খাঁপুরের ডাক

মানবেশ চৌধুরী   ৯ই ফেব্রুয়ারি , ২০১২

৭ই ফাল্গুন ১৩৫৩ ( ২০শে ফেব্রুয়ারি ১৯৪৭ ) বাংলা তথা ভারতবর্ষের কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় দিন। দিনাজপুর ( এখন দক্ষিণ দিনাজপুর ) জেলার বালুরঘাট থানার একটি গ্রাম খাঁপুর। ৬৫ বছর আগে, খাঁপুর তার আশেপাশের গ্রামের কৃষক জনতাকে নিয়ে সেই তারিখে রাতের অন্ধকারে এবং সকালের সূর্যের আলোয় এক ভীষণ যুদ্ধে শামিল হয়েছিল। জমিদার-জোতদার শ্রেণী, তাদের স্বার্থবাহী-সেবক ব্রিটিশ রাজ, লিগ মন্ত্রিসভা, কংগ্রেস ও মুসলিম লিগ দলের বিরুদ্ধে এ ছিল এক অসীম সাহসিক দুর্বার সংগ্রাম। প্রগাঢ় শ্রেণী-চেতনায় উদ্বেলিত আধিয়ার-খেতমজুর-কৃষকরা জীবন মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য করে ব্রিটিশ শাসকের পুলিশের নিক্ষিপ্ত গরম সীসার গুলির সামনে বুক টান করে দাঁড়িয়ে মৃত্যুকে বরণ করেছিলেন। ২২ জন বীর ঐ একদিনের ঘটনায় খুন হয়ে গিয়েছিলেন।



উদ্যোগপর্ব

১৯৩৬-৩৭ সালের কথা। অন্যান্য অনেক জায়গার মত দিনাজপুরের সন্ত্রাসবাদী তরুণ বিপ্লবীরা কারাগারেই সন্ত্রাসবাদ সম্পর্কে বীতশ্রদ্ধ হয়েছিলেন। জেল থেকে ফিরে তাঁরা ঠিক করলেন যে, জেলায় কমিউনিস্ট পার্টি ও কৃষক সংগঠন গড়ে তুলতে হবে।

১৯৩৮ সালে কমিউনিস্ট পার্টির দিনাজপুর জেলা সাংগঠনিক কমিটি তৈরি হলো।

কৃষক সমিতির কাজ শুরু হলো। প্রথম কাজ-প্রচার। কৃষকদের দুরবস্থার বিবরণ ও তার প্রতিকারের বিষয় উল্লেখ করে প্রচারপত্র বিলি করা হলো। নিপীড়িত কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হলো। ১৯৩৮ ( কমরেড্ হাজী দানেশের বিবরণ মতে ১৯৩৯ ) সালে ফুলবাড়ী থানার লালপুর গ্রামে সমিতির প্রথম জেলা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো। সঙ্গে সঙ্গে ১৬ দফা দাবি সনদের ভিত্তিতে বিজ্ঞানসম্মত ভাবে পর্যায়ক্রমিক আন্দোলন ধাপে ধাপে গড়ে উঠলো। তার মধ্যে একটি-নিজ খোলানে ধান তোলা –আধিয়ার আন্দোলন। ১৯৩৮-৩৯-৪০ সালে এই আন্দোলন বৃহত্তর দিনাজপুর জেলার অনেক জায়গায় গড়ে উঠেছিল।

১৯৪০-৪১ সালে কমিউনিস্ট পার্টি ও কৃষক সমিতির উপর ইংরেজ সরকারের প্রশাসনিক আক্রমণ নেমে আসে। ১৯৪২ সালে, নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে সাংগঠনিক কমিটির জায়গায় পার্টির জেলা কমিটি গঠিত হয়। মন্বন্তরের পটভূমিতে নতুন করে কৃষক সমিতির কাজ শুরু হয়। লঙ্গরখানা খোলা, চিকিৎসার বন্দোবস্ত, কাপড়-কেরোসিনের দাবিতে আন্দোলন, মজুত উদ্ধার-কালোবাজারী প্রতিরোধে আন্দোলন গড়ে তোলা হয়।

১৯৪৪ সালে ২৯শে ফেব্রুয়ারি থেকে ২রা মার্চ ঐ লালপুর গ্রামেই বিপুল আনন্দ, উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে সপ্তম প্রাদেশিক কৃষক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ঐ গ্রামের সারাক্ষণের কৃষককর্মী রূপনারায়ণ রায় ১৯৪৬ সালে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভায়, তিন জনের মধ্যে অন্যতম একজন কমিউনিস্ট সদস্য হিসাবে নির্বাচিত হন। এটা একটা ঐতিহাসিক ঘটনা।

ইতোমধ্যে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ সাম্যবাদী শক্তির বিজয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে। বাংলায় মানুষের তৈরি করা মহা মন্বন্তরপর্ব শেষ হলেও তার রেশ তখনও বিদ্যমান। মাথার উপরে ব্রিটিশ রাজ। বাংলার শাসনতখ্তে মুসলিম লিগ। আর অন্যতম মূল রাজনৈতিক শক্তি কংগ্রেস দল। সবাই তাদের শ্রেণীস্বার্থে গ্রামের কায়েমী স্বার্থবাদীদের পক্ষে। কিন্তু আধিয়ার (বর্গাদার), খেতমজুর, দিনমজুর, রায়ত কৃষক কেউ আর শোষণ বঞ্চনা মেনে নিতে রাজি নয়। কৃষক সমিতির যোগ্য নেতৃত্ব, গ্রামীণ নিপীড়িত মানুষের এই সংগ্রামী মেজাজকে উপলব্ধি করে, প্রাদেশিক কৃষক কাউন্সিলের সভা ১৯৪৬ সালের ২৬ শে সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভা থেকে বর্গাদারের জন্য দাবি তোলা হলো-তেভাগা চাই। মানে মোট ফসলকে তিনভাগ করে দুইভাগ দিতে হবে বর্গাদারকে।

সর্বাধিক তীব্রতায় এই মহান তেভাগা সংগ্রাম বৃহত্তর দিনাজপুর জেলাতেই সংগঠিত হয়েছিল।



খাঁপুরের তেভাগা-তেভাগার খাঁপুর

এই খাঁপুর গ্রামে শুরুর সময়তেই কমিউনিস্ট পার্টি আর কৃষক সমিতি তৈরি হয়ে গিয়েছে। মূল ঘাঁটি পাশের পতিরাম।

কৃষ্ণদাস মহন্তের নেতৃত্বে পতিরাম আর আশেপাশের এলাকায় কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে উঠেছিল। গড়ে উঠেছিল কৃষক সমিতি।

১৯৩৯-৪০ সালেই পতিরামে তখনকার বিখ্যাত পতিরাম-মেলায় গবাদি পশু বিক্রির লেখাই খাজনা কমানোর দাবিতে মেলা ভেঙে অন্যত্র বসানোর আন্দোলন হয়। দিনাজপুরের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এই আন্দোলন সংগঠিত করতে পতিরাম এলাকার কমরেডদের সঙ্গ দিয়েছিলেন। আন্দোলনে জয় হয়েছিল।

বাহুল্য হলেও, এই এলাকার তেভাগা সংগ্রামের আগের আরও কয়েকটি আন্দোলনের কথা বলে রাখি। ১৯৪২ সালে পতিরাম, নাজিরপুর, গোপালবাটি এসব এলাকায় ১১০০-১২০০ আধিয়ারকে উচ্ছেদ করার জমিদার-জোতদারের ষড়যন্ত্রকে রুখে দেওয়া গিয়েছিল। ঐ বছরেই মুনাফালোভী সৃষ্ট মহামন্বন্তর শুরু হয়েছে। সে সময় উল্লিখিত এলাকাগুলি থেকে বালুরঘাট মহকুমা সদরে খাদ্যের দাবিতে বিরাট গণ-মিছিল সংগঠিত হয়েছে। খাঁপুর গ্রামের অবদান এ মিছিলে ছিল সব থেকে বেশি। আপাতভাবে যোগসূত্রহীন হলেও, তখনকার ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনেরই এ ছিল ছিল এক অন্যবিধ প্রকাশ। বলা যায়, প্রকৃত অর্থে গণ মানুষের শ্রেণী-দাবির আন্দোলন। মন্বন্তরের ঐ সময়ে এ গ্রামেই চিয়ারসাই শেখের নেতৃত্বে, শত শত গরুর গাড়িতে করে যখন জমিদার ধান পাচার করছিল, তখন সেসব আটকে দিয়ে ন্যায্য মূল্যে বিলি করে দেওয়া হয়েছিল। প্রায় একই সময়ে এই এলাকা থেকে রায়গঞ্জে একটা মিছিল গিয়েছিল। বলা বাহুল্য, তা ছিল পায়ে হাঁটা মিছিল। এই মিছিল যখন রায়গঞ্জে পৌঁছায়, তখন সেখানে

চরম নৈরাশ্য আর দিশাহীনতা বিরাজ করছিল। কারণ, জাতীয় নেতাদের গ্রেপ্তারের খবর তখন পৌঁছে গিয়েছে; কিন্তু অত:পর কী কর্তব্য তা স্থানীয় কংগ্রেস নেতৃত্ব ঠিক করতে পারছেন না। ঐ আগত মিছিল যখন জাতীয় নেতাদের মুক্তির দাবিতে শ্লোগান তুলল, তখন রায়গঞ্জের জাতীয়তাবাদী নেতারা এগিয়ে এলেন। এভাবে ঘটনাচক্রে, সংগঠিত কৃষক সংগ্রামের সেই প্রত্যুষ লগ্নেই, সে তার বৃহত্তর কর্তব্য সাধন করেছিল।

এসব ঘটনার উল্লেখ করলাম এই এলাকার সংগ্রামী চেতনা ও মহান সংগঠনের বিষয়টি জানানোর জন্য। সেজন্যই তো খাঁপুরে এত তীব্রতায় তেভাগা আন্দোলন গড়ে উঠিছিল।

বঞ্চিত আধিয়ারদের যখন তখন উচ্ছেদ করা যেতো। তাদের বলত আধিয়ার , মানে যেন অর্ধেক ফসলের ভাগ তার। কিন্তু আসলে ব্যাপারটা সে রকম ছিল না। জমিদার-জোতদারা অর্ধেকের বেশি নিয়ে নিত তার কাছ থেকে। নিজের বাড়িতেও তুলতে পারত না ফসল সে। সঙ্গে ছিল আরও না না ধরনের আদায়। জমিদারবাবুর নজরানা, হাট ও মেলায় তোলা আদায়,পার্বণী, পাহাড়াদারি, মহালদারি ইত্যাদি না না বাবদে হরেকরকমের নজরানা দিতে দিতে বর্গাদার নি:স্ব হয়ে যেত। তার সঙ্গে ছিল নির্মম দাদনের কারবার।

আধি নাই-তেভাগা চাই, নিজ খৈলানে ধান তোল, জমিদারের কী ধার ধারী—জমিদারী উচ্ছেদ করি, লাঙ্গল যার-জমি তার, জোতদার-জমিদার হুঁশিয়ার, হুঁশিয়ার; তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল স্বাধীনতার দাবি, ব্রিটিশ সৈন্য—সরে যাও, সরে যাও, ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট সরে যাও—আপসে গদি ছেড়ে দাও, জাতীয় গভর্নমেন্ট চাই। এসব স্লোগানে মুখরিত হতে থাকল খাঁপুর আর আশেপাশের গ্রামগুলো।

গ্রামগুলোর সবাই বর্গাদার নয়। তবুও প্রায় সবাই এই আন্দোলনে শামিল হয়েছিল। কারণ, সবাই ছিল কোন না কোন ভাবে জমিদার-জোতদারদের অন্যায় শোষণে জর্জরিত। জমিদার-জোতদাররা বিশাল জোতের মালিক। আধিয়ারদের নানা অছিলায় নির্মমভাবে ঠকায়। ওরাই আবার মহাজনী সুদের কারবারি। ঋণভারে সুদের বোঝায় ন্যূব্জ কৃষকের জীবন। এমন কী, কিছু বেশি জমি যাদের ছিল সেই কৃষকরা পর্যন্ত। ছোট কৃষক তো বটেই, এমন কী ২০-২৫ বিঘা জমির মালিকের ঘরেও নিত্য অভাব লেগে থাকতো। মূল কারণ, চড়া হারে সুদের কড়ারে ঋণ। জমিদার-জোতদার বাড়ির কাজের মুনিশ-মাহিন্দার, গ্রামীণ অন্যান্য শ্রমজীবী, কারিগর, ছোট দোকানদার—এরকম সমস্ত অংশের মানুষ কোন না কোন ভাবে জমিদার-জোতদারদের দ্বারা শোষিত নির্যাতিত তো হতই। এদের কোন সামাজিক মর্যাদাও ছিল না। যাপন করতে হত তাদের অপমানের জীবন। জমিদার-জোতদার ধনীদের প্রতিপত্তির কাছে এরা মাথা নিচু করে থাকতে বাধ্য হত। সে জন্য তেভাগার আন্দোলন শুধু আধিয়ারদের আন্দোলন ছিল না। শ্রেণী ও সামাজিকভাবে নিপীড়িত সমস্ত অংশ বনাম জমিদার-জোতদারদের মধ্যেকার সংগ্রাম ছিল তা।

কৃষককর্মীরা খাঁপুর ও আশেপাশের এলাকাতেও ভলান্টিয়ার বাহিনী তৈরি করল, পাড়ায় পাড়ায় মিছিল মিটিং হতে থাকল । নিজ খৈলানে ধান তোলা চলতে থাকল, তা না পারলেও, জমিদার-জোতদারদের খৈলানে যে ধানের আঁটি উঠে গিয়েছিল, সেখান থেকে তা নিয়ে আসা অর্থাৎ খৈলান ভাঙার আন্দোলন চলতে থাকল। দিকে দিকে বিজয় সংগঠিত হতে থাকল।

জমিদার-জোতদাররা তাদের স্বার্থবাহী প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে আন্দোলনের নেতা কর্মী ও যাদের উপর তারা বিরূপ ছিল, তাদের নামে মিথ্যা মামালা রুজু করল। কয়েক জন কৃষকনেতা আত্মগোপন করলেন। কিন্তু আন্দোলন থেমে থাকল না।

জমিদার-জোতদাররা প্রমাদ গুনল। প্রমাদ গুনল তাদের রাজনৈতিক দল কংগ্রেস ( অন্যত্র মুসলিম লিগ)। তাদের ষড়যন্ত্র আরও তীব্র হলো। না না রকম শয়তানি ফন্দি আঁটতে থাকল তারা। কিন্তু আন্দোলন চলতেই থাকল।

জমিদারের পদলেহী পুলিসেরা ৬ই ফাল্গুন ১৩৫৩ বঙ্গাব্দ (২০শে ফেব্রুয়ারি ১৯৪৭ ) মধ্যরাতে খাঁপুর গ্রামে ঢুকে কৃষক নেতা ও কর্মীদের গ্রেপ্তার করতে লাগল।

ঐ রাত্রিতেই বীরাঙ্গনা মা যশোদার নেতৃত্ত্বে নারী-সংগ্রামীরা শঙ্খধ্বনি দিয়ে জানিয়ে দিলেন যে , পুলিস এসেছে কমরেডদের ধরবার জন্য। সঙ্গে সঙ্গে পাড়ায় পাড়ায় কাড়া-নাকাড়া বেজে উঠল। আশেপাশের গ্রাম থেকে টিপ্টিপানি বৃষ্টি আর শেষ সময়ের ঠাণ্ডাকে অগ্রাহ্য করে হাতের কাছে যে যা পেল, সেই অস্ত্র নিয়ে ভোরের মধ্যে হাজার হাজার কৃষক কর্মীর এক জঙ্গী বাহিনী জমায়েত হয়ে গেল খাঁপুর গ্রামে।

গাড়ি বেরোনোর ডিস্টিক্ট্র বোর্ডের রাস্তায় তারা একটা নিম গাছ কেটে ব্যারিকেড্ তৈরি করল। আধিয়ার-কৃষক–খেতমজুররা রুখে দাঁড়ালো - গ্রেপ্তার করে কাউকে নিয়ে যাওয়া যাবে না।

