ভার্মাতঙ্ক

  ১২ই জানুয়ারি , ২০১৯

নির্বাচনের মুখে তাঁর আস্থাভাজন নয় এমন কোনও ব্যক্তিকে যে প্রধানমন্ত্রী কোনও অবস্থাতেই সিবিআই’র প্রধান পদে রাখবেন না তা একপ্রকার জানাই ছিল। দেশের শীর্ষ আদালতের রায়ে সিবিআই’র শীর্ষপদে অলোক ভার্মার প্রত্যাবর্তন ছিল মোদী সরকারের কাছে একরকম বজ্রাঘাতের শামিল। ভার্মাকে মোদী-শাহরা এতটাই বিপজ্জনক মনে করেন যে, সিবিআই প্রধান পদে তাঁকে একদিনের জন্যও রাখতে চান না। অথচ মোদীর নেতৃত্বাধীন কমিটিই তাঁকে নিয়োগ করেছিল। তখন মনে করেছিলেন ভার্মাকে রিমোট কন্ট্রোলেই চালানো যাবে এবং আরএসএস-বিজেপি’র রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা যাবে। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা যায় ভার্মা সরকারের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে থাকছে না। এই অবস্থায় মোদীর একান্ত আস্থাভাজন আস্থানাকে আনা হয় স্পেশাল ডিরেক্টর করে। বস্তুত আস্থানার মাধ্যমে ভার্মার ওপর নজরদারি এবং বিভিন্ন তদন্তে সরকারি চাপ ও নিয়ন্ত্রণ বলবৎ করাই ছিল সরকারের কৌশল। এইভাবে সিবিআই’র অভ্যন্তরে বিরোধ ও সঙ্ঘাতের বীজ বপন করে সরকারই। তারই পরিণতিতে দেশের শীর্ষ তদন্ত সংস্থার হাঁড়ির খবর চলে আসে প্রকাশ্যে। সংস্থার মান-মর্যাদা ধুলোয় লুণ্ঠিত হয়। বিশ্বাসযোগ্যতা ঠেকে তলানিতে। নজিরবিহীন অভিযোগ ওঠে স্পেশাল ডিরেক্টরের ওপর গোয়েন্দাগিরির। আস্থানা সিভিসি’র কাছে গোপনে লিখিত অভিযোগ জানান ভার্মার বিরুদ্ধে। আসরে অতি সক্রিয় হয়ে ওঠেন মোদীর আর এক আস্থাভাজন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা। বিপরীতে আস্থানার বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্তের নির্দেশ দেন ভার্মা। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছায় যে, যে কোনও মুহূর্তে গ্রেপ্তার হয়ে যেতে পারেন আস্থানা। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে মধ্যরাতের অভিযান চালিয়ে আস্থানা ও ভার্মা দু’জনকেই ছুটিতে পাঠায় সরকার। আস্থানার বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত চলছে, এমনকি এফআইআরও হয়েছে। তাকে ছুটিতে পাঠানোর জমি তৈরিই ছিল। কিন্তু ভার্মার বিরুদ্ধে তেমন কিছু তৈরি ছিল না। তাই আস্থানার অভিযোগের ভিত্তিতে অত্যধিক দ্রুততায় সিভিসি’কে দিয়ে তদন্ত করিয়ে রিপোর্ট তৈরি হয় ভার্মাকে সরানোর।

কিন্তু এই অপসারণ পদ্ধতিকে মান্যতা দেয়নি সুপ্রিম কোর্ট। সুপ্রিম কোর্ট স্মরণ করিয়ে দিয়েছে এই কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার স্বাধীনতার কথা। বুঝিয়ে দেবার চেষ্টা করেছে সরকারি চাপমুক্ত অবস্থায় সিবিআই পরিচালনার কথা। তাই সর্বোচ্চ আদালত ভার্মার অপসারণ নির্দেশ বাতিল করে পুনর্বহাল করে। গত ২৩শে অক্টোবর মধ্য রাতে ভার্মা অপসারিত হবার পর ৮ জানুয়ারি পুনর্বহাল হন। যদিও তাঁর মেয়াদ ৩১ জানুয়ারি। অর্থাৎ যাঁর মেয়াদ মাত্র তিন সপ্তাহ তাঁকে নিয়ে মোদী সরকারের এত ভয়, এত আতঙ্ক স্বাভাবিকভাবেই ইঙ্গিতবহ। ভার্মা পুনর্বহাল হয়েই আস্থানার বিরুদ্ধে যারা তদন্তের দায়িত্বে ছিলেন সেই অফিসারদের বদলির নির্দেশ বাতিল করে দেন। বস্তুত ভার্মার অপসারণের সঙ্গে সঙ্গেই ঐ অফিসারদের দেশের দূরবর্তী শহরে বদলি করা হয়। ভার্মাকে নিয়ে মোদীদের উদ্বেগ-আতঙ্ক তাই সহজেই অনুমেয়।

ভার্মা নিয়ে সরকারের, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর আতঙ্ক সর্বাধিক। তার মূলে রাফালে দুর্নীতি। রাফালে দুর্নীতির প্রচার এতটাই ব্যাপকতা পায় যে এবং সমগ্র বিরোধী মহল থে‍‌কে সিবিআই-তদন্তের জোরালো দাবি ওঠায় যে কোনও সময় ভার্মা তদন্তের আদেশ দিতে পারেন এমন আশঙ্কায় ভীত হয়ে পড়ে সরকার। প্রথম দফায় ভার্মাকে অপসারণের পেছনে এই ভীতি জোরালোভাবে কাজ করেছে। পুনর্বহালের পর সেই আতঙ্ক আরও জোরালো হয়েছে। তাই ভার্মাকে আর একদিনের জন্যও সরকার মেনে নিতে রাজি নয়। মোদী-অমিতরা একরকম প্রায় নিশ্চিত ভার্মা রাফালে নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দেবেন। তেমনটা হলে ভোটের আগে‍ অথৈ জলে পড়তে হবে মোদীকে। একইভাবে বিরোধীরা মোদীকে আক্রমণ করার দারুণ সুযোগ পেয়ে যাবে। অর্থাৎ রাফালে আতঙ্কে মোদীরা এতটাই কাবু হয়ে গেছেন যে, ভার্মাকে তাড়াতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। শেষপর্যন্ত ভার্মাকে তাড়িয়ে আপাত স্বস্তি মিললেও শেষ রক্ষা হবে কি?

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement