গ্রন্থাগার দিবসের ভাবনা

প্রবীর দে   ২০শে ডিসেম্বর , ২০১১

অবিভক্ত বাংলার গ্রন্থাগার আন্দোলন শুরু হয়েছিল পরাধীন ভারতে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামীরাই অবিভক্ত বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে গড়ে তুলেছিলেন অসংখ্য স্বেচ্ছাসেবী গ্রন্থাগার এই গ্রন্থাগারের সামনে থাকতো একটা আঙিনা। ওই সব গ্রন্থাগারে থাকতো দেশপ্রেমিকদের জীবনীগ্রন্থ ও দেশ বিদেশের মুক্তি বা স্বাধীনতা সংগ্রামের কাহিনী নিয়ে লেখা বই। ওই সব গ্রন্থাগারের মাধ্যমে এলাকার তরুণ যুবসমাজকে সংগ‍‌ঠিত করা হতো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামে। গ্রন্থাগারের সামনের ওই আঙিনাটা সব তরুণ যুবকদের শরীর চর্চা, লাঠি খেলা, ছোরা খেলার কাজে ব্যবহার করা হতো। মূলত এই সব গ্রন্থাগারগুলো সংগঠিত করেছিলেন বাংলার যুগান্তর ও অনুশীলন সমিতির দেশপ্রেমিক নেতৃবৃন্দ। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সময় থেকে স্বেচ্ছাসেবী গ্রন্থাগারের সংখ্যা আরো বাড়তে থাকে। এই সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গ্রন্থাগারগুলোকে সংগঠিত করে সংগঠিত গ্রন্থাগার আন্দোলন গড়ে তোলার জন্যই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বঙ্গীয় গ্রন্থাগার পরিষদ। ১৯২৫ সালে ২০শে ডিসেম্বর কলকাতার অ্যালবার্ট হলে এক কনভেনশনের মাধ্যমে গঠিত হয় বঙ্গীয় গ্রন্থাগার পরিষদ। প্রথম সভাপ‍‌তি নির্বাচিত হন গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ। বেশ কয়েক বছর পর ২০শে ডিসেম্বর দিনটিকে পরিষদের পক্ষ থেকে গ্রন্থাগার দিবস হিসেবে পালন করা হয়ে থাকে। গ্রন্থাগার দিবসে আর যাঁদের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা দরকার তাঁরা হলেন — কুমার মণীন্দ্রদেব রায়, সুশীলকুমার ঘোষ, তিনকড়ি দত্ত, রাজেন্দ্রলাল মিত্র প্রমুখ। তারপরই স্মরণ করা দরকার ড. নীহাররঞ্জন রায়, প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, প্রমীলচন্দ্র বসু, ফণীভূষণ রায় প্রমুখদের। এঁরা ছিলেন বঙ্গীয় গ্রন্থাগার পরিষদের প্রাণপুরুষ। এর পরের গ্রন্থাগার আন্দোলনে আধুনিক যুগে আরও গতি এনেছেন যাঁরা তাঁরা হলেন প্রবীর রায়চৌধুরী, ড. সৌরেন্দ্রমোহন গঙ্গোপাধ্যায়, সত্যব্রত সেন প্রমুখ।

গ্রন্থাগার আইন

প্রথাগত শিক্ষার আঙিনার পাশাপাশি প্রথামুক্ত শিক্ষার পীঠস্থান হচ্ছে সাধারণ গ্রন্থাগার। বঙ্গীয় গ্রন্থাগার পরিষদ সার্বিক গ্রন্থাগার আইন প্রণয়নের জন্য দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে এসেছে। কিন্তু কোনো সরকারই গ্রন্থাগার আইন প্রণয়নের আগ্রহ দেখায়নি। অবশেষে বামফ্রন্ট সরকার তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পালন করেছে ১৯৭৯ সালে ১২ই সেপ্টেম্বর গ্রন্থাগার আইন প্রণয়নের মধ্য দিয়ে। যার ফলে আজ পশ্চিমবঙ্গে প্রায় আড়াই হাজার সরকার পোষিত সাধারণ গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। গ্রন্থাগার আইন প্রণয়ন ও নতুন গ্রন্থাগার স্থাপনের মধ্য দিয়ে প্রথামুক্ত শিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। গ্রন্থাগার আন্দোলনে এক জোয়ার এসেছে। সরকার পোষিত গ্রন্থাগারের পাশাপাশি আজও পশ্চিমবঙ্গে প্রায় দেড়শ স্বেচ্ছাসেবী গ্রন্থাগার দ্বারা সমাজে এক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে চলেছে।

সমস্যা :

গ্রন্থ ও গ্রন্থাগারের উপর আক্রমণ একটা সমস্যা। আলেকজান্দ্রিয়ার প্রাচীনতম গ্রন্থাগারটি ধ্বংস করা হয়েছিল। ফরাসি দেশে হিটলারের আমলে নাৎসিরা অনেক গ্রন্থাগারের বই পুড়িয়ে দিয়েছিল। খোদ রাজধানী বার্লিন শহরে বেবেল লাইব্রেরির বইগুলো রাজপথে এনে সমস্ত রাত ধরে পুড়িয়েছিল নাৎসিরা। সারারাত ধরে বইগুলো চিতার আগুনের মতো ধিক্‌ ধিক্‌ করে জ্বলেছিল। এই গ্রন্থাগারটি ব্যবহার করতেন কার্ল মার্কস, ফেডরিখ এঙ্গেলস্‌ ও হেগেলের মতো দার্শনিকগণ। জরুরী অবস্থার সময়ও বেশ কিছু প্রগতিশীল গ্রন্থাগার ধ্বংস করা হয়েছিল। বামফ্রন্টের আমলেই বলপাই দৌলতচক গ্রন্থাগার, নদীয়ার জাগৃহী পাঠাগার ও হাওড়ার লেনিন লাইব্রেরি আক্রান্ত হয়েছিল এবং ধ্বংস করা হয়েছিল। দৌলতচক গ্রন্থাগার পুড়িয়ে দেওয়ার পর লিখেছিলাম, ‘বই পোড়াতে নেই, বই পড়তে হয়, বই পড়াতে হয়’। আনন্দের কথা যে, এই সবক’টি লাইব্রেরি আবার স্বমহিমায় তাদের সামাজিক দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে।

আধুনিক প্রযুক্তির যুগে সাধারণ গ্রন্থাগারগুলিকে আধুনিকীকরণ করা হয়েছে। গ্রন্থাগারের সাথে যুক্ত হয়েছে কম্পিউটার, ইন্টারনেট ও অ-বইসামগ্রী। এছাড়াও মূল্যবান বই ও প্রাচীন পুঁথি ডিজিটাইজড করা হচ্ছে। বর্তমান বিশ্বে তথ্যের বিস্ফোরণ ঘটেছে এবং তথ্যের অধিকার আইনের স্বীকৃতি পেয়েছে। এই সব তথ্য সাধারণ গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত হবে। গ্রন্থাগার পরিষেবার মাধ্যমে গবেষকদের হাতে তুলে দিতে হবে তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য। সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করতে হবে। আই এফ এল এ (ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব লাইব্রেরি অ্যাসোসিয়েশন) বলছে, ‘পাবলিক লাইব্রেরি ইজ দ্য গেটওয়ে টু দ্য ইনফরমেনশন ওয়ার্ল্ড’ অর্থাৎ সাধারণ গ্রন্থাগার হচ্ছে তথ্য জগতের প্রবেশদ্বার। এত সব উপকরণ গ্রন্থাগারে রাখা হয়েছে যাদের জন্য তারা কোথায়? সাধারণ গ্রন্থাগারে মানুষের সংযোগ অনেকটা কমে গেছে কারণ বৈদ্যুতিন মাধ্যম ও বিশ্বায়নের প্রভাব। বৈদুতিন মাধ্যমের যে তাণ্ডব-সংস্কৃতি সেই তাণ্ডব-সংস্কৃতি গ্রন্থাগারের সমস্যা অনেক বাড়িয়ে তুলেছে। সাধারণ মানুষকে তা থেকে ফিরিয়ে আনতে হবে। মহামতি লেনিন সাধারণ গ্রন্থাগার সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন, ‘একটা গ্রন্থাগারে কত পুরাতন পুঁথি ও মূল্যবান গ্রন্থ আছে তা দিয়ে গ্রন্থাগারের মূল্যায়ন হবে না। মূল্যায়ন হবে ঐ সমস্ত মূল্যবান পুরাতন পুঁথি কত সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া গেছে।’ সাধারণ গ্রন্থাগারকে ইউনেস্কো সংজ্ঞা দিয়েছে — বলেছে পিপলস্‌ ইউনিভার্সিটি অর্থাৎ জনগণের বিশ্ববিদ্যালয়। অর্থাৎ সাধারণ গ্রন্থাগারে কোনো বয়সের সময়সীমা, শিক্ষার কোন মানদণ্ড নেই, আবালবৃদ্ধবনিতা নির্বিশেষে সাধারণ গ্রন্থাগারে আসবেন তার প্রয়োজনীয় গ্রন্থ সংগ্রহের জন্য। আমরা জানি শিক্ষা চেতনা আনে। আর চেতনা আনে সামাজিক পরিবর্তন। সমাজ পরিবর্তনের বাঁকে সমাজ চেতনা বিকাশের ক্ষেত্রে গ্রন্থ ও গ্রন্থাগার যুগ যুগ ধরে সমাজ বিকাশের দূত হিসেবে ছিল আজও আছে এবং আগামী দিনেও থাকবে। তাই গ্রন্থাগার দিবসের আহ্বান হোক —

‘সবাই গ্রন্থাগারে আসুন,

বইয়ের পাতা খুলুন,

বই পড়ুন,

দেশ গড়ুন’।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement