পাহাড়ে ভোটের নামে প্রহসন!

পাহাড় নাকি হাসছে! কেমন হাসছে তা গত ক‍‌য়েকদিন ধরে হাড়ে হাড়ে টের পা‍‌চ্ছেন সি পি আই (এম) নেতা-কর্মীরা। মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন পাহাড়ের সমস্যা তিনি মিটিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু পাহাড়ের কোন্‌ সমস্যা তিনি মিটিয়েছেন তা স্পষ্ট নয়। তেমনি গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা যে মূল দাবি নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে পাহাড়ে আন্দোলনের নামে নৈরাজ্য কায়েম করেছে, সেই দাবি থেকে তারা একচুলও নড়েনি। যে চুক্তির ভিত্তিতে জি টি এ গঠন এবং আগামী ২৯শে জুলাই জি টি এ-র প্রথম নির্বাচন, সেই চুক্তিতে স্বাক্ষর করার পরই গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা পরিষ্কার জানিয়ে দেয়, পৃথক গোর্খাল্যান্ডের দাবি তাদের বহাল থাকবে এবং সেই দাবিতে আন্দোলন চলবে। বস্তুত যেভাবে চুক্তির বয়ান লেখা হয়েছে তাতে পরিষ্কার যে, তৃণমূলের সঙ্গে মোর্চার গোপন বোঝাপড়া হয়েছে। অনেকটা ‘গিভ অ্যান্ড টেক’ নীতির মতোই তারা কাছাকাছি এসেছে এবং একে অন্যের মুখরক্ষার জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রথমত, আগের ‘ডি জি এইচ সি’ নাম বদলে ‘জি টি এ’ করার মধ্য দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী পৃথক গোর্খাল্যান্ডের প্রচ্ছন্ন বার্তা দিয়ে রেখেছেন। ‘দার্জিলিঙ’ কথা বাদ দিয়ে ‘টেরিটোরিয়াল’ কথা যুক্ত করে স্বাতন্ত্র্যের অর্থাৎ পৃথকের স্বীকৃতি পেয়ে মোর্চা খুশি। কারণ দাবির পথে অল্প হলেও কিছুটা এগনো গেছে। তেমনি তরাই-ডুয়ার্সের অঞ্চল যুক্ত করা বিষয়েও মোর্চাকে আশ্বস্ত করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। সমতলের অঞ্চল যুক্ত করার জন্য কমিশন গঠন, তার রিপোর্ট তৈরি, রিপোর্ট পর্যালোচনার জন্য ফের কমিটি গঠন ইত্যাদি প্রক্রিয়া চলছে। পাহাড়ের সঙ্গে সমতলকেও যুক্ত করে জি টি এ-র পরিধি বিস্তার পৃথক গোর্খাল্যান্ডের দাবিকেই একরকম স্বীকৃতি দেয়। অর্থাৎ মোর্চার দাবির প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে তাদের দাবি আদায়ের পথে কিছু ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মোর্চা নেতাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছেন। তারই বিনিময়ে মোর্চা তাদের নৈরাজ্যের আন্দোলন কিছুটা স্তিমিত করে বা স্থগিত রাখে। আর একেই মুখ্যমন্ত্রী পাহাড়ের সমস্যা মিটে গেছে বলে দাবি করছেন আর রাজ্যজুড়ে হোর্ডিং দিয়ে জানাচ্ছেন ‘পাহাড় হাসছে’।

পাহাড়ের সমস্যা যদি মিটেই গিয়ে থাকে এবং পাহাড় যদি হাসতে শুরু করে তাহলে পাহাড়জুড়ে এত আতঙ্ক, ভীতি, অনিশ্চয়তা কেন? কেনই বা পাহাড়ের সাধারণ মানুষের মুখে হাসির বদলে কপালে দুঃশ্চিন্তার ভাঁজ। আসলে পাহাড়ে সমস্যা কিছুই মেটেনি। তৃণমূল কংগ্রেস এবং মোর্চা উভয়ের মুখ রক্ষার জন্য আপাতত সন্ধি হয়েছে। যাতে নিজেদের জয় দেখিয়ে মোর্চা ক্ষয়িষ্ণু জনসমর্থন ও সংগঠন ধরে রাখতে পারে। অন্যদিকে মমতা ব্যানার্জি যাতে তাঁর সাফল্যের ধ্বজা ওড়াতে পারেন। এখন নির্বাচন ঘনিয়ে আসতে পরিষ্কার হয়ে গেছে পাহাড়ে শান্তি, সম্প্রীতি ও গণতন্ত্রের কণামাত্রও ফিরে আসেনি। মোর্চাবিরোধী কোনো রাজনৈতিক শক্তি বা গণতান্ত্রিক শক্তির প্রকাশ্যে মত প্রকাশের বা সঙ্ঘবদ্ধ হবার অধিকার পাহাড়ে আজও নেই। কেন্দ্রীয়ভাবে শহরে কোনো সভা হয়তো করা যায়, ঘরে বসে হয়তো বিবৃতি দেওয়া যায় কিন্তু তার বেশি নয়। গ্রামে গঞ্জে, পাড়ায় পাড়ায় কোনো মোর্চাবিরোধী শক্তির রাজনৈতিক কার্যকলাপে অংশ নেওয়া কার্যত নিষিদ্ধ, তা বন্ধ করার জন্য যে কোনো ধরনের নিকৃষ্ট মানের কাজে নামতে দ্বিধা নেই মোর্চার। তারা পাহাড়ে মোর্চা ছাড়া অন্য কোনো শক্তির অস্তিত্ব বরদাস্ত করবে না। এই জন্যই পাহাড়ে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার খর্বিত। এই পরিস্থিতির জন্যই নির্বাচনে বেশিরভাগ রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক শক্তি নির্বাচনে যোগ না নেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সমস্ত ভয়ভীতি, আক্রমণ-সন্ত্রাস উপেক্ষা করে সি পি আই (এম) প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছে পাহাড়ে গণতন্ত্র, শান্তি ও উন্নয়নের স্বার্থে। লক্ষণীয়, তৃণমূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও তাদের কোনো সমস্যা নেই। কারণ উভয়পক্ষের মধ্যে বোঝাপড়া রয়েছে। ‘শান্ত পাহাড়ে’ গণতন্ত্রের ঢ্যাঁড়া পেটানোর স্বার্থেই তণৃমূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। মোর্চা আগেই জানিয়ে দিয়েছে সব আসনেই জিতবে তারা। এরজন্য তৃণমূলকে সাক্ষী রেখে ভোটকে প্রহসনে পরিণত করতে তারা বদ্ধপরিকর।

Featured Posts

Advertisement