কলকাতায় মেয়র নির্বাচন
সংবিধান ও ইতিহাসের
পাতা থেকে কিছু কথা

অশোক ভট্টাচার্য   ১১ই ডিসেম্বর , ২০১৮

স্থানীয় স্বায়ত্ত্বশাসন ব্যবস্থাকে গণতান্ত্রিকভাবে কার্যকরী করায় পশ্চিমবঙ্গ দেশের মধ্যে অগ্রণী রাজ্য বলে স্বীকৃত। কিন্তু এখন এই রাজ্যের সরকার কি সংবিধান মান্য করে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করছে? যেভাবে কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র পদে নির্বাচিত সদস্যদের বাইরে থেকে একজনকে এনে বসানো হয়েছে তা কি সংবিধানসম্মত? সংবিধান এবং ঐতিহ্য দুটোকেই রাজ্য সরকার লঙ্ঘন করছে বলে দেখানো হয়েছে এই নিবন্ধে।

কলকাতায় নতুন মেয়র হিসাবে দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন রাজ্যের নগরোন্নয়ন ও পৌর বিষয়ক দপ্তরের মন্ত্রী মহোদয়। মেয়রের দায়িত্ব নিয়েই তিনি কলকাতার মেয়রের পদের গরিমার বিষয়ে কিছু কথা বলেছেন। একথা সকলেরই জানা কলকাতার মেয়রের আসনটির সাথে অনেক গরিমা যুক্ত। যুক্ত অনেক ইতিহাসও।

বিষয় এটা নয় কলকাতার মেয়র কে হবেন? পৌর কর্পোরেশন নির্বাচনে যে দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকবে অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ কাউন্সিলর যে দলের হাতে থাকবে, সেই দলই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেবে কাকে তাঁরা মেয়র পদের জন্যে মনোনীত করবেন। তবে তিনি যিনিই হোন না কেন, তাকে হতে হবে ১৪৪টি ওয়ার্ডের কোনও একটি ওয়ার্ড থেকে নির্বাচিত। কোনও একজন মেয়র পদত্যাগ করতেই পারেন। পদত্যাগ পত্র দাখিল, গ্রহণ ও তাকে কার্যকর করার বিষয়েও কিছু কথা আইনে উল্লেখ রয়েছে। এসব নিয়ে আমাদের কোনও মাথাব্যথা নেই। তবে কে মেয়র হচ্ছেন বা যিনি মেয়রের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি কলকাতার মেয়র পদের অতীত বা ঐতিহাসিক গরিমার সাথে সাযুজ্যপূর্ণ কিনা এসব নিয়ে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে অনেক প্রশ্ন থাকতেই পারে। যে প্রশ্ন কলকাতার সদ্য পদত্যাগ করা একজন মেয়রকে নিয়ে রাজ্যের মানুষের মধ্যে অবশ্যই উঠেছে। এসব বিষয় শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক দলের নিজস্ব বিষয় হতে পারে না। যেমন গত কয়েক মাস আগে চন্দননগর পৌর কর্পোরেশনের নির্বাচিত মেয়র পদত্যাগ করলেন। পদত্যাগ করলেন, না পদত্যাগ করানো হলো, সেটা বড় প্রশ্ন নয়। মেয়র পদত্যাগ করলেন, তার স্থানে আইন অনুযায়ী ডেপুটি মেয়রেরই দায়িত্বভার গ্রহণ করার কথা, যতক্ষণ না নতুন মেয়র নির্বাচিত হচ্ছেন। আইনের সংস্থান এমনই। কিন্তু রাজ্য সরকার কি করল? চন্দননগর পৌর কর্পোরেশনের নির্বাচিত বোর্ডকে ভেঙে দিল, যখন ঐ বোর্ডের মেয়াদকাল ছিল আরও দুবছরের। আইন অনুযায়ী পদত্যাগী মেয়রের স্থলে একজন নতুন মেয়রের নির্বাচিত হওয়ার কথা। ঐ পুরো বোর্ডটি ভেঙে দেবার আগে ঐ বোর্ডকে কাজ করতে অসমর্থ (Incompetent) বলে কারণ দর্শাবার সুযোগ দেবার কথা। এক্ষেত্রে তা কিন্তু হয়নি। ইতিমধ্যে সেই নির্বাচিত বোর্ড ভেঙে দিয়ে তার স্থলে রাজ্য সরকার বসিয়েছে প্রশাসক। বিষয়টি কিন্তু আর সংখ্যাগরিষ্ঠ বা শাসকদলের রাজনৈতিক বিষয় হয়ে থাকল না। এই বিষয়টি চন্দননগরের যে কোনও সাধারণ নাগরিকের বিষয়। রাজ্যের যে কোনও গণতন্ত্রে বিশ্বাসী মানুষের উদ্বেগেরও বিষয়। কারণ নির্বাচিত একটি পৌরবোর্ড সেই শহরের নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার।

