যুক্তিবাদ প্রতিষ্ঠাই এই সময়ের কাজ

শতবর্ষে স্মরণ দেবীপ্রসাদকে

নিজস্ব প্রতিনিধি   ২০শে নভেম্বর , ২০১৮

কলকাতা, ১৯শে নভেম্বর- গোটা দেশে যখন চিন্তার জগতে ভাববাদী দর্শনের তীব্র আক্রমণ নেমে আসছে, তখন মানুষের মধ্যে নিরন্তর থেকে এই আক্রমণকে খণ্ডন করে যুক্তিবাদকে প্রতিষ্ঠিত করাটাই এই মুহূর্তে বামপন্থীদের কর্তব্য। এই লড়াইয়ে আমাদের হাতিয়ার অধ্যাপক দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের অসামান্য রচনাগুলি। সি পি আই (এম) পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির উদ্যোগে অধ্যাপক দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে সোমবার প্রমোদ দাশগুপ্ত ভবনে আয়োজিত এক সভায় একথা বলেন বক্তারা। সভায় সভাপতিত্ব করেন সি পি আই (এম) পলিট ব্যুরো সদস্য বিমান বসু। বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক নির্মাল্যনারায়ণ চক্রবর্তী এবং পার্টির রাজ্য সম্পাদক সূর্য মিশ্র।

এদিন সভায় অধ্যাপক দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় সম্পর্কে একটি পুস্তিকার আনুষ্ঠানিক প্রকাশ করেন সূর্য মিশ্র। এই অনুষ্ঠানেই ‘বিদ্রোহী চার্বাক’ নামে একটি নাটকের বই বক্তাদের হাতে তুলে দেন অধ্যাপক শুভঙ্কর চক্রবর্তী। সভায় অধ্যাপক নির্মাল্যনারায়ণ চক্রবর্তী দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের রচনাগুলির বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করে প্রাঞ্জল ভাষায় তা ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, অধ্যাপক দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের কাজকে মূলত তিনটি ভাগে বিভক্ত করা যায়। প্রথমত, তিনি ভাববাদী দর্শনকে খণ্ডন করেছেন মার্কসীয় দর্শনের পটভূমিতে। তাঁর মতে, শ্রেণিবিভক্ত সমাজের বৈষম্য, দৈন্য যতদিন থাকবে, ততদিন শুধুমাত্র যুক্তি দিয়ে ভাববাদী দর্শনকে খণ্ডন করা যাবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত না শ্রেণিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা যাবে, ততদিন এই লড়াই চলতেই থাকবে। দ্বিতীয়ত, তিনি বস্তুবাদী দর্শনের প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে অক্লান্ত চেষ্টা করে গেছেন নানা লেখার মধ্যে দিয়ে। এই প্রসঙ্গে তাঁর শেষ বয়সে অনবদ্য লেখা ‘ভারতে বস্তুবাদ প্রসঙ্গে’-র উল্লেখ করেন অধ্যাপক চক্রবর্তী। এছাড়া, সর্বোপরি উল্লেখযোগ্য যে কাজ অধ্যাপক চট্টোপাধ্যায় করেছেন, তা হলো প্রাচীন ভারতে বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাস রচনা করা। তিনি মনে করতেন, ভারতের প্রাচীন ইতিহাসকে নানারকম উপকথা, অতিকথামুক্ত করতে হবে, তাহলেই বিজ্ঞানমনস্কতার প্রসার ঘটানো সম্ভব।

সূর্য মিশ্র তাঁর বক্তব্যে অধ্যাপক দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের অসামান্য অবদানের কথা তুলে ধরে বলেন, ই এম এস নাম্বুদিরিপাদ তাঁর সম্পর্কে বলতেন ‘ভারতে ধর্মনিরপেক্ষতার দর্শনের পথিকৃৎ’। তাঁর জন্মশতবর্ষের সূচনা উপলক্ষে এই সভার আয়োজন করা হয়েছে। সারা বছর ধরে নানা কাজ ও অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে আমরা তাঁকে স্মরণ করব। এর মধ্যে অন্যতম কাজ হলো তাঁর কিছু লেখার পুনঃপ্রকাশ এবং পুনর্মুদ্রণ করা। সূর্য মিশ্র অধ্যাপক দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের অসামান্য রচনা ‘দার্শনিক লেনিন’-এর ব্যাখ্যা করে বলেন, বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশে লেনিন যে অবদান রেখে গেছেন অধ্যাপক চট্টোপাধ্যায় তা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন। লেনিনের রচনাবলি পাঠ করার ক্ষেত্রে একটি অন্যতম সহায়ক গ্রন্থ এই বইটি। মিশ্র ভাববাদ ও বস্তুবাদী ধারণার মধ্যে দীর্ঘ সংঘাতের উল্লেখ করে বলেন, এখনও এই সংঘাত চলছে। এই মুহূর্তে গোটা দেশে যে চ্যালেঞ্জের সম্মুখে যুক্তিবাদী দর্শন, সেই চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করাই আমাদের এখনকার কর্তব্য। বিজেপি-আরএসএস আবার ‘রথযাত্রা’র নামে ধর্মীয় বিভাজনের চেষ্টায় নামতে চলেছে। এরাজ্যের শাসকদলও পালটা যাত্রার নামে একই খেলায় নামছে। এই অবস্থায় যুক্তিবাদকে প্রতিষ্ঠিত করতে আগামী ৬ই ডিসেম্বর আমাদের রাস্তায় থাকতে হবে। তার আগে কৃষক ও খেতমজুর সংগঠনের উদ্যোগে সিঙ্গুর থেকে কলকাতা পদযাত্রা এবং পরে আগামী ৮-৯ই জানুয়ারি শ্রমিক-কর্মচারী সংগঠনগুলির ডাকে ঐক্যবদ্ধ সাধারণ ধর্মঘটকে সফল করার উদ্যোগ আমাদের নিতে হবে। যুক্তিবাদকে প্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রামে বিন্দুমাত্র শৈথিল্য থাকলে অধ্যাপক দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়কে স্মরণ করা বৃথা হয়ে যাবে। নিরন্তর মানুষের মধ্যে থেকেই এই কাজ আমাদের করে যেতে হবে।

সভাপতির ভাষণে বিমান বসু অধ্যাপক দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের জীবন ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, আমরা যারা বস্তুবাদী দর্শনচর্চার কাজ করছি, তাঁর জীবদ্দশায় আরও অনেককিছু কাজ আমরা করতে পারতাম, এই ত্রুটি আমাদের স্বীকার করতেই হবে। দর্শনচর্চায় তাঁর অবদানের জন্য অধ্যাপক দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় দেশে-বিদেশে সারস্বত সমাজের কাছে শ্রদ্ধেয়। কিন্তু শুধু দর্শনশাস্ত্রই নয়, তাঁর কাজের ব্যাপ্তি ছিল আরও অনেকদিকে। তিনি কবিতাও লিখেছেন, গল্প লেখারও চেষ্টা করেছেন। সাম্প্রদায়িক শক্তি যেভাবে ধর্মের নামে মানুষের মধ্যে বিভাজনের চেষ্টা করছে, তার বিরুদ্ধে লড়াই করতে অধ্যাপক দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের লেখা আমাদের কাছে অন্যতম হাতিয়ার।





Current Affairs

Featured Posts

Advertisement