নির্লজ্জ মিথ্যার বেসাতি

রাজ্যে পরিবর্তনের বর্ষপূর্তি হয়ে গে‍ছে। মহা ধুমধাম সহকারে পালিত হয়েছে বর্ষপূর্তির ‘রাজসূয় যজ্ঞ’। নানা উৎসবের ঘনঘটায় খরচ করা হয়েছে দেদার অর্থ। সংবাদমাধ্যমেও বিজ্ঞাপনের ছড়াছড়ি। এতসব কাণ্ডকারখানা দেখে বিশ্বাস করার উপায় নেই যে রাজ্যে কোনরকম আর্থিক সঙ্কট আছে। বর্ষপূর্তিতেই মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করে দিয়েছেন ভোটের আগে যা যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তার ৯০ শতাংশ পূরণ হয়ে গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নাকি প্রতিশ্রুতির থেকেও বেশি কাজ হয়েছে। অর্থাৎ পাঁচ বছরে যে কাজ করার কথা নতুন সরকার এই বছরেই তা সেরে ফেলেছে। অতএব বাকি চার বছর তাদের গলাবাজি করে আর গায়ে হাওয়া লাগিয়ে চলার কথা। বস্তুত তেমনটাই হচ্ছে। বর্ষপূর্তির উৎসব শেষ হতেই মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে নেতা মন্ত্রীরা মেতে উঠেছেন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে। অকারণ ও অনাবশ্যক জটিলতা ও বিতর্ক তৈরি করে নীতিহীন রাজনীতি শুরু করেছে তৃণমূল। এই সুবাদে বেশ কিছুকালের জন্য রাজ্য সরকারের কাজ শিকেয় উঠেছে। সরকারে যেহেতু একজনই ‘কাজ’ করেন, বাকিরা মাথা নাড়েন তাই এখন ‘বামুন গেছে ঘর লাঙল তুলে ধর’ অবস্থা। গত এক মাস ধরে রাজ্যের কাজ ছেড়ে মুখ্যমন্ত্রী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক খেলা খেলছেন। চমকের পর চমকে মানুষকে বিভ্রান্ত করে চলেছেন যাতে রাজ্যের উন্নয়ন নিয়ে মানুষ মাথা না ঘামায়।

পাঁচ বছরের কাজ এক বছরে শেষ করার গল্প বিশ্বাসযোগ্য করতে গিয়ে রাজ্যে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব আসছে বলে শোনানো হচ্ছে। কথায় কথায় লম্বা লম্বা অঙ্কের তথ্য প্রচার হচ্ছে। পুস্তিকা প্রকাশ করে বহু কারখানার কথা বলা হচ্ছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে পুস্তিকা প্রকাশ করে যে সব তথ্য প্রচার করা হয়েছে সরকারী তথ্য পরিসংখ্যানের সঙ্গে তার মিল নেই। এ‌মন কি বিধানসভায় মন্ত্রীরা যেসব তথ্য দিচ্ছেন তার সঙ্গেও মিলছে না প্রচার পুস্তিকার তথ্য। এর থেকে পরিষ্কার মন্ত্রী-নেতারা বাইরে যা বলছেন বা প্রচার করছেন তা ভেজা‍‌লে ভরা। সম্প্রতি বিধানসভায় শিল্পমন্ত্রীর বক্তব্য থেকে এটা পরিষ্কার হয়ে গেছে। বর্ষপূর্তির বিজ্ঞাপনী প্রচারে বলা হয়েছিল এক বছরে ১৭৬টি শিল্প প্রকল্পে লক্ষাধিক কোটি টাকার প্রস্তাব এসেছে। অথচ বিধানসভায় শিল্পমন্ত্রী জানালেন ১২৮টি শিল্প প্রকল্পের প্রস্তাবে ৮০ হাজার কোটি টাকার কথা। প্রচারে বলছেন এক বছরের বহু কারখানা হয়ে গেছে, লক্ষ লক্ষ মানুষ তাতে কাজ পেয়েছেন। কিন্তু বিধানসভায় প্রস্তাবিত প্রকল্পগু‍‌লি সম্পর্কে বিস্তারিত কিছুই জানাতে পারলেন না মন্ত্রী। প্রস্তাবগুলি নিছকই প্রস্তাবেই আছে নাকি সেগুলি অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় আছে কিছুই বলতে পারলেন না। এমনকি বলা গেল না কোন্‌ জেলার কোন্‌ কোন্‌ জায়গায় প্রকল্পগুলি হচ্ছে বা হবে। তাতে কত কর্মসংস্থান হবে, কবে চালু হবে তাও অন্ধকারেই রয়ে গেল। প্রকল্পগুলি যে কিছুই এগোয়নি মন্ত্রীর আচরণে সেটাই প্রমাণ হলো। আসলে সরকারের শিল্পনীতি নিয়ে সন্দেহ, সংশয় বাড়ছে। শিল্পের জমি কোথা থেকে কিভাবে আসবে তাও অজানা। ফলে প্রস্তাব এলেও বিনিয়োগে তেমন কোনো উৎসাহ নেই বিনিয়োগকারীদের। সম্প্রতি শিল্পমন্ত্রীর সঙ্গে বণিকসভার বৈঠকে শিল্পমহল ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একথাই শুনিয়েছে মন্ত্রীকে। সত্য এটাই! বাকিটা নেহাতই প্রচারের জন্য গল্প।