তখন সকাল হয়ে গিয়েছে। ভিড় আরও বাড়ছে। চলছে উচ্চকিত শ্লোগান। টিপ্টিপ্ বৃষ্টির বিরাম নেই।

পুলিস ভয় পেয়ে গেল। তারপর উঠল প্রচণ্ড হিংস্র হয়ে। কিন্তু সংগ্রামীরা ভয় পেল না এতটুকুও। পুলিশ বীরাঙ্গনা মা যশোদাকে গুলি করে হত্যা করল। এই মর্মান্তিক দৃশ্য দেখে, পেশায় খেতমজুর, তেভাগা লড়াইয়ের অন্যতম নেতা চিয়ারসাই শেখ, পাশেই তাঁর বাড়ি থেকে শাবল নিয়ে এসে পুলিসভ্যানের চাকার উপর আঘাত করতে থাকলেন। তাঁকে পর পর তিনটি গুলি করে হত্যা করল হিংস্র পশুর দল।

কৃষকরা ক্ষেপে উঠল। পুলিস এলোপাথারি ১২১ রাউণ্ড গুলি চালাল। পাশের জমিদারের সিংহবাহিনী কাছারি থেকেও গুলি চালানো হয়েছিল। ঐ খানেই ১৪ জন কমরেড শহীদ হলেন। পরে বালুরঘাট হাসপাতালে আরও ৮ জনের জীবনদীপ নিভে গেল।

এই একটি গ্রাম খাঁপুরেই, তেভাগার লড়াইতে ২২ জন কমরেড, শহীদের মহান মৃত্যুবরণের মধ্য দিয়ে অমরত্ব লাভ করলেন।



তেভাগার শিক্ষা

শ্রেণী-দাবির সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী স্বাধীনতার দাবিকে যুক্ত করে, নিবেদিত প্রাণ শ্রেণীচ্যুত সাম্যব্রতীরা তেভাগার মহান সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আর শামিল হয়েছিলেন, কষ্টময় জীবন অতিবাহিত করতেন যাঁরা, তার থেকেও বেশি কষ্টকে স্বীকার করে, অসংখ্য কর্মী। তাঁদের অন্তরে ছিল তীব্র শ্রেণী-ঘৃণা। সবাই মিলে তাঁরা সাম্প্রদায়িকতার বিষদাঁতকেও ভেঙে দিয়েছিলেন। ধ্বংস করে দিয়েছিলেন বিচ্ছিন্নতাবাদের কীটগুলোকেও। মন্বন্তর থেকে তেভাগা –এই কালপর্বে গড়ে উঠেছিল প্রগতিবাদী নাটক, গান, লোকগান, চিত্রকর্ম ইত্যাদি মহতি সংস্কৃতি। এ সব প্রসঙ্গ শুধু খাঁপুর নিয়ে নয়। সারা বাংলার তৎকালীন কৃষক তথা তেভাগা আন্দোলনের সঙ্গী ছিল তা।

এখনও চলছে দ্রোহকাল। তাই বিষয় গুলো এখনও প্রাসঙ্গিক। বরঞ্চ বেশি করে প্রাসঙ্গিক।

তেভাগার বাংলা—বর্তমানের রাহূগ্রস্ত বাংলা

তেভাগার সময়কার বাংলার একটা চিত্র- ধারণা করা যায়, পাঠক ইতোমধ্যে কিছুটা হলেও পেয়েছেন।

এখন সাম্রাজ্যবাদী নীল নক্সা অনুযায়ী, অষ্টম বিধানসভা নির্বাচনের পর আরও বেশি মাত্রায়, এ বাংলায় চলছে মারণ সন্ত্রাস। খুন, জরিমানা, অপমান, নিহত হতে প্ররোচনা দেওয়া, লুঠতরাজ, ধর্ষণ, ঘর পুড়িয়ে দেওয়া, বাড়িঘর ছেড়ে থাকতে বাধ্য করা, মিথ্যা মামলায় জেলে ঢুকিয়ে রাখা, পার্টি অফিস আর গণসংগঠনের অফিস দখল করা সমানে চলছে। এসব নারকীয় সন্ত্রাস চলছে বামপন্থীদের উপর । বামপন্থীদের উপর শুরু হওয়া এই আক্রমণ প্রসারিত হচ্ছে গণতান্ত্রিক অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির উপর। এমন কী শাসক জোটের অপর জোট সঙ্গীর উপর। এমন কী নিজ দলের উপর। শ্রমিক-কর্মচারীদের সংগঠিত হওয়ার ও দাবিদাওয়ার আন্দোলনকে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। ফ্যাসিস্তরা তাদের রীতি অনুযায়ী দু্ষ্কাণ্ডের পর দুষ্কাণ্ড ঘটিয়ে চলেছে।

যুক্তফ্রন্ট ও বামপন্থী সরকারের আমলে যে সাফল্যগুলো অনেক সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছিল, একে একে সে সবকে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, ধ্বংস করা হচ্ছে। পাট্টাপ্রাপক জমির অধিকার পাওয়া কৃষককে করা হচ্ছে উচ্ছেদ, উচ্ছেদ করা হচ্ছে বর্গাদারকে, উচ্ছেদ করা হচ্ছে নির্বিবাদে যে জমি চাষ করছে তাকে, প্রতিদিন আত্মহত্যা করছে কৃষক, অনাহারে মারা যাচ্ছে মজদুর, বেতন, পেনশন বন্ধ হয়ে গিয়েছে শ্রমিক-কর্মচারীদের, ভাতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে, হচ্ছে বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের, হাসপাতালে হাসপাতালে চলছে শিশুমৃত্যুর মিছিল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চলছে হামলার পর হামলা,পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকে করে দেওয়া হচ্ছে পঙ্গু। সমস্ত অংশের মানুষের জীবনকে তছ্নছ্ করে দেওয়া হচ্ছে। সরকারের প্রত্যক্ষ মদতে চলছে গুণ্ডাশাহী। জঙ্গলমহল, পাহাড় এলাকায় লাগানো হয়েছে বিষবৃক্ষ। বঞ্চনা করা হচ্ছে তফসিলী জাতি-উপজাতি, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে। তছ্নছ্ করে দেওয়া হচ্ছে সমস্ত অংশের সাধারণ মানুষের জীবনকে। অনাচারের তালিকা ক্রমবর্ধমান। আর ক্রমবর্ধমান অনর্গল মিথ্যার বেসাতি। একটা স্বৈরতান্ত্রিক ধরনের সরকার চলছে এই বাংলায়।

কিন্তু প্রতিবাদী মানুষ লড়াই জারি রেখেছেন। এ লড়াই আরও বাড়বে।

যুগ ও জীবন লড়াইয়ের ডাক নিয়ে এসেছে। দল নির্বিশেষে, শ্রেণী-দৃষ্টিভঙ্গিতে গরিবের ঐক্যকে জোরদার করে, গণতান্ত্রিক শক্তির সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে জনগণকেন্দ্রিক কাজকর্মকে অনেকগুণ বাড়িয়ে, যা গরিব মানুষ, সাধারণ মানুষ অর্জন করেছিল, তা রক্ষার জন্য লড়াই গড়ে তুলতে হবে। জনগণের মধ্যে আমাদের কাজকর্মকে বাড়াতে হবে। জনগণের মধ্যে আবার বেশিরভাগ খেতমজুর, গরিব কৃষক ও অসংগঠিত ক্ষেত্রের মজদুর। এই অংশের মানুষকে ভিত্তি করেই, শ্রেণী-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমাদের গণআন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। লড়াই গড়ে তুলতে হবে গণতন্ত্রের জন্য। লড়াই গড়ে তুলতে হবে সন্ত্রাস মোকাবিলার জন্য। লড়াই গড়ে তুলতে হবে, জনবিরোধী স্বৈরতান্ত্রিক অপ শক্তিকে পরাভূত করার জন্য। লড়াই গড়ে তুলতে হবে প্রগতির জন্য। তীব্র লড়াই।

এবারকার খাঁপুর তেভাগা শহীদ দিবস এই ডাক নিয়ে আমাদের সামনে উপস্থিত হয়েছে।