সবরিমালায় বিশৃঙ্খলা বরদাস্ত নয়
দর্শণার্থীদের পাশে সরকার: বিজয়ন

সংবাদসংস্থা   ২০শে নভেম্বর , ২০১৮

তিরুবনন্তপুরম, ১৯শে নভেম্বর — সবরিমালা ইস্যুতে কেরলায় বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে রাজ্যজুড়ে বিক্ষোভ আন্দোলন শুরু করছে আর এস এস-বি জে পি। এই ইস্যুতে উসকানিমূলক প্রচার চালাচ্ছে বিভিন্ন উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনও। বি জে পি, আর এস এস-সহ উগ্রহিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির মিলিত এই ষড়যন্ত্র রুখতে কেরালার বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন বলেছেন, রাজ্যসরকার দর্শনার্থীদের পাশে রয়েছে। এই ক্ষেত্রে সরকারের অবস্থান নিয়ে কোনো প্রশ্নই ওঠে না।

রবিবার গভীর রাতে সবরিমাল মন্দির চত্বের (সন্নিধানাম) থাকা নিয়ে পুলিশের জারি করা নিষেধাজ্ঞাকে অমান্য করায় ৬৯জন বি জে পি, আর এস এস’র কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁরা সবরিমালা মন্দিরের দেবতা আয়াপ্পার দর্শনার্থী নয়। এই কথা উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী বিজয়ন বলেন, সংবাদ পরিবেশন করাটাই সংবাদমাধ্যমের একমাত্র কাজ নয়। একইসঙ্গে কি সংবাদ পরিবেশন করা হল তা নিয়ে ভাবা উচি। সোমবার কোঝিকোড়ে সাংবাদিকদের সম্মেলনে ভাষণে তিনি বলেন, সবরিমাল মন্দির সংলগ্ন অঞ্চল থেকে রবিবার গভীর রাতে কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়। ধৃতরা আর এস এস-র কর্মী। ওখানে ক্যাম্প করেছিল তাঁরা। কেন তাঁরা ক্যাম্প করেছিল তা প্রত্যেকেই জানে। এরপরই উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের প্রতি হুঁশিয়ারি দিয়ে বিজয়ন বলেন, সবরিমালা মন্দিরে কিছুতেই বিশৃঙ্খলা করা যাবে না।

সবরিমালা মন্দিরে সব বয়েসের মহিলাদের প্রবেশের অধিকার নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে রায়ের পক্ষে এদিনও দৃঢ় অবস্থান জানিয়ে বিজয়ন বলেন, সুপ্রিম কোর্টের রায় কার্যকর করা ছাড়া সরকারের কাছে আর কোনও রাস্তা নেই। তিনি বলেন, যারা বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছে তাদের পক্ষে সরকার কিছুতেই দাঁড়াবে না। কেরালার সরকার দর্শনার্থীদের বিরুদ্ধে বলে যারা প্রচার চালাচ্ছে তা সঠিক নয়। সবরিমালা মন্দিরে সব বয়েসের মহিলাদের প্রবেশের নির্দেশ দেশের সর্বোচ্চ আদালতই দিয়েছে। এখানে আইনের শাসনও বর্তমান। সরকার তাই আদালতের নির্দেশ মেনেই চলবে। বিজয়ন বলেন, আজকের কেরালার পরিস্থিতিকে ধ্বংস করতে চাইছে সঙ্ঘ পরিবার। কেরালার সরকার কখনই এর পক্ষে দাঁড়াবে না। অন্ধত্ব, কুসংস্কারসহ পশ্চাপদ বিষয়গুলির বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াই সংগ্রাম চালিয়ে কেরালার মানুষ সমাজকে প্রগতিশীলতা ও ঐক্যের অবস্থানকে দৃঢ় করেছে। তা উল্লেখ করতে গিয়ে এদিন বিজয়ন বলেন, রাজ্যের মানুষ সংস্কারের কাজে সফল হয়েছেন, তাঁরা কখনই সঙ্ঘ পরিবারের হিংসাত্মক বিভাজনের রাজনীতিকে সমর্থন করবেন না।

এদিন কেরালাজুড়ে বি জে পি-আর এস এস’র বিশৃঙ্খলা তৈরির অপচেষ্টার বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন সি পি আই (এম) কেরালা রাজ্য কমিটির সম্পাদক কোড়িয়ারি বালাকৃষ্ণাণও। তিনি এদিন সাংবাদিকদের বলেন, রাজ্যে দাঙ্গা বাধাতেই এই ধরনের কর্মসূচি সঙ্ঘ পরিবারের। তিনি সঙ্ঘ পরিবারের ষড়যন্ত্রের কথা উল্লেখ করে বালাকৃষ্ণাণ বলেন, সবরিমালা মন্দির দখলে নিতে চাইছে তারা। একাজে খালিস্তান মডেলও অনুসরণ করছে। পুলিশের কাজে বাধা দিতে মহিলা ও শিশুদেরকে ব্যবহার করতে চাইছে। পুলিশ যখন আইন প্রয়োগের বিষয়ে পদক্ষেপ নিচ্ছে, তাকে বাঁধা দিতে শিশুদের সমানের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বালাকৃষ্ণাণ।

এদিকে, রবিবার রাতে সবরিমালা মন্দির সংলগ্ন অঞ্চলে পুলিশের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করায় আর এস এস কর্মীদের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে রাস্তা অবরোধ, বিক্ষোভ কর্মসূচি নিয়েছিল বি জে পি-সহ উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা। সোমবারের এই কর্মসূচিকে ঘিরে বিশৃঙ্খলা তৈরি অপচেষ্টা চালায় তারা। এদিন তারা তিরুবনন্তপুরমে মুখ্যমন্ত্রী বিজয়নের বাড়ির সামনেও বিক্ষোভ দেখাতে জড়ো হয়। এমনকি কোজিকোড়ে বিজয়নের কনভয়ের সামনেও বিক্ষোভ দেখানোর চেষ্টা করে বি জে পি-র যুব সংগঠনের কয়েকজন কর্মী। দুজন বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কোঝিকোড়ের পুলিশ সুপার এস কৈলাশ মহেশ কুমার।

গত ২৮শে সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়ে সবরিমালা মন্দিরে ঢোকার প্রবেশাধিকার পেয়েছেন সব বয়সের মহিলারা। ওই রায়ের বিরুদ্ধে রাজ্যজুড়ে হিংসাত্মক কর্মসূচি নিয়ে চলেছে বি জে পি, আর এস এস-সহ উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা। ইতিমধ্যে বহু মানুষ আহত হয়েছেন। মাসখানেক মন্দির বন্ধ থাকার পর গত শুক্রবার থেকে ফের সবরিমালা মন্দিরের উদ্দেশ্যে দর্শনার্থীদের যাত্রা শুরু হয়। এই যাত্রাকে ঘিরে হিংসাত্মক ঘটনা রুখতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসাবে মন্দির সংলগ্ন অঞ্চলে ১৪৪ধারা জারি করে পুলিশ। মন্দির সংলগ্ন অঞ্চলে রাতভর দর্শনার্থীদের থাকার বিষয়েও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মন্দির সংলগ্ন অঞ্চলে আর এস এস এবং উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের কর্মীরা জোর করে থেকে যেতে চাইলে পুলিশ ৬৯জনকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশের এই পদক্ষেপের সমালোচনা করেছে কেরালা হাইকোর্ট। বিচারপতি পি আর রামচন্দ্র মেনন এবং অনিল কুমারকে নিয়ে গঠিত ডিভিসন বেঞ্চ এদিন মামলার শুনানির শেষে পুলিশের আচরণে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন নিয়েও প্রশ্ন তোলে আদালত। তবে, শিশু, মহিলা, বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধীদের মন্দিরে প্রবেশের বিষয়ে কোনও নিষেধাজ্ঞা জারি করা যাবে না বলেও এদিন ডিভিসন বলেছেন।

এদিনই সবরিমালা মন্দিরে পৌঁছেছেন কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠন হিন্দু ঐক্য বেদীর সভাপতি কে পি শশীকলা। দুদিন আগে পুলিশের নির্দেশ অমান্য করে মন্দিরে থাকার কারণে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিল। সোমবার আদালতের নির্দেশে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এদিন তিনি নাতির মুখেভাত উপলক্ষে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে মন্দিরে যান। তবে, নিলাক্কলের পুলিশ সুপার যতীশ চন্দ্রের পাঠানো নোটিসে বলা হয়েছে, মন্দিরের সংলগ্ন অঞ্চলে শশীকলা ৬ঘণ্টার বেশি সময় কাটাতে পারবেন না। ওই দিন মন্দিরে যাওয়ার পথে বিজেপি-র সাধারণ সম্পাদক কে সুরেন্দ্রন গ্রেপ্তার হন। তবে কে সুরেন্দ্রনের ১৪দিনের জেল হেপাজতের নির্দেশ দিয়েছে আদালত। সবরিমালা মন্দিরে যাবেন বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী আলফোন্স কান্নানথানামও। তবে, মন্দিরে সংলগ্ন অঞ্চল থেকে গ্রেপ্তার করার ঘটনায় পুলিশের আচরণের বিরুদ্ধে এদিন সরব হন তিনি। তাঁর অভিযোগ, মন্দির সংলগ্ন অঞ্চলটিকে প্রায় ‘যুদ্ধক্ষেত্রে’ পরিণত করা হয়েছে। ‘ডাকাত’দের সঙ্গে যেরকম ব্যবহার করা হয় পুলিশ দর্শনার্থীদের সঙ্গে সেরকমই আচরণ করছে। সবরিমালা ইস্যুতে বি জে পি-র সঙ্গেই সুর মিলিয়ে কেরালা সরকারের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে কংগ্রেস। বিরোধী দলনেতা রমেশ চেন্নাইথাল এদিন বলেন, শুধু আর এস এস-র কর্মীরাই নয় সাধারণ দর্শনার্থীদেরকেও পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।এর প্রতিবাদে কংগ্রেসও রাজ্যজুড়ে বিক্ষোভ দেখাবে বলে এদিন ঘোষণা করেছেন চেন্নাইথাল।

এদিক সব বয়সের মহিলাকে প্রবেশাধিকারের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায় কার্যকর করতে আরও সময় চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার কথা মন্দিরের তত্ত্বাবধায়ক ত্রাভাঙ্কোর দেবস্বম বোর্ড (টি ডি বি)। সুপ্রিম কোর্ট যে রায় দিয়েছে তা কার্যকর করতে ও এই বিষয়ে পরিকাঠামে গড়ে তুলতেই বাড়তি সময় প্রয়োজন বলে টি ডি বি সূত্র জানিয়েছে।