সম্প্রীতি রক্ষায় হাঁটলেন
সব ধর্মের মানুষ

নিজস্ব সংবাদদাতা   ৭ই ডিসেম্বর , ২০১৮

দুর্গাপুর, ৬ ডিসেম্বর — বৃহস্পতিবার আসানসোল-দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চল জুড়ে সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী মিছিলে পা মেলালেন পনের হাজারেরও বেশি মানুষ। সব মিলিয়ে জেলায় ৬০ কিলোমিটার পথ পরিক্রমা করলো দাঙ্গা বিরোধী মিছিল। আসানসোলে দাঙ্গা বিধ্বস্ত রেলপার অঞ্চলে মানুষ আওয়াজ তুললেন, ‘ফিরকা পরস্ত তাকত কো দরকিনার করো।’ ‘ধর্ম নিরপেক্ষতা পে প্রহার হাম বরদাস্ত নেহি করেংগে।’ এই এলাকাতেই নুরানি মসজিদের ইমাম মওলানা ইমদাদুল রশিদির মাধ্যমিক দেওয়া ছেলে শিবগাহতুল্লাকে দাঙ্গাবাজরা খুন করেছিল। রামনবমীর মিছিলকে কেন্দ্র করে গেরুয়া বাহিনী সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়িয়েছিল। তাজা ছেলেকে মাটি দিতে গিয়ে খুদবার সময় ইমাম বলেছিলেন, আসানসোলের শান্তি-শৃঙ্খলার প্রয়োজন। আর কোথাও যেন গন্ডগোল না ছড়ায়। তারপর থেকে সতর্ক রয়েছে আসানসোল। এদিন রেলপার দাঙ্গা বিধ্বস্ত এলাকায় লাল পতাকার মিছিল থেকে সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে আরও সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হলো। আসানসোলে অপর মিছিলটির সূচনা হয় গীর্জামোড় থেকে। মিছিল শেষে বক্তব্য রাখেন বংশগোপাল চৌধুরি।

জামুড়িয়াতে বিশাল মিছিল হয়। শ্রীপুর বাজারে মিছিল শেষে বক্তব্য রাখেন বংশগোপাল চৌধুরি, নোয়ান আখতার খান। অণ্ডাল মোড় থেকে উখড়া শ্যামসুন্দরপুর কোলিয়ারি পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার মিছিলের নেতৃত্ব দেন পার্টিনেতা গৌরাঙ্গ চ্যাটার্জি, বিধায়ক রুনু দত্ত প্রমুখ। লাউদোহাতেও এদিন সাড়া জাগানো মিছিল হয়েছে। নাকরাকোঁদা মাঝিপাড়া থেকে ঝাঁঝরা কলোনি পর্যন্ত মিছিল হয়।

দুর্গাপুরে তিন জায়গায় মহামিছিল হয়। ইস্পাতনগরীতে মিছিলে সিপিআই(এম) সহ বিভিন্ন বামপন্থী দল, গণসংগঠন, সাংস্কৃতিক সংগঠন, মানবাধিকার সংগঠন ও বিভিন্ন ক্লাব যোগ দেয়। বিধায়ক সন্তোষ দেবরায় সহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ নেতৃত্ব দেন। এদিন ইস্পাত নগরীতে যুব সংগঠনের উদ্যোগে রক্তদান শিবিরে ৩০ জন রক্ত দেন।

দুর্গাপুর সিটিসেন্টার থেকে বেনাচিতি ক্ষুদিরাম বসুর মূর্তি পর্যন্ত মিছিল হয়। কাঁকসার মিছিল শুরু হয় কাঁকসা হাতলা থেকে। বার্নপুর, সালানপুর, পাণ্ডবেশ্বরে মিছিল হয়েছে। কুলটিতে হয় মানববন্ধন। বারাবনীতে হয় পথসভা।

দেশের সংবিধান ও ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষায় সর্বস্তরের মানুষকে এগিয়ে আসার বার্তা দিয়ে বৃহস্পতিবার পূর্ব বর্ধমান জেলার সর্বত্র সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পদযাত্রা, সম্প্রীতি দৌড়, মশাল মিছিল হয়েছে। এদিন বর্ধমান শহরে সর্বস্তরের মানুষকে নিয়ে সম্প্রীতির মিছিল ছিল নজরকাড়া। মিছিলে ছিলেন বর্ধমানের শিল্পী, সাহিত্যিক, কবি, অধ্যাপক, শিক্ষক, আইনজীবী, চিকিৎসক, চিত্রশিল্পী, শিক্ষাকর্মী সহ ছাত্র,যুব, মহিলা ও শ্রমজীবী মানুষের ঢল। রাজবাড়ি এলাকা থেকে মিছিল শুরু হয়ে বর্ধমানের কার্জনগেটের সামনে শেষ হয়। সেখানে গানে, কবিতায়, আলোচনার মাধ্যমে সম্প্রীতির বার্তা দিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা। গান গেয়েছেন বিশিষ্ট শিল্পীরা। এই সভাতেই সাম্প্রদায়িকতার বিপদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষায় মানুষের ঐক্যের উপর গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করেছেন অধ্যাপক অরূপ চট্টোপাধ্যায়, সিরাজুল ইসলাম, অংশুমান কর প্রমুখ। সভাস্থলের সামনে বর্ধমান শহরের বিশিষ্ট চিত্রশিল্পীরা ছবি এঁকেছেন। এদিন বর্ধমান শহরের সম্প্রীতির মিছিল মানুষের মনে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। রাস্তার দু’ধারে পথচলতি মানুষ শুধু নয়, ব্যবসাদার, হকার সহ বহু মানুষ মিছিলের প্রতি সংহতি জানিয়েছেন। ভাতারে ছাত্র-যুবদের উদ্যোগে সকালে ৬কিলোমিটার সম্প্রীতি দৌড় হয়। বিকালে ভাতার বাজার এলাকায় মশাল মিছিলে ছিলেন বামফ্রন্ট নেতৃবৃন্দ। শক্তিগড়ে মানববন্ধন ও মিছিল হয়েছে। গুসকরাতে এদিন সম্প্রীতির মিছিল শহর পরিক্রমা করে। এছাড়াও মেমারি, জামালপুর, কালনা, কাটোয়া, পূর্বস্থলী, মঙ্গলকোট, কেতুগ্রাম, গলসী, রায়না, খণ্ডঘোষ, মন্তেশ্বরেও নানা কর্মসূচি হয়।

এদিন বামপন্থী বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের ডাকে বাঁকুড়া জেলার বেশিরভাগ ব্লক, শহর এলাকায় সম্প্রীতির মিছিল, সভা হয়। বাঁকুড়া শহর, বিষ্ণুপুর, কোতুলপুর, বড়জোড়া, সোনামুখী, রাইপুর, গঙ্গাজলঘাটি, শালতোড়া, তালডাংরা, সিমলাপাল, ওন্দা, সারেঙ্গা সহ বিভিন্ন জায়গায় এই মিছিল হয়। ইন্দাসে পুলিশ সম্প্রীতি মিছিলের অনুমতি না দেওয়া সত্ত্বেও মিছিল হয়। মিছিলে বামফ্রন্ট ও বামপন্থী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মী, নেতৃবৃন্দ ছাড়াও বামপন্থী ও প্রগতিশীল মনোভাবাপন্ন বহু মানুষ পা মেলান। বাঁকুড়া শহরে মুটিয়া, বিড়ি, পৌর, বাসশ্রমিকরা মিছিলে হাঁটেন। তালডাংরায় মিছিলের শেষে পথসভায় বক্তব্য রাখেন সিপিআই(এম) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য অমিয় পাত্র, বাঁকুড়ার সভায় বলেন বামফ্রন্টের জেলা আহ্বায়ক অজিত পতি সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।

মিছিল পথসভার মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক বিরোধী দিবস পালিত হয় বীরভূম জেলা জুড়ে। এদিন পার্টির সিউড়ি শহর এরিয়া কমিটির উদ্যোগে মিছিল শহর পরিক্রমা করে। মিছিলের সূচনা করেন ব্রজ মুখার্জি। পরে পথসভা হয়। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে এদিন বোলপুরে বামফ্রন্টের মিছিলে যোগ দেন শহরের সর্বস্তরের ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ। রামপুরহাট শহরে এই কালা দিবসে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে মানুষ পথে নামেন। পথসভায় বক্তব্য রাখেন বামফ্রন্ট নেতৃবৃন্দ। নেতৃবৃন্দ বলেন, বি জে পি আবার নতুন করে অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণের লক্ষে দেশব্যাপী রথ চালাবে। এতে বিঘ্নিত হবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। এর বিরুদ্ধে আগামী ১০ই ডিসেম্বর বামফ্রন্টের ডাকে সম্প্রীতির মহামিছিল হবে তারাপীঠ থেকে রামপুরহাট। এছাড়াও সম্প্রীতি মিছিল হয়েছে নলহাটি, মাড়গ্রাম, মল্লারপুর, ইলামবাজার, দুবরাজপুর সহ জেলার বিভিন্ন স্থানে।

এদিন বহরমপুরে সম্প্রীতি মিছিল করে বামফ্রন্ট। লাল পতাকা আর গলায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলামের গান, খেটে খাওয়া মানুষের গণসঙ্গীত নিয়েই এদিন পথ হাঁটে সম্প্রীতি মিছিল। ঘাটবন্দর থেকে শুরু হওয়া মিছিল শহর পরিক্রম করে নিমতলা মোড়ে শেষ হয়। এদিন সারদিন মিছিল, পথসভার মাধ্যমে জেলার সর্বত্র সাম্প্রদায়িক শক্তিকে পরাস্ত করে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান বামপন্থীরা।

সম্প্রীতির আহ্বান জানিয়ে এদিন পথে নামে সারা পুরুলিয়া। বান্দোয়ান, মানবাজার, পাড়ায় সব ধর্মের মানুষকে নিয়ে মিছিল করে সিপিআই(এম)। পা মেলান পার্টির জেলা সম্পাদক প্রদীপ রায়। বান্দোয়ানে মিছিল শেষে পথসভা হয়। পুরুলিয়া শহরেও মিছিল হয়। গণতান্ত্রিক লেখক শিল্পী সঙ্ঘ, এবিটিএ এবং এবিপিটিএ-র উদ্যোগে শহরের ট্যাক্সিস্ট্যান্ডে সংহতি দিবস পালন করা হয়।