ধোপে টেকেনি অভিযোগ
জামিন বামপন্থী কর্মীদের

নিজস্ব প্রতিনিধি   ১২ই জানুয়ারি , ২০১৯

কলকাতা, ১১ জানুয়ারি— ধোপে টিকলো না পুলিশের দায়ের করা মামলা। জয় হলো বাম নেতৃত্ব ও কর্মীদের প্রতিবাদ আন্দোলনেরই। গ্রেপ্তার হওয়া পাঁচ বামপন্থী নেতা কর্মীকে ব্যক্তিগত বন্ডে জামিনে মুক্তি দিল আদালত। উড়ল লাল আবির। বিজয় ধ্বনি দিয়ে পাঁচজনকে কাঁধে তুলে কোর্ট চত্বর থেকে বেরিয়ে এলেন ছাত্র-যুব ও বাম কর্মীরা। তাঁদের বক্তব্য, সাজানো ও ভিত্তিহীন মামলা কখনোই ধোপে টেকে না, টিকবেও না। আগামী ২২ এপ্রিল তারিখ ফের এই মামলার শুনানি।

শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেই দাবি আদায়ে লড়াইয়ের পথে থাকলেন ওঁরা। জেদের আগুন বুকে নিয়েই চলবে আন্দোলন। মহানগরের রাজপথে মিছিলে হাঁটার ‘অপরাধে’ যেভাবে চক্রান্তের জাল বিছিয়ে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো ও গারদে পুরে দেওয়ার কাজ সুকৌশলে বিস্তার লাভ করছিল তাতে বাধ সাধল সেই আন্দোলন। ব্যর্থ হলো পুলিশের চেষ্টা। আদালত চত্বরে বসন্ত উৎসবে মাতলেন সমস্ত যোদ্ধা ও সহ যোদ্ধারা। জেদের লড়াই আরও উত্তাল হলো লাল রঙের ঢেউয়ে।

সদ্য হওয়া সাধারণ ধর্মঘটের দ্বিতীয় দিনে উইকেট দিয়ে একটি গাড়ি ভাঙচুর হয়েছে বলে অভিযোগ এনে ১৭জনের নামে মামলা দায়ের করে পুলিশ। বাম নেতা-কর্মীদের বক্তব্য ছিল এই মামলা সম্পূর্ণ সাজানো ও ভিত্তিহীন। বুধবার দুপুরে আদালতে তোলা হলে ১২জন বামপন্থী কর্মীকে আদালত জামিনে মুক্তি দেয়। তবে সিপিআই(এম) কলকাতা জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য সংগ্রাম চ্যাটার্জি, এসএফআই নেতা দীপক সিংহ, সুশ্রীল মিশ্র, ডিওয়াইএফআই নেতা তাপস সাহা ও ধীরেন্দ্রকুমার সিনহাকে একদিনের জেল হেপাজতের নির্দেশ দেয়। তাঁদের নিয়ে যাওয়া হয় প্রেসিডেন্সি জেলে। শুক্রবার ফের তাঁদের ব্যাঙ্কশাল কোর্টে তোলা হলে ব্যক্তিগতভাবে ১ হাজার টাকার বন্ডে পাঁচজনকে জামিন দেয় আদালত। তবে আগামী ২২ এপ্রিল ফের আদালতে হাজিরা দিতে হবে এই পাঁচজনকে।

এদিন বেলা ২টো বাজার আগেই তাঁদের নিয়ে আসা হয় ব্যাঙ্কশাল কোর্টে। তার অনেক আগে থেকেই বামপন্থী নেতা-কর্মী সহ ছাত্র-যুবরা আদালত চত্বরে ভিড় করে অপেক্ষা করছিলেন। ছিলেন অনাদি সাহু, ফৈয়াজ আহমেদ খান, মধুজা সেনরায়, দেবব্রত বিন্দু, তরুণ ব্যানার্জি, ইন্দ্রজিৎ ঘোষ, কলতান দাশগুপ্ত, সৃজন ভট্টাচার্য, প্রতীক উর রহমান প্রমুখ। বেলা ৩টে ১৫মিনিট নাগাদ বিচার ভবন থেকে বেরিয়ে আসেন পাঁচজন। তাঁদের ঘিরে স্লোগান দিয়ে বিজয় ধ্বনি দিতে দিতে এগিয়ে যান কমরেডরা, কাঁধে তুলে বেরিয়ে আসেন কোর্ট চত্বরের বাইরে। সেখানে লাল আবির দিয়ে তাঁরা স্বাগত জানান সংগ্রাম চ্যাটার্জি, দীপক সিংহ, সুশ্রীল মিশ্র, তাপস সাহা, ধীরেন্দ্র সিনহাকে। এরপর উপস্থিত কমরেডরা একে অন্যকে লাল আবিরে মাখিয়ে রীতিমতো আনন্দোৎসবে মেতে ওঠেন। ছাত্র-যুব নেতৃত্ব ও কর্মীরা বিজয় মিছিল করেন স্ট্র্যান্ড রোডে। মিছিল যায় বাবুঘাট পর্যন্ত। সেখানে পথ সভায় শামিল হন তাঁরা।

ধর্মঘটের প্রথম দিন থেকেই ধর্মঘট ভাঙতে পথে নামে পুলিশ। পুলিশের নির্দেশ ছিল, লাল ঝান্ডার কোনও মিছিলই করা যাবে না। মিছিল করলে গ্রেপ্তার করা হবে। সেই অনুযায়ী দ্বিতীয় দিন বৈঠকখানা রোডের মুখে শান্তিপূর্ণ মিছিলে লাঠিচার্জ করে পুলিশ। ২২জন ধর্মঘটকারীকে আটক করে আর্মহার্স্ট স্ট্রিট থানায় নিয়ে আসা হয়। থানার তৎপরতা শুরু হয় তখন থেকেই। এখানে পাঁচজন অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাঁদের চিকিৎসার পর ছাড়া হয়। বাকি ১২জনকে বৃহস্পতিবার জামিন দেয় আদালত। বাকি ৫জনকে আটক করে রাখা এবং পুলিশের সাজানো ও মিথ্যা মামলার প্রতিবাদ আন্দোলনে উত্তাল হয় গোটা রাজ্য। অন্যদিকে আবার সংবাদমাধ্যমে ক্রমাগত দেখানো হতে থাকে একটি পুলকার ভাঙচুর করেছে ধর্মঘটীরা। থানায় পৌঁছে যান তৃণমূল নেতা পিয়াল চৌধুরি। একটি উইকেট দেখিয়ে তিনি বলেন, এটা দিয়েই নাকি ভাঙচুর হয়েছে পুলকার। পুলকার ভাঙচুরের মামলা সাজায় পুলিশ। এরপর অ্যারেস্ট মেমোতে দফায় দফায় সই করানো হয়। তাও আবার ভুল করে অনাবশ্যক দেরি করতে থাকে পুলিশ।

যে পুলকারটি নিয়ে কথা হয়েছে, জানা গিয়েছে সেটি আর্মহার্স্ট স্ট্রিটের অ্যাংলো অ্যারাবিক স্কুলের পুলকার। সেই স্কুলের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান ৩৭নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল নেতা পিয়াল চৌধুরির স্ত্রী। থানায় গিয়ে পিয়াল চৌধুরিই পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন কার নামে কি কেস দিতে হবে। সেইমতো কেস সাজাতে শুরু করে পুলিশ। এও বলা হয় তাদের নাকি অপরাধীদের মতো পোশাক পরে থাকতে হবে লালবাজারে পুলিশি হেপাজতে। এদের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ১৪৭, ১৪৯, ৪২৭, ৩২৪, ৩৫৩ ধারায় ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর বিরোধি কালা আইনের ৮এবং ৯ধারায় মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। গোটা ঘটনার প্রতিবাদে ও মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে বৃহস্পতিবারই সন্ধ্যায় কলকাতায় কলেজ স্ট্রিট মোড় অবররোধ করে বিক্ষোভ দেখায় এসএফআই, পোড়ানো হয় মুখ্যমন্ত্রীর কুশপুতুল। নেতৃবৃন্দের বক্তব্য, আমরা কোনও পুলকারে ভাঙচুর করিনি। দলদাস পুলিশ শাসক দলের কথায় এসব করছে। আগামী দিনেও আমরা প্রতিবাদ আন্দোলনে থাকব।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement