তিস্তা সেচ প্রকল্প বন্ধের
চেষ্টা রাজ্যের সরকারের

কৃষকদের স্বার্থে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি অশোক ভট্টাচার্যর

নিজস্ব প্রতিনিধি   ২০শে নভেম্বর , ২০১৮

কলকাতা, ১৯শে নভেম্বর— তিস্তা-মহানন্দা সেচ প্রকল্পের দশটি অফিস বন্ধ করে দিয়েছে রাজ্য সরকার। থমকে গেছে উত্তরবঙ্গের ওই সেচ প্রকল্পের কাজ। রাজ্য সরকারের কোনও উদ্যোগ নেই। তাই ওই এলাকার এক বিধায়ক হিসাবে, শিলিগুড়ির মেয়র অশোক ভট্টাচার্য সোমবার এই বিষয়ে চিঠি দিয়েছেন রাজ্য সরকারকে।

রাজ্যের সেচমন্ত্রী সৌমেন মহাপাত্রকে লেখা ওই চিঠিতে তিস্তা-মহানন্দা সেচ প্রকল্পের কোন দশটি অফিস বন্ধ হয়ে গেছে, তার তালিকাও দিয়েছেন অশোক ভট্টাচার্য। তিনি লিখেছেন,‘‘...এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করুন এবং এই সমস্ত তুলে দেওয়া কার্যালয়গুলি ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করুন। সামগ্রিক প্রকল্পটির কাজ দ্রুত সমাপ্ত করে উত্তরবঙ্গের পাঁচটি জেলার কৃষকদের চাষের জন্য সেচের জল পাওয়া নিশ্চিত করুন।’’

এই সেচ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে উত্তরবঙ্গের প্রায় ছটি জেলার কৃষির উন্নতি হবে। লক্ষাধিক হেক্টর জমির চাষে জলের ব্যবস্থা হবে। বামফ্রন্ট সরকারের উদ্যোগে এই প্রকল্পটি জাতীয় প্রকল্প হিসাবে স্বীকৃত হয়। কেন্দ্রীয় সরকার এই প্রকল্পের আর্থিক দায় বহনে সম্মত হয়। কিন্তু গত আট বছরে এই প্রকল্পটির কোনও অগ্রগতি হয়নি বলেই অভিযোগ কৃষকদের। ইতিমধ্যে এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত দশটি অফিস বন্ধ করেছে রাজ্য সরকার। একাংশের কর্মী অবসর নিয়েছেন। এছাড়াও অনেক কর্মীকে বদলি করেছে সরকার। সব মিলিয়ে প্রায় তিনশো জন কর্মী কমেছে ওই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত রাজ্য সরকারের বিভাগ থেকে। কর্মচারীদের আবাসনগুলি পরিত্যক্ত। চুরি হয়ে যাচ্ছে দরজা, জানালাসহ নানা কিছু।

যে অফিসগুলি রাজ্য সরকার বন্ধ করে দিয়েছে, সেগুলি হলো— শিলিগুড়ির তিনবাত্তির তিস্তা রিসোর্স ডিভিসন-১, ডিভিসন-২, তিস্তা রিসোর্স সার্কেল, তিস্তা ডিজাইন ডিভিসন-১, ডিভিসন-২, তিস্তা ডিজাইন সার্কেল, জলপাইগুড়ির তিস্তা ক্যানেল ইনভেস্টিগেশন ডিভিসন, রায়গঞ্জের তিস্তা ক্যানাল ডিভিসন-৩, তিস্তা ক্যানল হেড কোয়ার্টার ডিভিসন, তিস্তা ক্যানাল সার্কেল।

গত কয়েক বছর ধরেই এই প্রকল্পটি অবহেলিত। এবার সেটিকে পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার অপচেষ্টা হচ্ছে বলেই অশোক ভট্টাচার্যর অভিযোগ। প্রসঙ্গত, ১৯৭৬-৭৭ সালে পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদন পেয়ে প্রাথমিক কাজ শুরু হয়। পরবর্তীকালে তিস্তা থেকে জলঢাকা পর্যন্ত ৩০.৩১ কিমি খাল কেটে ০.৩৯ হেক্টর সেচের জন্য ধরে প্রথম উপধারাকে সংশোধিত করে ৩.৪২ লক্ষ হেক্টর করা হয়। ২০০৯ সালের ২০শে জানুয়ারি, ২০০৮ সালের হিসাবে ২৯৮৮.৬১ কোটি টাকার পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদন পায়। নানারকম বাধার মধ্যে দিয়ে কাজ এগিয়েছে। সমগ্র তিস্তা প্রকল্পটির কাজ ত্বরান্বিত করার জন্য বামপন্থী কৃষক সংগঠনগুলি বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন গড়ে তোলে।

১৯৭৮সালের ডিসেম্বর মাসে বামফন্ট সরকার ঘোষণা করে পশ্চিম দিনাজপুর জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় তিস্তার জল দেওয়ার ব্যবস্থা হবে। ২৬৩৫কোটি টাকা বরাদ্দ হয়। শিলিগুড়ি মহকুমার কাজ শেষ করে দিনাজপুর জেলার চোপড়াতে কাজ শুরু হয় ১৯৭৯সালের জুন মাসে। ১৯৮২সালে চোপড়া ব্লক থেকে তিস্তার খনন কাজ শেষ হয়। তিস্তা ও মহানন্দার সংযোগস্থল হাপতিয়াগছে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ার পরিকাঠামো দেখা একই সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ বিদ্যুৎ পর্ষদ এবং রাজ্য সরকারের যৌথ উদ্যোগে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি হয়। ইসলামপুর গোয়ালপোখর পর্যন্ত কাজ শেষ হয় ১৯৯০-৯১-এ। শিলিগুড়ি থেকে তিস্তার জল চোপড়া, ইসলামপুর হয়ে গোয়ালপোখরের কিছু এলাকায় প্রবাহিত হয়। ১৯৯২সালে জেলা বিভাজন হয়। তিস্তার খনন কাজের জন্য ফের ৩৪০০কোটি টাকা বরাদ্দ হয়। উত্তর দিনাজপুর জেলার নাগর নদীর সংযোগস্থল পর্যন্ত খননকাজ শুরু হয়। রায়গঞ্জ ব্লকের ভাটলের তাজপুর থেকে হেমতাবাদ, কালিয়াগঞ্জ, বাংলাদেশ সীমান্ত হয়ে দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা বুনিয়াদপুর, বংশীহারি পর্যন্ত খনন কাজ হওয়ার চেষ্টা করেছিল তদানীন্তন সরকার।

২০১৫ সালের মধ্যে প্রথম উপধারায় ৩.৪২ লক্ষ হেক্টর জমিতে সেচের জল দেওয়া সম্ভব হয়নি। কারণ হঠাৎ করেই এই প্রকল্পের কাজের গতি অনেকটাই কমে যায়। গাজোলডোবার তিস্তা ব্যারেজের অনেক উপরে দার্জিলিঙ পার্বত্য অঞ্চলের গেইলখোলায় জলাধার তৈরি করে বর্ষার জল ধরে রেখে পরে তিস্তা দিয়ে ছাড়ার পরিকল্পনা দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ হিসাবে তিস্তা প্রকল্পে আছে। এই কাজ দ্রুত বাস্তবায়িত না হওয়ার দরুন তিস্তা প্রকল্প সুখা মরশুমে অর্থহীন হয়ে পড়ছে। এরই মধ্যে প্রকল্প গুটিয়ে নিতে অফিসই বন্ধ করে দিচ্ছে রাজ্য সরকার।