আনুগত্য পুঁজির প্রতি

নির্বাচনের আগে পরিবর্তনের স্লোগান দিয়েছিলেন। ৩৪ বছরে বামফ্রন্ট যা কিছু করেছিল সবকিছু বদলে দেবেন ক্ষমতায় এলে। হঠাৎ করে কৃষকদরদী সেজে জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে নেমে পড়েছিলেন। রাজ্যের যেখানে যেখানে শিল্পায়নের কাজ চলছিল নানা অছিলায় সেগুলির কাজে বাধা দেওয়া বা বন্ধ করে দিতে যথেচ্ছ নৈরাজ্যের আশ্রয় নিয়েছিলেন। অটোচালকদের জন্য, হকারদের জন্য, শ্রমিকদের জন্য, কর্মচারীদের জন্য তাঁর দরদ উথলে উঠেছিল। এমন একটা ভাব দেখাতে শুরু করেন যে তাঁর মতো জনদরদী ভূ ভারতে নেই। ক্ষমতা দখলের জন্য তিনি একদিকে যেমন বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে অনর্গল মিথ্যা ও কুৎসা করে গেছেন অন্যদিকে নিজেকে সব সমস্যা সমাধানের যাদুকর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার মরিয়া প্রয়াস চালিয়েছিলেন। এহেন প্রচারে একটা অংশের মানুষ বিভ্রান্ত হয়েছিলেন। কেউ কেউ তাঁকে শুধু বিশ্বাস করেননি, ধরে নিয়েছিলেন তিনি হাত দিলেই সোনা ফলবে। শেষপর্যন্ত বাংলার দুর্ভাগ্য হলেও তিনি ক্ষমতায় এসেছেন। হয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু ক্ষমতা দখলের পর বছর ঘুরতে না ঘুরতেই তিনি অনেককিছু বদলে দিয়েছেন। গ্রামেগঞ্জে সরকারী-আধাসরকারী অফিসগুলিতে কাজের পরিকাঠামো ও পরিবেশের জন্য একটা পয়সা ব্যয় না করলেও নিজের অফিসটি সাজিয়েছেন বহুজাতিক সংস্থার কর্পোরেট অফিসের মতো। রাষ্ট্রায়ত্ত পরিবহন কর্মীদের বেতন, পেনশন আটকে দিলেও মন্ত্রী-বিধায়কদের বেতন বাড়িয়ে দিলেন তিন-চারগুণ। যে হকারদের জন্য আগে তিনি কেঁ‍‌দে কূল পেতেন না সেই হকারদের বিরুদ্ধে অগ্নিশর্মা হয়ে প্রকাশ্য রাস্তায় তাদের মারতে গিয়েছিলেন। যে অটোচালকদের জন্য তিনি মধ্যরাতে পূর্বতন মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ি কার্যত হামলা করতে গিয়েছিলেন এখন সেই অটোচালকরাই হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

এতকাল সবকিছু বদলে দেবার কথা বলেছিলেন। ক্ষমতায় এসে অনেককিছু বদলেও ফেলেছেন। কিন্তু দেখা যাচ্ছে তিনি নিজেও ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছেন। এতদিন যা যা বলেছিলেন, যেসব লম্বা লম্বা ভাষণ দিয়েছিলেন এখন সেসব আড়ালে চলে যাচ্ছে। নিজের পরিবর্তনটাই এখন বাস্তব হয়ে উঠছে। বলেছিলেন বিদ্যুতের দাম বাড়াবেন না। এখন ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে দফায় দফায় বাড়িয়েছেন দেড়গুণ। গোটাটাই নীরবে। বলেছিলেন পানীয় জলে কর বসাবেন না। এখন ভোল পালটে কর বসানোর প্রস্তাবসহ দিল্লিতে নতুন জলনীতির খসড়া পাঠিয়েছেন। এইভাবে একটার পর একটা পদক্ষেপে নিজের অবস্থান বদলে ফেলছেন। পেট্রোপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে আগে লোকদেখানো বিরোধিতা করতেন। এখন সেটাও ত্যাগ করেছেন। সর্বশেষ উদারনৈতিক সংস্কারের পথ ধরে জনগণের ওপর আরো বোঝা চাপানোর লক্ষ্যে এ ডি বি-র শর্তে ঋণ নিতে চলেছেন। ঋণের জন্য বামফ্রন্ট সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে এখন নিজেই যেখান থেকে পারছেন ঋণ নিচ্ছেন। অকাতরে দান-ধ্যান-পুরস্কার-সংবর্ধনা দিতে তাঁর প্রচুর টাকা দরকার। তার জন্য একদিকে যেমন ঋণ নিচ্ছেন অন্যদিকে সংস্কারের নামে কর কাঠামো বদলে জনগণের ওপর করের বোঝা বৃদ্ধি করতে যাচ্ছে। জল,‍‌ বিদ্যুৎ থেকে শুরু করে সর্বত্র পরিষেবা কর চাপানোর উদ্যোগ চলছে। বিপরীতে ব্যবসায়ীদের মুনাফার ক্ষেত্রে প্রশাসনকে শিথিল করছেন। ফলে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের বাইরে। বিনিয়োগের জন্য শিল্পপতিদের খুশি করতে দরাজ হাতে ছাড় দেবার কথা ঘোষণা করছেন। না, তিনি আর কৃষকের পাশে নেই। থাকলে কৃষকরা এতো সঙ্কটে পড়তেন না। তিনি নেই শ্রমিক-কর্মচারীদের পাশেও। যে সাধারণ মানুষের ‘কাছের লোক’ সেজে তাঁদের বিভ্রান্ত করেছিলেন, বিশ্বাস অর্জন করেছিলেন আজ তিনি তাদের থেকে দূরে স‍‌রে যাচ্ছেন। তিনি এখন অবস্থান বদলে দেশী-বিদেশী পুঁজির বিশ্বস্ত হতে চাইছেন। জনগণের স্বার্থের বিনিময়ে উদারনীতিকে আঁকড়ে ধরছেন।

Featured Posts

Advertisement