আবার জালিয়াতি, জোর করে
হারানো হলো বক্সার মনোজকে

সংবাদ সংস্থা

লন্ডন, ৫ই আগস্ট— চ্যাম্পিয়নের মতো লড়েও রিংয়ের বাইরের প্রতিপক্ষের হাতে ভারতীয় বক্সারদের ধরাশায়ী হওয়ার ধারা সমানে চলছেই। বিচারকদের অবিচারের শিকারের তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন মনোজ কুমার। লাইট ওয়েল্টারওয়েট (৬৪কেজি) বিভাগের প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে ভারতীয় বক্সারের ঝুলি থেকে একের পর এক পয়েন্ট চুরি করে জিতিয়ে দেওয়া হলো ২০১২লন্ডন ওলিম্পিক্সের আয়োজক দেশের প্রতিনিধি থমাস স্টকারকে। তিন রাউন্ডের বাউট শেষে উপস্থিত সবাইকে চমকে দিয়ে ব্রিটিশ বক্সারের পক্ষে বাউটের স্কোর ঘোষিত হলো ২০-১৬। দুরন্ত লড়েও মাঠে মারা গেলো কমনওয়েলথ গেমসে সোনা জয়ী তারকার ওলিম্পিক্স পদকের স্বপ্ন। সুমিত সাংওয়ান ও বিকাশ কৃষ্ণানের পথ ধরে মনোজও তলিয়ে গেলেন হতাশার আঁধারে।

বিশ্ব বক্সিংয়ের নয়া ‘পাওয়ার হাউস’ হিসেবে গত দু-তিন বছরে একেবারে সামনের সারিতে উঠে এসেছে ভারত। বেজিঙ গেমসে বিজেন্দার সিংয়ের ব্রোঞ্জ জয়ের প্রেরণাকে সামনে রেখে স্বাভাবিক ভাবেই এবার তৈরি হয়েছিলো একাধিক বক্সিং পদকের সম্ভাবনা। লন্ডনের এক্সেল অ্যারেনায় ভারতীয় বক্সারদের লড়াইয়েও ফুটে উঠেছে আশার আলোকরেখা। কিন্তু মনোজ, বিকাশ, সুমিতদের সেই ঝলমলে পারফরম্যান্স নিমেষে ঘোলাটে হয়ে গিয়েছে পক্ষপাতিত্বের বিষে। তাই আন্তর্জাতিক বক্সিং অ্যাসোসিয়েশন এবং আমেরিকা, ব্রিটেনের মতো বক্সিংয়ে ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়া প্রভাবশালী দেশগুলির আঙুলের ইশারায় বিজয়ী ঘোষিত হয়ে যাওয়ার পরও অবিশ্বাস্য ভাবে হারের তকমা পরতে হয়েছে বিকাশকে। আবার রিংয়ে সারাক্ষণ কর্তৃত্ব দেখিয়েও রহস্যজনক ভাবে সুমিতের মতোই হার মানতে হয়েছে মনোজকে। অথচ লাইট ওয়েল্টারওয়েটে স্টকারের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই সমানে পাল্লা দিয়ে ‘বক্স’ করেছেন ২৬বছর বয়সী এই ভারতীয়। কিন্তু প্রতি রাউন্ডের শেষে স্কোর বোর্ডে ফুটে উঠেছে দু’জনের মধ্যে বিস্তর পয়েন্টের ফারাক। দেখা যায় তুল্যমূল্য প্রথম দুই রাউন্ডে ব্রিটিশ বক্সার এগিয়ে গিয়েছেন যথাক্রমে ৭-৪, ৯-৫ ব্যবধানে। তবু হাল না ছেড়ে শেষ রাউন্ডে ভয়ানক আক্রমণের পথে গিয়ে মনোজ পান ৭-৪পয়েন্ট। কিন্তু তাতেও পক্ষপাতের আঁচড় মুছে ফেলা যায়নি।

লড়াই শেষে হতাশার ডুবে যায় ভারতীয় শিবির। দলের কিউবান কোচ ব্লাস ইগলেসিয়াস ফার্নান্ডেজ অসন্তোষ উগরে দিয়ে বলেন, ‘এখানে ঠিক কী চলছে কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না! এতো ভাল লড়েও প্রথম দুই রাউন্ডে কখনোই সাত পয়েন্টে পিছিয়ে পড়তে পারে না মনোজ। আমি নিশ্চিত ওকে বেশ কিছু ন্যায্য পয়েন্ট দেওয়া হয়নি। নইলে লড়াইয়ের ফল উলটো হতো। একে দিনে ডাকাতি ছাড়া আর কি-ই বা বলবো!’ বিধ্বস্ত মনোজ বলছেন, ‘জালিয়াতির শিকার হলাম আমি। লড়াই চলাকালীন একবারের জন্যও ভাবতে পারিনি শেষমেষ এ ভাবে হারিয়ে দেওয়া হবে। এভাবে বিদায় নিয়ে খুব খারাপ লাগছে।’ তারপরই তিনি যোগ করলেন, ‘ভারতীয় বক্সারদের প্রতি একের পর এক অবিচার দেখে মনে হচ্ছে না যে এটা ওলিম্পিক্সের আসর। এ যেন ঠিক কোন জেলার বক্সিং প্রতিযোগিতা, যেখানে জয়ের জন্য রিংয়ে পারফরম্যান্সের চেয়েও ঢের বেশি জরুরী রিংয়ের বাইরের অদৃশ্য পারফরম্যান্স।’

সুমিত এবং বিকাশের লড়াইয়ের পর সরকারী ভাবে প্রতিবাদ জানিয়েও কোন কাজ হয়নি। পত্রপাঠ প্রত্যাখ্যাত হয়েছে ভারতীয় দলের আবেদন। তাই মনোজের ক্ষেত্রে হতাশায় আর সেই পথে যাননি কর্তারা। দলের বর্ষীয়ান কোচ গুরবক্স সিং সান্ধুর মতে, ‘কী লাভ! সেই তো প্রতারিত হতে হবে। তাছাড়া বারবার আবেদন করে প্রত্যাখ্যাত হতে থাকলে গোটা বিশ্ব ভাববে, এরা আসলে হারটাকে হার বলে স্বীকার করতে জানে না। তাই প্রতি ক্ষেত্রে অভিযোগ জানিয়ে চলেছে।’

পর পর ভারতীয় বক্সারদের অবিচারের শিকার হওয়ার ঘটনায় বিচলিত দেশের প্রাক্তণ মহল। ২০০৬ কমনওয়েলথ গেমসে সোনা জয়ী অখিল কুমারের কথায়, ‘এই সব কারচুপির পথ প্রশস্ত করতেই এবারের গেমস থেকে নতুন স্কোরিং সিস্টেম চালু হয়েছে। যেখানে প্রতিটি পয়েন্টে তৎক্ষনাৎ স্কোর বোর্ডে না দেখিয়ে রাউন্ডের শেষে দেখানো হচ্ছে।’ বিশ্বকাপে দেশের প্রথম পদক জয়ী বক্সার ভি দেবরাজনের বক্তব্যেও একই সুর। বাংলার কমনওয়েলথ গেমসে সোনা জয়ী প্রাক্তন তারকা আলি কামারের মতে, এ ভাবে চললে শুধু বক্সিং নয়, ওলিম্পিক্সও তার মাহাত্ম্য হারাবে।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement