আমেরিকার ‘বন্দুক-সংস্কৃতি’

রবিবার সকালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিনের নিরালা এলাকায় এক গুরুদ্বারে এক প্রাক্তন মার্কিন সেনার এলোপাথাড়ি গুলিবর্ষণে ঘটনাস্থলেই কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে। ধর্মস্থানে এই ধরনের হামলা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত নিন্দনীয় ও ঘৃণ্য কাজ। গোটা বিশ্বই এই ঘটনার বিরুদ্ধে ধিক্কার জানিয়েছে। এটি কোনো বিক্ষিপ্ত গণহত্যার ঘটনা নয়। জেনেশুনেই এই বর্ণবিদ্বেষী ভয়ঙ্কর কাণ্ড ঘটিয়েছে প্রাক্তন মার্কিন সেনা ওয়েড মাইকেল পেজ। ৪০ বছর বয়সী এই খুনী ব্যক্তিটি একটি ‘‘শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী’’ সংগঠনের সদস্য। এশীয়দের প্রতি ভয়ঙ্কর বিদ্বেষ থেকে এই হত্যাকাণ্ড বলে অনুমান করা হচ্ছে। এই ঘটনা ভারতীয়দের কাছে আতঙ্কের বিষয়। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অসংখ্য ভারতীয় বাস করেন শিক্ষা ও জীবিকা অর্জনের জন্য। অনেকেই সেখানে কয়েক প্রজন্মের বাসিন্দা। তাঁরা তাঁদের মেধা ও পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সমৃদ্ধ করে যাচ্ছেন। শিখদের উপরে এই একতরফা আক্রমণের নিন্দা করে মার্কিন রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা মার্কিন অর্থনীতিতে শিখদের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা স্বীকার করেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শিখ সম্প্রদায়ের বসবাস ১২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী ভারতীয় সম্প্রদায়গুলির মধ্যে শিখরাই সবচেয়ে পুরানো বাসিন্দা। রবিবারের ঐ ঘটনা প্রমাণ করলো, আমেরিকায় অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসের মাত্রা ক্রমশ বাড়ছে। ঐ প্রাক্তন সৈনিকের হাতে উ‍‌ল্কিতে লেখা ছিল — ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর। প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি জর্জ বুশ সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মোকাবিলার ডাক দিয়ে শেষ পর্যন্ত সন্ত্রাসবাদকে নানাভাবে আসকারা দিয়েছেন। এখন তার খেসারৎ খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেই দিতে হচ্ছে। ১১ই সেপ্টেম্বরের পর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শিখদের অনেকবার শ্বেতাঙ্গ বর্ণবিদ্বেষীদের আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছে। যদিও এখনও পর্যন্ত তাদের কাছ থেকে সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায়নি, কেন সে ঐ আক্রমণ চালিয়েছিল। তবে এটা স্পষ্ট সে একটি বর্ণবিদ্বেষী সংগঠনের সদস্য। সে কোনো বিশেষ লক্ষ্য নিয়েই ঐ হত্যকাণ্ড ঘটিয়েছে।

এই ঘটনার সঙ্গে আরেকটি বিষয়ও অনিবার্যভাবে উঠে আসছে। তা হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মুড়ি-মুড়কির মতো আগ্নেয়াস্ত্রের সহজলভ্যতা। এই মারাত্মক দিকটির জন্য দায়ী হলো মার্কিন সরকারের নীতি। তারা কিছুতেই এই ‘গান-কালচার’—এ রাশ টানতে চায় না। মার্কিন রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা গুরুদ্বারে গুলি চালানোর নিন্দা করলেও ‘বন্দুক-সংস্কৃতি’ নিয়ে মুখ খোলেননি। মনের মধ্যে ঘৃণা বা বিদ্বেষ থাকলেও খালি হাতে খুন করা যায় না। কিন্তু হাতের মুঠোয় আগ্নেয়াস্ত্র থাকলে মানুষের আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠা সহজ। তাই মার্কিন সমাজে নানা ধরনের বৈষম্যের ও সঙ্কটের জন্য যে উত্তেজনার আবর্ত তৈরি হয়েছে তাতে হিংসাত্মক কার্যকলাপের প্রকোপ বাড়ছে। এই অবস্থায় সেখানকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উপরে যে নিয়ন্ত্রণ জারি করা দরকার, তা হচ্ছে না। সম্প্রতি ডেনভারের কাছে অরোরা সিনেমা হলে এইভাবে গণহত্যা হয়েছে। হত্যা করার চেষ্টা হয়েছে মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি গ্যাব্রিয়েল গিফোর্ডসকে। এর আগেও শোচনীয় ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছে মার্কিনী বন্দুকবাজেরা। পরিহাসের বিষয় হলো, গত বছর উইসকনসিনে বন্দুক পাওয়ার আইন আরো শিথিল করা হয়েছে। একদিকে ক্রমবর্ধমান বর্ণবিদ্বেষ, অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাস এবং অপরদিকে সহজেই হাতের মুঠোয় পাওয়া যাচ্ছে আগ্নেয়াস্ত্র। সামনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। তাই কঠিন বাস্তবের দিকে মুখ ফিরিয়ে থাকছে দুই বৃহৎ রাজনৈতিক দল।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement