দেরিতে হলেও ভালো

তেল ও গ্যাস-সমৃদ্ধ মধ্য এশিয়ায় ভারত এখন পা রাখার জন্য সক্রিয়ভাবে চেষ্টা করছে। তবে অনেক দেরি হয়ে গেছে। মধ্য এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে রয়েছে ভারতের ঐতিহাসিক সম্পর্ক। যেমন বাবরের নাম উল্লেখ করলে মনের কোণে ভেসে উঠবে উজবেকিস্তানের কথা। বৈরাম খান মানে তুর্কমেনিস্তান। এইভাবে ইতিহাসের স্মৃতির কুয়াশায় ঢাকা পড়ে গেছে কাজাখস্তান, তাজিকিস্তান। একসময় এরা সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্গত ছিলো। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপর্যয়ের পর সব আলাদা হয়ে যায়। এই দেশগুলিতে ৬.৫ কোটি মানুষের বাস। অথচ ভারত এই দেশগুলিকে কার্যত অবহেলাই করে গেছে। কিন্তু নয়াদিল্লি থেকে ঐ দেশগুলির রাজধানীতে বিমানপথে যেতে মাত্র কয়েকঘণ্টা সময় লাগে। তা সত্ত্বেও ঐ দেশগুলির সঙ্গে ভারত কিন্তু আশানুরূপ সম্পর্ক বাড়ায়নি। কিন্তু তাই বলে অন্যান্য দেশগুলি বসে নেই। যেমন মধ্য এ‍‌শিয়ার সঙ্গে চীনের বাণিজ্যিক লেনদেনের পরিমাণ ২৯০০ কোটি ডলার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক লেনদেনের পরিমাণ ২৬০০ কোটি ডলার। অপরদিকে ভারতের ক্ষেত্রে এই পরিমাণ মাত্র ৫০ কোটি ডলার। তবে এর মধ্যে কাজাখস্তানের সাতপায়েভ অয়েল ব্লক এবং তুর্কমেনিস্তান-আফগানিস্তান-পাকিস্তান-ভারত (তাইপে) গ্যাস পাইপলাইনের জন্য ভারতের বিনিয়োগকে ধরা হয়নি। এই পাইপলাইন চালু হতে ৫ বছর সময় লাগবে। সুতরাং ভারতকে যদি মধ্য এশিয়ায় শক্তপোক্তভাবে পা রাখতে হয় তাহলে আরো ভেবেচিন্তে সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়ে এগোতে হবে। ভারত দু’দশক আগে এই অঞ্চলে কাজ করার ভালো সুযোগ পেয়েছি‍‌লো। কিন্তু তখন তা ভারত হাতছাড়া করেছে। তবে আবার চেষ্টা শুরু হয়েছে। সরকারী উদ্যোগের পাশাপাশি ভারতের কর্পোরেট ক্ষেত্রকেও এগিয়ে আসতে হবে। তবে বলা হয়ে থাকে ভারতীয় কোম্পানিগুলি অনেক সময় ঝুঁকি নিতে ভয় পায়।

তবে ব্যবসা-বাণিজ্যের এই সুবর্ণ সুযোগ পায়ে ঠেলা উচিত হবে না। মধ্য এ‍‌শিয়া যে তেল ও গ্যাসের মতো প্রাকৃতিক সম্পদসমৃদ্ধ তা ভারত সরকার জানে না, এমন নয়। কিন্তু এখানেও উদ্যোগের অভাব। অপরদিকে চীন, রাশিয়া এবং মার্কিনী ও পশ্চিমী বহুজাতিক তেল কোম্পানিগুলি তেল ও গ্যাসের পাইপলাইনের নেটওয়ার্ক তৈরি করে ঐ বহুমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ নিজেদের বাজারে নিয়ে যাচ্ছে। চীন বিশেষ করে ব্যবহার করছে কাজাখস্তান এবং তুর্কমেনিস্তানের তেল ও গ্যাস। কারণ তাদের দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতির চাহিদা মেটাতে প্রচুর জ্বালানি প্রয়োজন। কাজাখস্তানে তেল বিক্রির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় সেখানে মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতাও বেড়েছে। কাজাখস্তানে নাগরিকদের বছরে মাথাপিছু জিডিপি (মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন)-র পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩,০০০ ডলার। মধ্য এশিয়ায় কাজাখস্তান হলো সবচেয়ে ধনী দেশ। কাজাখস্তানের রাষ্ট্রপতি নূরসুলতান নাজাবায়েভ ২০০৯ সালে ভারতে এসেছিলেন সাধারণতন্ত্র দিবস উপলক্ষে। তখনই তিনি সাতপায়েভ অয়েল ব্লকের ২৫ শতাংশ ভারতকে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। সেই অনুসারে ভারত ঐ অয়েল ব্লকে বিনিয়োগ করেছে। চীন ও আমেরিকার দু’টি কোম্পানিও এখানে বিনিয়োগ করেছে। এদিকে আফগানিস্তান থেকে ২০১৪ সালে মার্কিনী ও অন্যান্য বিদেশী সেনা চলে যাওয়ার কথাবার্তা চলছে। এই পটভূমিতে দাঁড়িয়ে ভারত তার বিদেশে থাকা একমাত্র সামরিক ঘাঁটিকে (তাজিকিস্তানের ফাকহোরে অবস্থিত) আরো উন্নত করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এ ব্যাপারে কথা বলতে আগস্টে তাজিকিস্তানের বিদেশ মন্ত্রকের অফিসারেরা ভারতে আসছেন। এরপর ভারত সফরে সেপ্টেম্বরে আসছেন তাজিকিস্তানের রাষ্ট্রপতি প্রমোমালি রাখমন। যাইহোক বরফ গলছে। দেরিতে হলেও ভালো। কিন্তু এসব দেখে আ‍‌মেরিকা কি চুপ করে বসে থাকবে?