ট্রেড লাইসেন্সে নিতে আর লাগবে না
দমকলের ছাড়পত্র, সিদ্ধান্ত মেয়রের

নিজস্ব প্রতিনিধি   ৭ই ডিসেম্বর , ২০১৮

কলকাতা, ৬ ডিসেম্বর— ট্রেড লাইসেন্সে লাগবে না দমকলের ছাড়পত্র। জানালেন মেয়র ফিরহাদ হাকিম।

মহানগরে বাগরি মার্কেটের মতো ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটার ক্ষেত্রে রক্ষাকবচ কার্যত তুলে নেওয়া হলো এই সিদ্ধান্তের জেরে। এদিন মেয়র ফিরহাদ হাকিম বলেন, ট্রেড লাইসেন্স দেব কী দেব না সেটা কর্পোরেশনের উপর নির্ভর করছে। যাঁকে ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে তাঁর ব্যবসার বাস্তবতা আছে কী না, চোর নাকি চিট ফান্ড চালান, সেগুলো কলকাতা কর্পোরেশনের লাইসেন্স বিভাগের আধিকারিকরা খতিয়ে দেখে দেবেন। ফায়ার লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে এর কোনও যোগ নেই। ওদের নিজস্ব নিয়ম আছে, সেটা মেনেই তারা ছাড়পত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেবে।

স্টিফেন কোর্টের অগ্নিকাণ্ডের পরে রাজ্য সরকার একটি কমিটি গঠন করেছিল। তাতে রাজ্য সরকারের প্রতিনিধিরা ছাড়াও কলকাতা পুলিশ, দমকল, সি ই এস সি এবং পৌর প্রশাসনের একাধিক আধিকারিক আছেন। এই কমিটি শহরে ৪৩টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করেছিল। প্রতিষ্ঠানগুলিতে প্রায় ৩৫হাজারের বেশি ব্যবসায়ী আছেন। সেই সমস্ত মার্কেটগুলির অগ্নি সুরক্ষা একেবারে না থাকায় সেগুলির ফায়ার লাইসেন্স এবং ট্রেড লাইসেন্স পুনর্নবীকরণ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে চলতি বছর ৩১ জুলাই কলকাতা পৌরসভায় একটি বৈঠক করেছিলেন সেই সময়ের মেয়র শোভন চ্যাটার্জি। সেখানে উপস্থিত ছিল কলকাতা কর্পোরেশন, কলকাতা পুলিশ, দমকল ও বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন। সেখানেই সিদ্ধান্ত হয় পৌরবাজার ও একাধিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে বিক্রেতাদের ট্রেড লাইসেন্স পুনর্নবীকরণ করা নিয়ে। তার ৪৭দিনের মাথাতেই ‘ছাড়পত্র’ মেলা বাগরি মার্কেটের ছ’তলার একটি ভবন আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। অগ্নি নির্বাপনের উপযুক্ত পরিকাঠামো করা হয়েছে কী না তা যাচাই না করেই ছাড়পত্র দেওয়া নিয়ে সেদিনই প্রশ্ন উঠেছিল। সিদ্ধান্তের মাথায় ছিলেন সদ্য পদত্যাগী কলকাতার মেয়র ও দমকল মন্ত্রী শোভন চ্যাটার্জি। তাঁর হাতেই ট্রেড লাইসেন্স বিভাগ ছিল।

মেয়র বদল হলেও উদ্দেশ্যের হেরফের হয়নি বর্তমান মেয়রেরও। বর্তমান মেয়রই অবশ্য দমকল দপ্তরের কাজ দেখভাল করছেন এখন। মানুষের জীবনের সুরক্ষার নয়, কলকাতা কর্পোরেশনের লক্ষ্য এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে লাইসেন্স খাতে বিপুল টাকা আয়।

কর্পোরেশন সূত্রে খবর, বিগত দু’বছর ধরে ৪২টি মার্কেটের ব্যবসায়ীদের ট্রেড লাইসেন্স পুনর্নবীকরণ করা হয়নি। এর মধ্যে ৫টি মার্কেটে অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা তৈরি হওয়াতে ট্রেড লাইসেন্সের পুনর্নবীকরণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল। বাকি ৩৫টি মার্কেটের ব্যবসায়ীদের ট্রেড লাইসেন্স পুনর্নবীকরণ করার সিদ্ধান্ত সেদিনই বৈঠকেই নেওয়া হয়েছিল। সেই সময় মেয়র থাকাকালীন শোভন চ্যাটার্জি নিজেই জানিয়েছিলেন, ৩৭টির মধ্যে ৩৫টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান যাতে ট্রেড লাইসেন্স পুনর্নবীকরণ করতে পারে তার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আর্মেনিয়ান স্ট্রিট ও স্ট্র্যান্ড রোডের দুটি প্রতিষ্ঠানে লোক পাঠিয়েও কোনও খোঁজ মেলেনি। সেটি পুনর্নবীকরণ স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলেই প্রশ্ন উঠেছিল, উপযুক্ত অগ্নি নির্বাপণ পরিকাঠামো হয়েছে কী না সেদিকে খোঁজ না নিয়েই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া মানে ফের বড় অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্ঘটনার দিকেই ঠেলে দেওয়া হবে।

বিরোধী কাউন্সিলররা অভিযোগ করেছিল অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা খতিয়ে না দেখে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পিছনে রয়েছে ট্রেড লাইসেন্স খাতে আয় কমে যাওয়া। সেই টাকা তোলার জন্যই অগ্নি নির্বাপণের বিষয়কে লঘু করা হয়েছে। তবে বাগরির ঘটনার পড়ে চাপের মুখে ফের দমকলের ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কর্পোরেশন। আবার সেই সিদ্ধান্তের বদল করলেন বর্তমান মেয়র ফিরহাদ হাকিম। আর্থিক বাজেট পেশ করতে আর হাতে মাস তিনেক। কয়েক কোটি টাকা লাইসেন্স খাতে বকেয়া পড়ে বলেই খবর কর্পোরেশন সূত্রে। ফলে মেয়রের হাতে থাকা লাইসেন্স বিভাগের এমন বেহাল অবস্থা নিয়ে বিরোধীদের ক্ষোভের মুখে পড়ার সম্ভাবনা আছে। তাই কি মানুষের জীবনের সুরক্ষা ভুলে এমন সিদ্ধান্ত?