বিভাজন নয়

রাজ্য সরকারের নতুন নতুন সিদ্ধান্তের ফলে সিঙ্গুরকে ঘিরে জটিলতা বাড়ছে। সিঙ্গুর নিয়ে হাইকোর্টের সর্বশেষ রায় ঘোষণার কিছুদিন আগে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি ঘোষণা করেছিলেন, মামলার মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত ‘অনিচ্ছুক’ জমিদাতা কৃষকদের মাসে ১ হাজার টাকা ভাতা এবং ২ টাকা কেজি দরে চাল দেওয়া হবে। গত মাসে কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিসন বেঞ্চে রাজ্য সরকারের সিঙ্গুর আইনকে ‘অবৈধ’ এবং ‘অসাংবিধানিক’ বলে ঘোষণা করে। এই ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় রাজ্য সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, অনিচ্ছুক জমিদাতাদের ভাতা মাসে বাড়িয়ে ২ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে। সেই সঙ্গে ২ টাকা কেজি দরে চালও দেওয়া হবে। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে, এই অন্তর্বর্তীকালীন ভাতা দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার কেন বিভাজনের নীতি নিয়েছে? সমস্যার চূড়ান্ত মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত সিঙ্গুরের সব জমিদাতারা কেন এই অর্ন্তবর্তীকালীন সাহায্য পাবেন না? জমিদাতাদের সঙ্গে যুক্ত বর্গাদার, পাট্টাদার, খেতমজুরদেরও কেন এই সাহায্য দেবে না সরকার? সিঙ্গুরের জমিতে যেখানে শিল্প স্থাপিত হয়নি সেখানে ইচ্ছুক ও অনিচ্ছুকদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টির কি কোনো অর্থ রয়েছে? অর্থ আর চাল দেওয়া কি আদৌ জমিদাতাদের স্বার্থে? নাকি সমস্যা সমাধান করতে না পেরে রাজনৈতিক চমক দিচ্ছে রাজ্য সরকার? সিঙ্গুরে টাটা মোটরস কারখানার ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পরেও তৃণমূল নেত্রী তথা বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী ৪০০ একর জমি ফেরতের দাবিতে অটল ছিলেন। ফলে এই টানাপড়েনের মধ্যে সিঙ্গুরের কারখানা চলে যায় গুজরাটের সানন্দে।

সিঙ্গুরের মোট অধিগৃহীত ৯৯৭.১১ একর জমির মধ্যে ক্ষতিপূরণ না নেওয়া চাষীদের জমির পরিমাণ ১৫৭ একর। অনিচ্ছুক চাষীদের জমির পরিমাণ কোনো অঙ্কেই ৪০০ একর নয়। অথচ সিঙ্গুর আইনে ৪০০ একর জমি হস্তান্তর করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। যারা জমি দিয়ে ক্ষতিপূরণ নিয়েছিলেন তাঁরা বা তাঁদের পরিবার শিল্প স্থাপিত হলে চাকরি বা সংশ্লিষ্ট অন্য সুবিধাও পেতে পারতেন। তৃণমূলের বাধার ফলে সেই শিল্প স্থাপিত না হওয়ায় ‘ইচ্ছুক’ কৃষকরাও সম্পূর্ণ সুবিধা পাননি। শিল্প বা কৃষি কোনোদিক থেকেই সিঙ্গুরের ঐ জায়গা ব্যবহৃত হচ্ছে না। সিঙ্গুরের সব জমিদাতা এবং জমির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরই রাজ্য সরকারের অন্তর্বর্তীকালীন সাহায্য পাওয়ার অধিকার রয়েছে। ক্ষমতায় আসার কয়েকদিনের মধ্যে তড়িঘড়ি আইন তৈরি করে সমস্যা সমাধান হয়ে গেল বলে ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। কিন্তু কার্যত ঐ আইন সমস্যাকে আরো জটিল করে তুলেছে। মমতা ব্যানার্জি সিঙ্গুরে শিল্প স্থাপন বা জমি ফেরত কোনো কাজই করতে পারেননি। সিঙ্গুরে রেলের কারখানা করা হবে বলে বামফ্রন্ট সরকারের আমলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জি। বর্তমানে রেলমন্ত্রক ও রাজ্য সরকার দুইয়ের ক্ষমতা হাতে থাকা সত্ত্বেও সেই প্রতিশ্রুতি কার্যকর করতে পারেননি তৃণমূল নেত্রী। সব মিলিয়ে প্রতিশ্রুতির বন্যা, অবরোধের রাজনীতি এবং বাস্তবতাহীন সস্তা চমকের মধ্য দিয়ে সিঙ্গুরবাসীকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে তৃণমূল সরকার। রাজ্য সরকারের পদক্ষেপগুলির ফলে সিঙ্গুরের মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়নের পরিবর্তে সাধারণ মানুষের মধ্যে ঘটছে বিভাজন। সরকারের উচিত এ পি এল, বি পি এল, ইচ্ছুক-অনিচ্ছুকের ছাপ সরিয়ে সবাইকে সাহায্য করা।