লড়াই হোক নতুন
বিদ্যুৎ আইনের বিরুদ্ধে

প্রশান্ত নন্দীচৌধুরি   ২০শে নভেম্বর , ২০১৮

নতুন বিদ্যুৎ আইন কার্যকর করতে উদ্যোগী মোদী সরকার। এই আইন বিদ্যুৎ ব্যবসায়ীদের স্বার্থে। এই আইন কার্যকর হলে গরিব ও গ্রামীণ মানুষ হারাবে বিদ্যুতের অধিকার। প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ আইনের আসল চরিত্র তুলে ধরা হয়েছে এই নিবন্ধে।

বর্তমান সময়ে আমাদের দেশের মানুষের সামনে অনেকগুলি বড় বিপদ অপেক্ষা করছে। এই লেখায় তার দীর্ঘ তালিকা পেশ না করে প্রধান ২/১টি উল্লেখ করে মূল আলোচ্য বিষয়ে যাব। সাধারণভাবে ভারতের মানুষ অতি সংবেদনশীল। গুজরাটে একজন লোক এক দশকের বেশি সময়কাল ধরে মুখ্যমন্ত্রিত্বের কৃতিত্ব (!) নিয়ে এসে ভারতের মানুষকে বললেন তোমাদের সুদিন এনে দেব। সকলকে ১৫ লক্ষ করে টাকা দেব। বছরে দুকোটি মানে পাঁচ বছরে দশ কোটি লোককে চাকরি দেব। প্রতি তিনজনে একজন ঐ ধাপ্পায় ভুলে ভোট দিয়ে খাল কেটে কুমির ডেকে আনল। আবার লোকসভা নির্বাচন। আবার নতুন কথার ফুলঝুরি নিয়ে ক্রমে মানুষকে বোকা বানিয়ে দ্বিতীয়বারের জন্য প্রধানমন্ত্রীর পদে আসীন হবার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। অবশ্যই এটা প্রধান বিপদ। সব খেটে খাওয়া মানুষকে বিপদের সামনে ফেলে দিতে একটা কর্মসূ‍‌চি ঘোষিত হয়েছে যার নাম ‘ইজ অব মেকিং বিজনেস’ অর্থাৎ ব্যবসায়ীদের স্বাচ্ছন্দ্য দেবার জন্য কেড়ে নিতে হবে শ্রমিকের অধিকার। তাই দেশের ৪৪টা শ্রম আইন বাতিল করে ৪টি শ্রম বিধি (কোড) চালু হবে। ৩টির খসড়া প্রকাশিত হয়েছে। শ্রমিকের অধিকার খর্ব হবে। ব্যবসায়ী আর প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা বাড়বে। ৮-৯ই জানুয়ারি, ২০১৯-এর ধর্মঘটের প্রচারে সেটা তুলে ধরার চেষ্টা হচ্ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহণ, তেল, কয়লা জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ পরিষেবা সহ মানুষের দৈনন্দিন সব ক্ষেত্রগুলিকে ব্যবসা করার অবাধ সু‍‌যোগ এবং সুবিধা দেবার জন্য সব কিছু করতে হবে প্রাইভেট। এটাই হবে‍‌ দেশের অর্থনীতির ভিত্তি। আমাদের দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী যিনি নিজেকে ‘চা ওয়ালা’ থেকে ‘চৌকিদার’-এর পদমর্যাদায় চিহ্নিত করেছেন। তিনি আসলে দেশের মানুষের স্বার্থের চৌকিদার নন। পুঁ‍‌জিবাদ-সাম্রাজ্যবাদী শক্তির স্বার্থ সুরক্ষার চৌকিদার।

বর্তমান নিবন্ধের মূল বিষয় বিদ্যুৎ। প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ আইন। স্বাধীন দেশের প্রথম বিদ্যুৎ আইনটি ছিল ‘‘বিদ্যুৎ (সরবরাহ) আইন, ১৯৪৮’’ এই আইনের উদ্দেশ্য ছিল দ্রুত বিদ্যুতায়ন। ঐ আইনে বিদ্যুৎকে ব্যবসায়িক সামগ্রী হিসাবে দেখা হয়নি। ঐ আইনের মর্মবস্তু অনুযায়ী বিদ্যুৎ ছিল আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য একটি অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবা। ঐ আইন অনুযায়ী কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ প্রাধিকরণ (CEA) এবং বিদ্যুৎ পর্ষদগুলি গঠিত হয়। বিদ্যুৎ পর্ষদগুলিকে লাভ করার নির্দেশ ঐ আইনে দেওয়া হয়নি। আস‍‌লে ঐ সময়ে ভারতের পুঁজিবাদ তার শৈশব অবস্থায় ছিল। পুঁজিবাদ বিকাশের জন্য জনগণ ও রাষ্ট্রের সম্পদ চুরি করার যথেষ্ট সময় তাঁরা পাননি। তখন দেশের শক্তিশালী রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি — যাঁরা বিজয় মাল্য, নীরব মোদী, মেহুল চোকসি (ধরা পড়ে গে‍‌ছে), আদানি, আম্বানি, টাটা, বিড়লা, গোয়েঙ্কাদের টাকার জোগান দেবে। বিদ্যুৎ একটি পুঁজি নিবিড় শিল্প। এখানে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগ করার ক্ষমতা তখন দেশের পুঁজিপতিদের ছিল না। তাই বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের প্রাধান্য। প্রথম পাঁচটি পাঁচশালা পরিকল্পনার সময়কালে বিদ্যুৎ পর্ষদগুলি প্রায় সওয়া কোটি সেচপাম্প বিদ্যুতায়িত করে ভারত নামক নিরন্ন বুভুক্ষু খাদ্য আমদানি করা দেশটিকে খাদ্যে স্বয়ম্ভর করে তোলে। এই কাজ করতে গিয়ে লাভ ক্ষতির অঙ্কটিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ১৯৮৫ সাল থেকে বলা হলো বিদ্যুৎ পর্ষদকে বা‍‌ণিজ্যিক হিসাব ব্যবস্থায় যেতে হবে। লাভ না করার ফলে কম মাশুলে বিদ্যুৎ ভোগ করে কৃষি, শিল্পে উৎপাদন বেড়েছে। দেশের অর্থনীতির বিকাশ ঘ‍‌টেছে। এই দিকটিকে উপেক্ষা করে বলা হলো বিদ্যুৎ পর্ষদে ‘বাণিজ্যিক’ ক্ষতি হচ্ছে। তাই প্রাইভেট আনতে হবে। এল এনরন। এল এ ই এস, অগডেন, কো-জেনট্রিক্স। সে কিস্‌সা ভিন্ন। বারান্তরে বলার জন্য স্থগিত থাক। আমরা আসি বিদ্যুৎ আইন ২০০৩ এবং তার পরের সময়কালে। নতুন বিদ্যুৎ আইন-এর খসড়াটি ৯বার পরিবর্তন করে বিদ্যুৎ বিল ২০০১ নামে সংসদে পেশ হয় এবং বিদ্যুৎ আইন ২০০৩ নামে পাশ হয়। এই আইনের ৬নং ধারা অনুযায়ী গ্রামে বিদ্যুৎ জোগানের দায় কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্যের ঘাড়ে চাপি‍‌য়ে দেয়। পারস্পরিক ভরতুকি তুলে দেবার সিদ্ধান্ত নেয়।

২০০৪ সালে বামপন্থীদের সমর্থনে কেন্দ্রে ইউ পি এ-১ সরকার ক্ষমতাসীন হয়। বামপন্থীদের চাপে ঐ আইনের কয়েকটি জনবিরোধী ধারা সংশোধিত হয়। যার ফলে গরিব মানুষ এখনও কম দামে বিদ্যুৎ পাচ্ছেন। ঐ সংশোধনীর মান্যতা অনুযায়ী ভারতের ৯৭ শতাংশ গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে। ১০০ কোটির বেশি মানুষের বাড়িতে বিদ্যুৎ গেছে। নরেন্দ্র মোদীর ছবিসহ বিজ্ঞাপন দিয়ে এর কৃতিত্ব বি জে পি দাবি করলেও — এর কৃতিত্ব বামপন্থীদের। অটলবিহারী বাজপেয়ীর এন ডি এ সরকার (যে সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ছিলেন মমতা ব্যানা‍‌র্জি), যে আইন করেছিল সেই আইন ও নীতি বলবৎ থাকলে দেশের আশি কোটির বেশি মানুষ এখনও অন্ধকারেই থাকতেন। ২০০৪-এর ইউ পি এ সরকার বামপন্থীদের চাপে ঐ আইন পরিবর্তন করতে বাধ্য হন। মানুষকে এসব কথা মনে করিয়ে দেবার দায়িত্ব বামপন্থীদের নিতে হবে। ২০০৩-এর বিদ্যুৎ আইন প্রণয়নের সময়ে বিদ্যুৎ পর্ষদগুলির ক্ষতির কথা বলা হয়েছিল। প্রায় পাঁচ দশক সময়ে দেশের কৃষি শিল্পসহ গরিব মানুষকে সস্তায় বিদ্যুৎ জোগাতে ক্ষতি হয়েছিল ৩০ হাজার কোটি টাকা। নতুন আইনের ফলে দক্ষতা বাড়বে, প্রাইভেট কোম্পানি আসবে — প্রতিযোগিতার বাতাবরণে বিদ্যুতের মাশুল কমে যাবে — এইসব লম্বা চওড়া কথা বলে দেশের মানুষকে ধাপ্পা দিয়েছিল অটলবিহারী-মমতা ব্যানার্জিদের সরকার। গত ১৫ বছরে বিদ্যুৎ মাশুল কয়েকগুণ বেড়েছে। আর বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলির মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে সাড়ে পাঁচ লক্ষ কোটি টাকা আর ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে সাড়ে চার লক্ষ কোটি টাকা। রাষ্ট্রীয় ব্যাঙ্কগু‍‌লির অনাদায়ী ঋণ ছাড়িয়েছে দশ লক্ষ কোটি টাকা। ব্যাঙ্কের ঋণ শোধ না করার দায়ে বিদ্যুৎ ক্ষেত্রটি দেশের অর্থনীতিতে শীর্ষ স্থান অধিকার করেছে। গুজরাটের তিনটি প্রাইভেট বিদ্যুৎ কোম্পানি আমদানি করা কয়লা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে পঁচিশ বছর ধরে সস্তায় বিদ্যুৎ জোগান দেবার জন্য পাঞ্জাব, হরিয়ানাসহ দশটি রাজ্যের বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলির সাথে দীর্ঘ মেয়াদি চুক্তি করে। ঐ চুক্তির শর্তের মধ্যে কোথাও ছিল না বিদেশে কয়লার দাম বা ডলারের দাম বাড়‍‌‍‌লে বিদ্যুতের দাম বাড়বে। গত ২৯শে অক্টোবর দেশের শীর্ষ আদালতের রায়ে টাটা, আদানি এবং আম্বানিদের ঋণগ্রস্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলিকে বাঁচাতে গুজরাট সরকারের গঠিত একটি কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী ১.৯ লক্ষ কোটি টাকার অতিরিক্ত মাশুল সংগ্রহের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রাইভেট কোম্পানির ক্ষতি হলে বাঁচাবে সরকার —বাড়তি মাশুলের বোঝা বইবে জনগণ আর সরকারি মালিকানার বিদ্যুৎ পর্ষদগুলিকে আইন করে তুলে দেওয়া হবে।