পৌরসভা বা পঞ্চায়েত অবশ্যই রাজ্যের বিষয়। কিন্তু ৭৩ ও ৭৪তম সংবিধান সংশোধনী অনুযায়ী এক্ষেত্রে রয়েছে কিছু সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। সংবিধানের নয়ের এ (IXA) অংশে ২৪৩নং ধারার অনেকগুলি সংশোধনী হয়েছে। ২৪৩ এর কিউ ধারাতে পৌরসভাকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। ২৪৩ আর, ধারায় পৌরসভা গঠন পদ্ধতি কী হবে তার উল্লেখ রয়েছে, আবার ২৪৩টি ধারায় আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে, ২৪৩ইউ ধারায় বলা হয়েছে যে কোনও নির্বাচিত পৌরবোর্ডের মেয়াদকাল ৫বছর হবে, এর বেশি নয় (No longer) এর একটি উপধারায় বলা হয়েছে যে কোনও পৌরসভার নির্বাচন তার ৫বছর মেয়াদ শেষের আগে ছয় মাসের মধ্যেই করতে হবে। সংবিধানে আরও লেখা আছে যে, কোনও পৌরসভা বা পঞ্চায়েতের নির্বাচন পরিচালিত হবে রাজ্য নির্বাচন কমিশন দ্বারা। এছাড়াও ৭৪তম সংবিধান সংশোধনীতে রয়েছে রাজ্য অর্থ কমিশন, জেলা বা মেট্রোপলিটান প্ল্যানিং কমিটি গঠন, পৌরসভাগুলির ক্ষমতা, অধিকার, কর্তৃত্ব ইত্যাদি বিষয়ে অনেকগুলি ধারা। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পৌরসভাগুলি কী কী ধরনের কাজ করার অধিকারী, সংবিধানের দ্বাদশ তফসিলে তার একটি নতুন তালিকাও যুক্ত করা হয়েছে এই সংবিধান সংশোধনীর পর।

একটি পৌরসভাকে একটি স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার দায়িত্ব যেমন রাজ্য সরকারের আছে তেমনি আছে কেন্দ্রীয় সরকারেরও (To enable them to function as institution of self Gove

ment...), সংবিধানের ২৮০ধারা অনুযায়ী ৫বছর পর পর জাতীয় অর্থ কমিশন গঠন বাধ্যতামূলক। ৭৪তম সংবিধান সংশোধনীর পর এই ধারাও সংশোধিত হয়ে কেন্দ্রীয় রাজস্বের অংশ পৌরসভা ও পঞ্চায়েতেরও পাওয়ার অধিকারের কথা যুক্ত করা হয়েছে।

৭৪তম সংবিধান সংশোধনী যা কার্যকরী হয়েছিল ১৯৯৩ সালের জুন মাসে। চলতি বছরে তার ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে। সাথে সাথে দে‍‌শের প্রতিটি রাজ্যের পৌর ও পঞ্চায়েত আইনও সংশোধিত হয়েছিল। কিন্তু তা করা হলো সংবিধানের কাঠামোর মধ্যেই। যদিও পঞ্চায়েত ও পৌরসভা রাজ্যের বিষয়। তা সত্ত্বেও এই আইন সংশোধনের ক্ষেত্রে যদি সংবিধানের কোনও অংশের সাথে সম্পর্কিত হয়, তবে তার জন্যে মাননীয় রাষ্ট্রপতির সম্মতি আবশ্যক।

