ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
এক মহাজীবনের আলোকবর্তিকা

  ৭ই ডিসেম্বর , ২০১৮

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর — এক মহাজীবনের আলোকবর্তিকা

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের দ্বিশততম জন্মবার্ষিকী আসন্ন। শিক্ষাবিদ, অসম সাহসী সমাজ সংস্কারক এই ব্যক্তিত্বের নীতি – আদর্শ এবং অবদান আজও স্মরণীয়। খুব সংক্ষেপে বিদ্যাসাগরের মহাজীবনের কয়েকটি কথা তুলে ধরা হয়েছে এই নিবন্ধে।

লীলা পুরকায়স্থ

প্রাতঃস্মরণীয় যে ব্যক্তিদের প্রতি আমরা প্রণতি জানাই, বিদ্যাসাগরের স্থান যে সেখানে স্ব-মহিমায় উচ্চে বিরাজিত এ সত্যকে অস্বীকার করার মতো ধৃষ্টতা বা সাহস কারো নেই। সমুদ্রের বিশালতা সম্বন্ধে কারো সংশয় থাকতে পারে না, তেমনই বিদ্যাসাগরের বহুবিধ গুণের মূল্যায়ন করা কঠিন এবং দুরূহ কাজ।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চারিত্রপূজায় বিদ্যাসাগরকে যেভাবে আখ্যায়িত করেছেন তা থেকে সম্পূর্ণ বিদ্যাসাগরকে খুঁজে নিতে আমাদের কোনও অসুবিধা হয় না। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘‘পল্লী আচারের নামে যে ক্ষুদ্রতা, বাঙালী জীবনের যে জড়ত্ব সবলে ভেদ করিয়া একমাত্র নিজের গতিবেগ প্রাবল্যে কঠিন প্রতিকূলতার বক্ষ বিদীর্ণ করিয়া — হিন্দুদের দিকে নহে, সাম্প্রদায়িকতার দিকে নহে — করুণার অশ্রুজলপূর্ণ উন্মুক্ত অপার মনু্ষ্যত্বের অভিমু‍‌খে আপনার দৃঢ়নিষ্ঠ একাগ্র একক জীবনকে প্রবাহিত করিয়া লইয়া গিয়াছিলেন আমি যদি অদ্য তাহার সেই গুণকীর্তন করিতে বিরত হই তবে আমার কর্তব্য একেবারেই অসম্পূর্ণ থাকিয়া যায়।’’ সেই অনন্য সুলভ মানবিকতার গুণই তাঁকে এমন মহান করে তুলেছে।

বিদ্যাসাগরের জীবনের যে দিকটা আমরা আলোচনা করতে যাব, সেখানেই দেখব এক অসম সাহসিকতার সঙ্গে মানবজীবনের সমস্যা সমাধানে অগ্রসর হবার পথে পর্বত-প্রমাণ বোঝাকে তিনি অনায়াসে অতিক্রম করেছিলেন।

বাংলা ভাষার উত্তরণ ও তা‍‌কে বোধগম্য করে তোলার যে প্রয়াস বিদ্যাসাগর গ্রহণ করেছিলেন, তাতে অবশ্যই তাঁকে বাংলা ভাষার জনক বলা যায়। বাংলা গদ্য সাহিত্যকে বাঙালির জীবনে প্রয়োগযোগ্য করার ল‍‌ক্ষ্যে সহজ-সরল অথচ শোভন সুন্দর প্রকাশ ভঙ্গিমায় এমন আকর্ষণীয় করে তুলেছিলেন যে তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাঁর কাছে ঋণ স্বীকার করবেই।

বাল্যকাল থেকেই অসম তেজস্বীতা তাঁকে অন্য বালকদের থেকে বৈশিষ্ট্য দিয়েছিল। তাঁর জন্মের সময় বিদ্যাসাগরকে ‘এঁড়ে বাছুর’ বলে পরিচয় দেওয়া হয়েছিল, পরবর্তী জীবনে সেই স্বাভাবিক একগুঁয়েমি তাঁকে তাঁর সিদ্ধান্ত থেকে বিচ্যুত করতে পারত না।

বিদ্যাসাগরের জীবনের সমস্ত ঘটনা প্রবাহ যদি অঙ্কন করা হয় তাহলে আর এক মহাভারত সৃষ্টি হবে। তাই সংক্ষিপ্ত আকারে বিদ্যাসাগরের সমসাময়িক ধারণাকে কেন্দ্র করেই আলোচনা করা যেতে পারে। মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর সান্নিধ্য লাভ করে ধন্য হয়েছিলেন বিদ্যাসাগরের মতো বন্ধু পেয়ে। বিদেশে বসবাসকালে যে দারিদ্র ও অর্থকষ্ট মধুসূদনকে নিঃশেষ করে দিয়েছিল, বিদ্যাসাগর পাশে না দাঁড়ালে সেই অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব ছিল না। তাঁর কর্মবহুল জীবনের বিস্তার যে কতদূর ছিল প্রচারবিমুখ মানুষ বিদ্যাসাগর তা কোনোদিন প্রকাশ করেননি। ছাত্রদের পাঠ্যপুস্তকের অভাব দূর করার জন্য তিনি বিভিন্ন বয়সের ছাত্রদের উপযোগী পাঠ্যপুস্তক রচনা করেন। কোনও বাঙালি ছাত্র বর্ণপরিচয়ের সঙ্গে প‍‌রিচিত না হয়ে উচ্চশিক্ষা লাভ করেছেন তা আমাদের জানা নেই। একদিকে বোধোদয়, কথামালা রচনা আর অন্যদিকে ‘শকুন্তলা’ গ্রন্থ রচনা — এ এক অসাধারণ কীর্তি। শিক্ষাকে সহজতর করার জন্য বিদ্যাসাগর উপক্রমণিকা ও ব্যাকরণ কৌমুদির ১ম, ২য় ও ৩য় ভাগ রচনা করেন।

রবীন্দ্রনাথ বিদ্যাসাগরের চরিত্র লিখতে গিয়ে বলেছেন, ‘দয়া নহে, বিদ্যা নহে বিদ্যাসাগরের চরিত্রের প্রধান গৌরব তাহার অজেয় পৌরুষ, তাহার অক্ষয় মনুষ্যত্ব (বিদ্যাসাগর চরিত)। বিদ্যাসাগর সম্বন্ধে লিখতে গিয়ে কোথায় আরম্ভ আর কোথায় শেষ তা পরিমাপ করা কঠিন।

কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত বিদ্যাসাগরকে ‘বীরসিংহের সিংহ শিশু’ বলে সম্বোধন করেছেন। তিনি যখন সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ, সেই সময় বিশেষ কাজে তিনি হিন্দু কলেজের অধ্যক্ষ কার সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে যান। সেখানে কার সাহেব টেবিলের ওপর পা রেখেই তাঁর সঙ্গে কথা বলেছিলেন। তার জবাবে বিদ্যাসাগর কার সাহেব তাঁর অফিসে দেখা করতে এলে অনুরূপ ব্যবহার করে তিনি ঐ ব্যবহারের সমুচিত জবাব দেন। বাঙালির পোশাক পরেই তিনি বাংলার ঐতিহ্য ও আভিজাত্যকে সম্মানের আসনে আসীন করেন। আরও কত যে এ ধরনের সাহসিকতার উদাহরণ রয়েছে সেসব বর্ণনা করা এ ক্ষুদ্র প্রবন্ধে সম্ভব নয়।

বিদ্যাসাগরের সাহিত্য সৃষ্টি আজও বিশ্ববন্দিত পণ্ডিতেরা স্মরণ করেন। তাঁর সাহিত্য সৃষ্টির যে অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল তা সংস্কৃত কাব্যের ভাবানুবাদ থেকেই জানা যায়। যেমন তিনি প্রাথমিক বিদ্যার্থীদের জন্য গ্রন্থ রচনা করেছেন, তেমনই তাঁর সংস্কৃত কাব্যের ভাবানুবাদ মুগ্ধ হবার মতো। শকুন্তলা, সীতার বনবাস, কুমার সম্ভব, নৈষধচরিত্র, গীতগোবিন্দ এবং আরও অনেক কাব্য গ্রন্থকে তিনি রসবোধে আপ্লুত করে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টির অধিকারী এ বিষয়ে কোনও দ্বিমত নেই। ইংরেজি ও হিন্দি সাহিত্যের রস আহরণ করে তিনি স্বকীয়তা অর্জন করেন। শেকসপিয়রের কামেডি অব এরর অবলম্বনে রচিত ভ্রান্তিবিলাস আজও ঘরে ঘরে সমাদৃত।

বিদ্যাসাগরের মাতৃভক্তির কথা সর্বজনবিদিত। মাতা ভগবতী দেবী তাঁর আরাধ্যা দেবতারূপে বিবেচিত। এ বিষয়ে এত কাহিনি প্রচলিত আছে যা বর্ণনা করা অসম্ভব।

বিদ্যাসাগরকে দয়ার সাগর কেন বলা হয় তার অজস্র উপাখ্যান আছে। একটি মাত্র উদাহরণই এখানে উল্লেখ করব যা মাইকেল মধুসূদন দত্ত জীবন দিয়ে অনুভব করেছেন। তিনি লিখেছেন :

‘বিদ্যার সাগর তুমি বিখ্যাত ভারতে

করুণার সিন্ধু তুমি, সেই জানে মনে,

দীন যে দীনের বন্ধু! উজ্জ্বল জগতে

হেমাদ্রির হেম ক্লান্তি অম্লানকিরণে’’

মধুসূদনের বিদেশ বাসের সমস্যার কথা আগেই উল্লেখ করেছি। অজস্র মানুষ তাঁর দ্বারা উপকৃত কিন্তু সবাই তার স্বীকৃতি দেয়নি। এ জন্য তাঁর মনে কোনও ক্ষোভ ছিল না।

এমন এক ক্ষণজন্মা মানুষকে আমরা সেভাবে অধ্যয়ন করতে পারিনি। এমন এক দৃঢ়চেতা কোনও অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করার দৃষ্টান্ত স্মরণ করলে আমাদের মানসিক দৃঢ়তা বাড়বে এব্যাপারে সন্দেহ নেই।

সমাজ সংস্কার করতে গিয়ে কত যে লাঞ্ছনা তাঁকে ভোগ করতে হয়েছিল তার সীমা পরিসীমা নেই। নারী শিক্ষার প্রচলন সে যুগে ক্ষমাহীন অপরাধ ছিল। বিদ্যাসাগর তাতে ভ্রূক্ষেপ না করে মেয়েদের জন্য বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। বাল্যবিবাহ রদ করা তাঁর অন্যতম মহান কীর্তি। বর্তমান সময়েও বাল্যবিবাহ সম্পন্ন করার জন্য কিছু মানুষ আগ্রহী, সুখের বিষয় মেয়েরা এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে শিখেছে। তাঁর নারীজাতির জন্য অনেক বড় অবদান বিধবা বিবাহ প্রচলন। বালিকা কন্যাকে বৃদ্ধের সঙ্গে বিবাহ দিয়ে কৌলিন্য প্রদর্শন সে যুগে প্রচলিত ছিল। এই কাজ করার জন্য বিদ্যাসাগরকে যে কত শারীরিক, মানসিক অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছিল তা মর্মান্তিক। কিন্তু কোনও বাধাই বিদ্যাসাগরকে নিজের সিদ্ধান্ত থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। এজন্য আজকের সমাজ তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ।

মানুষ যদি মেরুদণ্ড সোজা করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় তবেই বিদ্যাসাগরের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন যথার্থ হবে।