১৯শে ডিসেম্বর ২০১৪ বিদ্যুৎ (সংশোধনী‍‌) বিল, ২০১৪ লোকসভায় উপস্থাপিত হয়। বিলটি সংসদের বিদ্যুৎ স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। ঐ কমিটি বিদ্যুৎ শ্রমিক কর্মচারী ইঞ্জিনিয়ারদের জাতীয় সমন্বয় কমিটি বা কোনও শ্রমিক কর্মচারী সংগঠনের বক্তব্য না শুনে শুধুমাত্র বণিকসভাগু‍‌লির বক্তব্য শুনে রিপোর্ট জমা দেয়। রিপোর্টে দেখা যায় ঐ জনবিরোধী আইনের বিরুদ্ধে ২১টি রাজ্য সরকারের (পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল সরকার নীরব ছিল) আপত্তিও গৃহীত হয়নি। ৬ই নভেম্বর, ২০১৫ কেরালার কোচিনে‍‌ বিদ্যুৎ মন্ত্রীদের সম্মেলন স্থলে কুড়ি হাজার বিদ্যুৎকর্মী ইঞ্জিনিয়ার সমবেত হয়ে প্রতিবাদ করেন। তখন তৎকালীন বিদ্যুৎমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল কর্মী ইঞ্জিনিয়ারদের সাথে আলোচনা শুরু করেন। দিল্লিতে কয়েকটি বৈঠকে কিছু ক্ষেত্রে মতপার্থক্য কমে আসে। নতুন বিদ্যুৎমন্ত্রী আগের সমস্ত আলোচনা নস্যাৎ করে গত ৭ই সেপ্টেম্বরে অন্য একটি বিদ্যুৎ (সংশোধনী) আইন, ২০১৮ প্রকাশ করে, ৪৫ দিনের মধ্যে মতামত দেবার আহ্বান জানায়। ভারতের বিদ্যুৎকর্মী ফেডারেশন এবং বিদ্যুৎ ইঞ্জিনিয়ারদের সর্বভারতীয় ফেডারেশন তাদের সাধারণ মত ও কয়েকটি ক্ষেত্রে তীব্র বিরোধিতা করে স্মারকলিপি জমা দিয়েছে।

আপত্তিকর বিষয়গুলি কি?

 বিদ্যুৎ ক্ষেত্রটি সংবিধানের যুগ্ম তালিকার বিষয় হলেও সমস্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে কুক্ষিগত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

 বিদ্যুৎ মাশুল নির্ধারণে রাজ্য সরকারের নীতি নির্ধারণ ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে দেওয়া হয়েছিল রাজ্য বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের হাতে। বর্তমান প্রস্তাবে সেই ক্ষমতা যাবে কেন্দ্রের হাতে।

 প্রযুক্তিগত কারণে বিদ্যুৎক্ষেত্রের প্রধান তিনটি শাখা ছিল উৎপাদন, সংবহন ও বণ্টন। ২০০৩-এর আইনে চার নম্বর শাখা যুক্ত করা হয়েছিল ট্রেডিং বা কেনাবেচা। অর্থাৎ কোনও ব্যবসায়ী শিল্প ক্ষেত্রে কোনও স্থায়ী বিনিয়োগ না করে একজনের কাছ থেকে কিনে আর একজনকে বেচে মুনাফা করবে যার ভার বইতে হবে বিদ্যুৎ গ্রাহককে।

 প্রস্তাবিত সংশোধনীতে বণ্টন ব্যবস্থাকে আরও টুকরো করা হবে — বিতরণ ও সরবরাহ। অর্থাৎ পাঁচ নম্বর শাখা সরবরাহের ব্যবসা যে করবে তার জন্য কোনও বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে না। বিতরণ সংস্থার লাইন, ট্রান্সফর্মারসহ সমস্ত নেটওয়ার্ক ব্যবহারের জন্য সামান্য কিছু ভাড়া দিয়ে ঐ ‍ কোম্পানি মুনাফা করবে।

সবই ব্যবসায়ীর সুবিধা। আপনি নতুন বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য কার কাছে যাবেন — বিতরণ কোম্পানি না সরবরাহ কোম্পানির কাছে? একই এলাকায় একাধিক সরবরাহ কোম্পানি থাকবে তার মধ্যে আপনাকে একটা কোম্পানিকে বেছে নিতে হবে। আপনার বাড়িতে দুটো ঘর বানালেন বা এ সি বসালেন, বাড়তি বিদ্যুতের জন্য কোন কোম্পানির কাছে যাবেন? যার কাছে আপনার প্রথম সংযোগ তার কাছে গেলেন। সে বল‍‌বে আমার বরাদ্দ অনুযায়ী বিদ্যুৎ দেবার কোটা শেষ। ট্রান্সফর্মারের ক্ষমতা শেষ, আপনি অন্য কোম্পানির থেকে নিন। অর্থাৎ আপনার দুই ঘরে দুই কোম্পানির বিদ্যুৎ থাকবে। দুজনকে বিল মেটাতে হবে। কোনও সমস্যা হলে একজন বলবে আমাদের সব ঠিক আছে অন্য কোম্পানির কাছে যান। অপরজনও একই কথা বলবে, আপনি কোথায় যাবেন? এই নীতির প্রবক্তারা যুক্তি দেখাবে — আপনি দুই কোম্পানির দুটি মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারলে দুই কোম্পানির বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারবেন না কেন? নতুন আইনে গ্রাম আর শহরের বৈষম্য বাড়বে। বিদ্যুৎ ব্যবসা করার জন্য যে প্রাইভেট কোম্পানিগুলি এগিয়ে আসবে তাদের ঝোঁক থাকবে শুধু শহরের শিল্প বাণিজ্য সমৃদ্ধ এলাকায় বিদ্যুতের ব্যবসা করার। কারণ এখানে লাভ করার সুযোগ বেশি থাকবে। তার ফলে ঘন বসতির শহরে বিদ্যুতের দাম কম হবে। গ্রামে বেশি হবে। এখন যেমন রাজ্য জুড়ে একসাথে মাশুল নির্ধারিত হয় তার বৈষম্য থাকে না। সেই সু‍‌যোগ ভবিষ্যতে থাকবে না।

অপর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পারস্পরিক ভরতুকি। বর্তমানে যাঁদের আর্থিক সংগতি বেশি — পরিমাণগত ভাবে বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন তাদের কাছ থেকে গড় ব্যয়ের থেকে কিছুটা বেশি মাশুল নিয়ে সেই অতিরিক্ত আয় দিয়ে গরিব কম ব্যবহারকারীদের খানিকটা কম দামে বিদ্যুৎ দেওয়া হয়। প্রস্তাবিত আইনে স্পষ্ট ভাষায় বলা আছে এই ব্যবস্থা তিন বছরের মধ্যে তুলে দেওয়া হবে। ভরতুকি যদি দিতেই হয় রাজ্য সরকারকে বিদ্যুৎ গ্রাহকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে নগদে জমা করতে হবে। দেশের বেশিরভাগ কর সংগ্রহ করে কেন্দ্রীয় সরকার। আর ভরতুকির দায় থাকবে রাজ্যের। দেশের বেশিরভাগ রাজ্যেরই হাড়ির হাল — আমাদের কারোরই অজানা নয়। এই রাজ্যে সরকারি কর্মীদের বেতন, মহার্ঘ ভাতা বৃদ্ধি করার সংগতিও নেই বলছে। আয় বাড়াতে গ্রামে গ্রামে মদের দোকানের লাইসেন্স বিলি করছে। চিট ফান্ডের প্রতারিতদের যেমন বলে দিয়েছে, ‘‘যা গেছে তা যাক’’ তেমনি বিদ্যুতের ভরতুকি দেবার দায়ও অবশ্যই রাজ্য সরকার নেবে না।

কিন্তু প্রস্তাবিত আইনটি কার্যকর হলে গরিব ও গ্রামীণ মানুষের বিদ্যুতের অধিকারই ‍ লোপ পাবে তার বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ আন্দোলন অনুপস্থিত। সংসদের ভিতরে লড়াই করার জন্য বামপন্থী শক্তি এই মুহূর্তে হীনবল। কিন্তু সংসদের বাইরে আন্দোলনের জন্য এ বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেবার প্রশ্নটি প্রায় অনুচ্চারিত। সংসদের ‍ শীতকালীন অধিবেশনেই বিলটি পাশ করিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হবে। বিদ্যুৎকর্মী ইঞ্জিনিয়ারদের জাতীয় সমন্বয় কমিটি সংসদে বিলটি উত্থাপন করা হলে তাৎক্ষণিক ধর্মঘট করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। কিন্তু এই অন্ধ পুঁজিবাদী, সাম্রাজ্যবাদী, সাম্প্রদায়িকতাবাদী শক্তির প্রতিভূ সরকারকে নিরস্ত করার জন্য বিদ্যুৎ কর্মী ইঞ্জিনিয়ারদের একক শক্তি যথেষ্ট নয়। দেশের ব্যাপক অংশের মানুষ নীরব দর্শকের ভূমিকা নিয়ে থাকলে দেশ হবে অন্ধকারে নিমজ্জিত। এই মুহূর্তে সংঘবদ্ধ সংগ্রামের প্রয়োজন।