ষ ৫৪ হাজার ৩৯৭জন কৃষক ফসল বিমা যোজনার আওতায় এসেছেন। তাঁদের মধ্যে লোনী-ফারমার ১৪লক্ষ ৫১ হাজার ৯৪০জন। আর নন-লোনী ফারমার? মাত্র ২৪৫৭জন। অর্থাৎ, যাঁদের কিষান ক্রেডিট কার্ড আছে, যাঁরা ব্যাঙ্ক, সমবায় থেকে ঋণ নিয়ে চাষ করেন, তাঁদের বেশিরভাগ বিমার আওতায় আসেননি। আর যাঁরা নন-লোনী ফারমার, অর্থাৎ যাঁদের ভরসা প্রধানত মহাজনরা, তাঁদের মধ্যে বিমার আওতায় পৌঁছোন কৃষক ১৫লক্ষ ৮ হাজার থেকে পৌঁছেছে ২৪৫৭ জনে!

মহাজনের কবলে কৃষকদের পৌঁছে দিচ্ছে সরকারই।

আর ‘লোনী’ কৃষকদের ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা কী? মমতা ব্যানার্জির সরকার বারবার ঘোষণা করছে রাজ্যে ৬৯লক্ষ কৃষকের কিষাণ ক্রেডিট কার্ড আছে। অর্থাৎ তাঁদের ফসল বিমা যোজনার আওতায় থাকার কথা। কিন্তু তাঁরাও সেই সুরক্ষার বাইরে। ২০১৬-তে খরিফে বিমার আওতায় ছিলেন ‘লোনী’দের ১৭লক্ষ ২৮ হাজার। আর ২০১৮-তে তা কমে পৌঁছেছে ১৪লক্ষ ৫৪ হাজার ৩৯৭-এ। প্রায় ৩লক্ষ কৃষকের ফসল সুরক্ষা-ব্যূহের বাইরে।

‘কৃষক-দরদি’ তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে বি জে পি পরিচালিত সরকারগুলির পার্থক্য নেই কিছু। ২০১৬-র জানুয়ারিতে ‘প্রধানমন্ত্রী ফসল বীমা যোজনা’ ঘোষনা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি এই নাম মেনে নেননি। তিনি ওই প্রকল্পের নাম করে দেন ‘বাংলা ফসল বিমা যোজনা।’ কিন্তু দুবছর পর দেখা যাচ্ছে নাম যাই হোক, কাজে দুপক্ষই সমান।

উদাহরণ গুজরাট, রাজস্থান।

কেন্দ্রীয় কৃষি মন্ত্রকের ডাকা বৈঠকে সম্প্রতি গেছিলেন রাজ্য কৃষি দপ্তরের দুই আধিকারিক। তাঁদের কাছে থাকা নথি বলছে, ২০১৬-১৭র খরিফ মরশুমে গুজরাটের ১৮লক্ষ ৪২ হাজার ৩৮৬ জন কৃষক ছিলেন ফসল বিমা যোজনার আওতায়। ২০১৭-১৮-র খরিফ মরশুমে তা নেমে এসেছে ১৪লক্ষ ৮৫ হাজার ৪৭২জনে।

রাজস্থানেরও একই অভিমুখ। সেখানে ২০১৬-১৭র খরিফ মরশুমে বিমার আওতায় ছিলেন ৬২লক্ষ ৩১ হাজার ৫১৪জন। তা একবছর পরে নেমে এসেছে ৫৩লক্ষ ৩৫ হাজার ৩৬৩-তে।

দেশে কৃষি সমস্যা গভীর সংকটে পরিণত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কৃষক আন্দোলন তীব্র হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গেও তা জোরদার হয়েছে। চলতি মাসেই সিঙ্গুর থেকে কলকাতা পর্যন্ত পদযাত্রা করবেন কৃষক, খেতমজুরররা। তাঁদের অন্যতম দাবি ফসলের সুরক্ষা। এমন সময়ে পশ্চিমবঙ্গ তথা দেশে রামমন্দির নির্মাণ নিয়ে প্রচার, রথযাত্রা করছে বি জে পি। আর রাজ্যে এই সুযোগে কৃষকদের প্রসঙ্গ ছেড়ে ‘মা-মাটি-মানুষের’ সরকার বি জে পি-র বিরুদ্ধে গরম ভাষণ শুরু করেছেন।

কিন্তু ফসলের সুরক্ষার বিষয়ে দুজনেই চুপ।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement