মিছিলে না যেতে তৃণমূলের হুমকি,
জবাবে ডোমকল তুলল লাল ঢেউ

নিজস্ব সংবাদদাতা   ৭ই ডিসেম্বর , ২০১৮

ডোমকল, ৬ ডিসেম্বর— তৃণমূলের সন্ত্রাসের জবাব এল লাল ঝান্ডা হাতে জনপ্লাবনে। ডোমকলের গ্রামে গ্রামে তৃণমূল মঙ্গলবার সিপিআই(এম)’র মিছিলের প্রচার আটকে দিয়েছিল দুষ্কৃতীদের দিয়ে। কিন্তু বৃহস্পতিবার সেই সব গ্রাম থেকেও দলে দলে মানুষ এলেন ডোমকলের মিছিলে। মিছিল শেষে সমাবেশে সিপিআই(এম)’র পলিট ব্যুরোর সদস্য মহম্মদ সেলিম বললেন, গণতন্ত্র ধংস করে সাম্প্রদায়িক শক্তিকেই এ রাজ্যে সুবিধা করে দিচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস। তৃণমূল আর বিজেপি, উভয়ের বিরুদ্ধেই লড়াই করছে লাল ঝান্ডা।

বৃহস্পতিবার দুপুরে গড়াইমারির শ্রীকৃষ্ণপুর থেকে লাল পতাকা নিয়ে মিছিল করে ডোমকলে পা রাখলেন লিয়াতক মণ্ডল, লালচাঁদ বিশ্বাসরা। মঙ্গলবার তাঁদের গ্রামে মিছিলের প্রচার আটকে দিয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেসের দুষ্কৃতীরা। হুমকি দিয়েছিল, যাওয়া যাবে না মিছিলে। সেই হুমকি উড়িয়ে এদিন ডোমকলে এসেছেন তাঁরা। এর পর বেলা বাড়তেই ডোমকলের জনকল্যাণ মাঠে ভিড় জমান সাহাদিয়ার, জোতকমল, গরিবপুর প্রভৃতি এলাকার মানুষ। সেখান থেকেই শুরু হয় মহামিছিল। ‘তৃণমূল হটাও ডোমকল বাঁচাও’, ‘সাম্প্রদায়িক শক্তিকে পরাস্ত করুন’, স্লোগান তুলে মিছিল ডোমকল বাজারের ভিতর দিয়ে এগিয়ে যায় পুরানো বিডিও অফিসের মোড়ের দিকে। ২০১৭ সালের পৌরসভা নির্বাচন থেকে পঞ্চায়েত নির্বাচন, শাসক দলের বাহিনীর রক্তাক্ত সন্ত্রাসে এখানে গণতন্ত্রকে হরণ করা হয়েছে। বোমাবাজি থেকে শুরু করে বামপন্থী নেতা-কর্মীদের নামে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ সবের জবাব দিতেই এদিন মিছিল-সমাবেশে শামিল হলেন হাজার হাজার মানুষ।

পরে পুরানো বিডিও অফিস মোড়ে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন মহম্মদ সেলিম, সিপিআই(এম)’র মুর্শিদাবাদ জেলা কমিটির সম্পাদক মৃগাঙ্ক ভট্টাচার্য, ডোমকলের বিধায়ক আনিসুর রহমান, মুর্শিদাবাদ লোকসভা কেন্দ্রের সাংসদ বদরুদ্দোজা খান, সিপিআই(এম) নেতা নারায়ণ দাস। সভা পরিচালনা করেন পার্টির নেতা মোস্তাফিজুর রহমান। উপস্থিত ছিলেন পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নৃপেন চৌধুরিও।

এ দিন জনসভায় মহম্মদ সেলিম প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন, যখন বিজেপি বাবরি মসজিদ ধ্বংস করছিল, তখন কোথায় ছিলেন আজকের মুখ্যমন্ত্রী? বাবরি মসজিদ ভাঙা থেকে গুজরাট গণহত্যা, কখনও প্রতিবাদ করে একটি কথাও বলেননি মমতা ব্যানার্জি। এখন মানুষকে বোকা বানতে বিজেপি-বিরোধিতার মুখোশ পড়েছেন তিনি। মানুষের ঐক্য ও সম্প্রীতি এবং অধিকার রক্ষার জন্য লড়াই করে একমাত্র লাল ঝান্ডাই। তৃণমুল কংগ্রেস আর বিজেপি’র লড়াই মানুষের বিরুদ্ধে, মানুষ মারার লড়াই।

তিনি বলেন, কৃষককে ফসলের দাম, খেতমজুরকে মজুরি, বেকারকে কাজ দিতে ব্যর্থ কেন্দ্র এবং রাজ্যের দুই সরকারই। তারা কেবল ধাপ্পাবাজির প্রতিযোগিতা করছে। তাই রাস্তায় নেমেছেন কৃষক-খেতমজুররা।

সেলিম বলেন, গান্ধীহত্যার পরে বাবরি মসজিদ ধংসের ঘটনা ভারতে হিন্দুত্ববাদীদের জঘন্যতম অপরাধ। এ রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের কল্যাণে সেই বিজেপি নিজেদের ক্ষমতা বাড়াচ্ছে। প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতায় লিপ্ত তৃণমূল এবং বিজেপি রাজ্যে মানুষের মধ্যে ধর্মের নামে মেরুকরণ ঘটাচ্ছে। বাবরি মসজিদ ভাঙার পর দেশকে হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করতে চেষ্টা করছে আরএসএস। মমতা ব্যানার্জি তাঁদের প্রশংসা করেছিলেন। একমাত্র বামপন্থীরাই ধারাবাহিকভাবে সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করছেন। আজও সাম্প্রদায়িক শক্তিকে রুখতে নিজেদের দায়িত্ব পালন করছেন বামপন্থীরা। মুখ্যমন্ত্রী যতই চেষ্টা করুন, খুন-সন্ত্রাস চালিয়ে ও মিথ্যা মামলা দিয়ে হারানো যাবে না বামপন্থীদের।

এদিন সমাবেশে মৃগাঙ্ক ভট্টাচার্য বলেন, গণতন্ত্র লুট করে সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করে জনগণের অর্থ লুট করছে তৃণমূল। এখন নিজেদের মধ্যে সেই লুটের অর্থের ভাগ নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে। লুটেরাদের পরাস্ত করতে ঐক্যবদ্ধ লড়াই-সংগ্রাম গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।

সন্ত্রাসকে জয় করার পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার বার্তা দিল এ দিনের মিছিল, গরিবের ঐক্য আরও মজবুত করার আহ্বান ছড়িয়ে দিল। সভা চলাকালীনও বিভিন্ন গ্রাম থেকে এসে সমাবেশে যোগ দিতে থাকে একের পর এক মিছিল। ২০১৭ সালের সন্ত্রাসের পৌর নির্বাচনের পর ডোমকলে ক্ষমতা দখল করলেও তৃণমূল পৌর পরিষেবার উন্নয়নে কোনও কাজ করেনি। তাদের লাগানো বাতিস্তম্ভ নিয়ে তৃণমূলের কাউন্সিলরদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছেন শাসক দলের নেতারাও। শিয়ালমাড়ির রাস্তা ও পার্ক সংস্কার নিয়েও সরকারি টাকা নয়ছয়ের অভিযোগ উঠেছে। এ সবের প্রতিবাদে এ দিন সমাবেশে হাজির হয়েছিলেন পৌরসভা এলাকার মানুষও। লাল ঝান্ডার মহামিছিল আর বিরাট সমাবেশ দেখে উচ্ছ্বসিত ছিলেন ডোমকলের সাধারণ মানুষও। বাজারের দোকানের বারান্দা ও বাড়ির ছাদে ভিড় করেও সভায় পার্টির নেতাদের বক্তব্য শোনেন ডোমকলের বহু মানুষ।