এই দুই সংবিধান সং‍‌শোধনীর মর্মকথা হলো এই দুই স্থানীয় সরকারকে সংবিধান স্বীকৃত স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা। একে আরও গণতান্ত্রিক, বিকেন্দ্রীকৃত ও ক্ষমতাশালী করা। এই কাজে তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকার বা কেরালা ও ত্রিপুরার বামফ্রন্ট সরকার পালন করেছিল এক অগ্রণী ভূমিকা। যে কোনও সংবিধান বিশেষজ্ঞ এই সত্যতার স্বীকৃতি আজও দিয়ে থাকেন।

এই দুই সংবিধান সংশোধনীর কার্যকারিতার ক্ষেত্রে কিছু ব্যতিক্রমও আছে। যেমন কিছু কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল, ষষ্ঠ তফসিলে অন্তর্ভুক্ত অঞ্চল বা দার্জিলিঙ গোর্খা পার্বত্য পরিষদ অঞ্চল। কিন্তু সংবিধানের এই দুই সংশোধনীর কোনও অংশ পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় এমন কথা কোথাও বলা নেই!

উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করা যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের পক্ষ থেকে এই ৭বছরে পৌরসভা বা পঞ্চায়েতের ক্ষেত্রে বেপরোয়াভাবে একের পর এক সংবিধান ও আইন বিরোধী বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। সংবিধানের বহু ধারাকে অবজ্ঞা করা হচ্ছে, বহু প্রতিষ্ঠানকে গুরুত্বহীন করে দেওয়া হচ্ছে। রাজ্য নির্বাচন কমিশনকে একটি সরকারি বা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছে। জেলা বা মেট্রোপলিটান প্ল্যানিং কমিটিগুলি অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে। ২০১৩ সালেই তৃতীয় রাজ্য অর্থ কমিশনের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও আজও ৪র্থ রাজ্য অর্থ কমিশনের সুপারিশ কার্যকর করা হয়নি। গত কয়েক বছরে পশ্চিমবঙ্গের ৪টি পৌর বা পৌর কর্পোরেশন আইন একাধিকবার সংশোধন করে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত পৌর বোর্ড বা মেয়র পরিষদের ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে তা প্রদান করা হয়েছে প্রশাসক বা আমলাতন্ত্রকে। এমনকি বিভিন্ন পৌর কর্পোরেশন আইনে পৌর কমিশনার, সচিব বা অন্যান্য আধিকারিক নিযুক্তির পূর্বে মেয়র পরিষদের সাথে পরামর্শ করার বাধ্যতামূলক ব্যবস্থাও তুলে দিয়ে তা দিয়ে দেওয়া হয়েছে রাজ্য সরকারের হাতে। ৫বছরের মধ্যে নির্বাচন না করে দীর্ঘকাল প্রশাসক বসাবার সংশোধন করা হয়েছে পৌর আইনে। অথচ ১৯২৪ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস মেয়র হিসাবে নির্বাচিত হওয়ার পর সুভাষচন্দ্র বসুকে মুখ্য কার্যনির্বাহী আধিকারিক হিসাবে নিয়োগের নির্দেশনামা নিয়ে, ব্রিটিশ সরকারের সাথে তীব্র মত বিরোধের সৃষ্টি হয়েছিল। যদিও দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস দৃঢ়তার সাথে তাঁর সিদ্ধান্তে অবিচল থাকেন। তাঁর যুক্তি ছিল কলকাতা পৌরসভার স্বশাসনের স্বার্থেই ছিল তাঁর ঐ সিদ্ধান্ত।

রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি ১৯২১ সালে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভায় কলকাতা কর্পোরেশন আইন পাশ করিয়েছিলেন। ১৯২৩ সালে তাঁরই উদ্যোগে পাশ হয়েছিল বঙ্গীয় পৌর আইন। ১৯২৪ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ১৯২১ সালের আইনে প্রথম একজন ভারতীয় যিনি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে কলকাতার মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন। রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি ১৯২১ সালে ঐ বিলটি উত্থাপন করে বলেছিলেন, ‘‘বিলটি যে নীতির উপর রচিত হয় তা হলো মিউনিসিপ্যাল কমিশনার (এখন কাউন্সিলর)-দের হাতে প্রকৃত ক্ষমতা ও দায়িত্ব দান করা এবং ভিতর থেকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতাকে শিথিল করে বাইরে থেকে নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা প্রয়োগ করা। লর্ড রিপনের ১৮৮২ সালের প্রস্তাব এবং লর্ড মর্লের ১৯০৮ সালের ডেসপাচের নীতিও ছিল তাই।’’

তিনি বলেছিলেন, তাঁর সময়ের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ আইনটি ছিল কলকাতা কর্পোরেশন আইন। তিনি আরও বলেছিলেন ‘‘...এই আইনে নগরের মিউনিসিপ্যালিটির কাজকর্মের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা করদাতাদের প্রতিনিধিমণ্ডলীর হাতে অর্পণ করা হয়েছে। প্রতিনিধিদের অনেকাংশে ব্যাপকতর ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচিত হওয়ার ব্যবস্থাও এতে আছে।

... কর্পোরেশনের মোট সদস্য সংখ্যা ৫ ভাগের ৪ভাগই হবে করদাতাগণ কর্তৃক নির্বাচিত এবং কর্পোরেশনে তাদেরই পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠত হবে।’’

তিনি আর একটি ব্যবস্থাও নিয়েছিলেন পৌরসভায় মনোনীত সদস্য সংখ্যা হ্রাস করা এবং অল্ডারম্যানদেরও জন প্রতিনিধিদের দ্বারা নির্বাচিত করা। তিনি বলেছিলেন কলকাতার মেয়রের পদটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। ১৯৯৪ সালে কলকাতা পৌর কর্পোরেশন আইন ১৯৮০, সংশোধিত হয়, ৭৪তম সংবিধান সংশোধনের সাথে সাযুজ্য রেখে। ঐ সংশোধনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল কলকাতা পৌর কর্পোরেশন আইনের ৭৪নং ধারা বাতিল করে অল্ডারম্যান প্রথা তুলে দেওয়া। তার পর থেকে কলকাতা বা রাজ্যের তথা দেশের সব রাজ্যেই অল্ডারম্যান প্রথা তুলে দেওয়া হয়েছে। সংবিধানের ২৪৩ আর ধারাতে পরিষ্কার লেখা আছে পৌরসভার সমস্ত আসনই হবে নির্বাচিত এখানে May নয়, লেখা আছে Shall (...all seats in a Municipality shall be filled by persons chosen by direct election...। যে বিষয়টি নিয়ে কেউ কেউ বিতর্ক করতে চাইছেন তা হলো ২৪৩ আর ধারার চেয়ারপার্সন নির্বাচনের পদ্ধতি (Manner) প্রস্তুত করার ক্ষমতা রাজ্য সরকারকে দেওয়া। কিন্তু রাজ্য সরকারই আইন তৈরি করবে, তবে তা সংবিধানে উল্লিখিত কাঠামোর বাইরে হবে না। ম্যানার বলতে চেয়ারম্যান নির্বাচনের পদ্ধতি ও বিধি। কলকাতা পৌর কর্পোরেশন আইনে বলা আছে একজন নির্বাচিত কাউন্সিলর অন্য একজন নির্বাচিত কাউন্সিলরকে মেয়রের পদে প্রার্থী হিসাবে মনোনীত করবেন। একাধিক প্রার্থী থাকলে সেক্ষেত্রে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে নির্বাচিত হবেন মেয়র। তার মেয়াদ হবে ৫বছর। অনেক শহরের মেয়র হন সরাসরি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। আবার অনেক শহরে অপ্রত্যক্ষভাবে। অনেক ক্ষেত্রে মেয়রদের মেয়াদকাল ১ বা ২বছর, আবার বে‍শিরভাগ ক্ষেত্রে ৫বছর।

আর্টিকেল ২৪৩ আর ধারাতে বলা হয়েছে সদস্যরা হবেন সরাসরি নির্বাচিত। রাজ্য সরকার কোনও বিশেষজ্ঞদের মনোনীত করতে পারে, তবে তাঁর কোন ভোটাধিকার থাকবে না। যার ভোটাধিকার নেই তিনি কখনও মেয়র পদে নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন না।

৭৪তম সংবিধান সংশোধনীর এমনই নির্দেশ। কেউ কেউ বলছেন প্রধানমন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রীরা সাংসদ বা বিধায়ক না হয়েও যদি নির্বাচিত হতে পারেন, তবে রাজ্যের নগরোন্নয়ন মন্ত্রী মেয়র হয়ে, ছয় মাসের মধ্যে কাউন্সিলর পদে নির্বাচিত হতে পারবেন না কেন? বিষয়টিকে এভাবে সরলীকরণ করাটা সঠিক নয়। প্রধানমন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রীরা রাষ্ট্রপতি বা রাজ্যপালের দ্বারা প্রথমে নিযুক্ত হন (Appointed), মেয়র বা চেয়ারম্যানরা নির্বাচিত হন কাউন্সিলরদের গোপন ভোটে। কেউ কেউ বলছেন কলকাতার এই প্রথম একজন মুসলমান মেয়র হবেন, তাতেও বাধা দেওয়া হচ্ছে। প্রশ্নটা ব্যক্তির নয়, প্রশ্নটা সংবিধান ও আইনের। বিষয়টি‍‌কে ব্যক্তিগত পর্যায়ে না দেখে সাংবিধানিক দৃষ্টিতে দেখা উচিত।

পশ্চিমবঙ্গ এদেশের স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে একটি অগ্রণী রাজ্য। পরাধীন ভারতের সময় থেকেই আমরা তা দেখে আসছি। এ বছর যেমন ৭৪তম সংবিধান সংশোধনের ২৫বছর, তেমনি ২০২১ সালে পূরণ হবে রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জির কলকাতা কর্পোরেশন আইনের ১০০ বছর। সেই কলকাতাতেই সংবিধান, আইন ও ইতিহাসের প্রতি এমন অমর্যাদা কখনও কাম্য হতে পারে না।

মেয়র পদপ্রার্থী বিষয়ে কলকাতা পৌর কর্পোরেশনের সাম্প্রতিক আইন সংশোধন বা বেশ কিছু পৌর আইনে দীর্ঘকাল নির্বাচন না করে প্রশাসক বসিয়ে পৌরসভা পরিচালনার যে আইন সম্প্রতি বিধানসভায় অনুমোদন করা হয়েছে, তা সংবিধানের সাথে সাযুজ্যপূর্ণ নয় (against the spirit of 74th CAA)। সংবিধান এবং আইন কোনও ব্যক্তি বিশেষের স্বার্থে নয়। যা জরুরি অবস্থার সময় একবার করা হয়েছিল। যখন সারা দেশব্যাপী দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে তৃতীয় স্তর পর্যন্ত প্রসারিত বা Integration-এর গুরুত্বের বিষয় চর্চিত হচ্ছে, যখন স্থানীয় সরকারগুলিকে আরও বেশি স্বশাসন ও ক্ষমতায়িত করার বিষয়ে গবেষণাও চলছে, যখন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণের এবং অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের বিষয়টি বেশি বেশি ভাবে অনুভূত হচ্ছে, তখন পশ্চিমবঙ্গের মতো একটি প্রগতিশীল ও অগ্রণী রাজ্যে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের এই উদ্যোগ, বাংলার পরম্পরার সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ। একই জিনিস আমরা দেখছি সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলে গঠিত পরিষদগুলির বা দার্জিলিঙ-এ জি টি এ-এর ক্ষেত্রেও। এই দুই ক্ষেত্রেও রাজ্য সরকার হস্তান্তরিত ক্ষমতার ওপর হস্তক্ষেপ করছে। বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়টি শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক বিষয় নয়, এর সাথে সম্পর্কিত সু-শাসন, গণতন্ত্রের বিকাশ, সম্পদের ভারসাম্যমূলক ব্যবহার, আর্থিক গতি বৃদ্ধি তথা উন্নয়নের বিষয়ও। তাই এই বিষয়গুলির জন্যে প্রয়োজন রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা। এই সদিচ্ছার অভাব আমরা দেখছি এরাজ্যের সরকারের মধ্যে। আর তার জন্যেই মনে হয় এই সমস্ত অগণতান্ত্রিক ও অসাংবিধানিক পদক্ষেপ।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement