বিশ্বরেকর্ড গড়ে বাবার অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণ রুদিশার

সংবাদ সংস্থা

লন্ডন, ১১ই আগস্ট— বাবার অপূর্ণ স্বপ্ন পূর্ণ করার সঙ্কল্প নিয়ে লন্ডনে পা রেখেছিলেন তিনি। ফিরলেনও লক্ষ্য জয় করে। সঙ্গে ইতিহাসের পাতায় লিখে রেখে গেলেন নিজের নাম— ডেভিড রুদিশা। শুধু সোনাই জিতলেন না, সেই দুরন্ত অভিযানে বিশ্বরেকর্ডও গড়ে ফেললেন কেনিয়ার এই দৌড়বিদ। নিজের আলোকিত পারফরম্যান্সকে উৎসর্গ করলেন বাবা ড্যানিয়েল রুদিশাকে।

আসরে উসেইন বোল্টের আবির্ভাবের তখনও ঢের বাকি। কিন্তু লন্ডনের ওলিম্পিক্স পার্ক স্টেডিয়াম সেই রোমাঞ্চে কাঁপতে শুরু করে দিয়েছে। বোল্ট পারবেন? পারলেই ইতিহাস! আর সেই ইতিহাসের প্রত্যক্ষদর্শী হওয়ার শিহরণ! তারই মাঝে বোল্টের জন্য সাজিয়ে রাখা মঞ্চে হাজির হলেন তিনি। খানিক বাদে যে আলোয় উদ্ভাসিত হবেন বোল্ট, সেই আলো আগেই গায়ে মাখলেন ডেভিড রুদিশা। বাবার অতৃপ্ত স্বপ্নপূরণের দায়ভার নিয়ে ওলিম্পিক্সের লাল ট্র্যাকে পা রাখা কেনিয়ান যুবক গড়ে ফেললেন ইতিহাস। নতুন বিশ্ব রেকর্ড গড়ে জিতলেন পুরুষদের ৮০০মিটার দৌড়ের সোনা। সময় নিয়েছেন এক মিনিট ৪০.৯১সেকেন্ড। এই প্রথম ৮০০মিটারে মিনিটের পর সেকেন্ডের ঘরে চল্লিশে কেউ নামিয়ে আনলেন সময়।

২৩বছর বয়সী রুদিশার এমন পারফরম্যান্স আদৌ অপ্রত্যাশিত নয়। ৮০০মিটারের সেরা দশটি টাইমিংয়ের মধ্যে ছয়টিই এই কেনিয়ানের দখলে। উইলসন কিপকেটারের ১৩বছরের পুরানো রেকর্ড ভেঙেছিলেন ২০১০সালে। নিজের সেই রেকর্ড নতুন করে মুছে লিখতে বেশি দিন সময় নেননি তিনি। ওই বছরের আগস্টে মাত্র সাতদিনের ব্যবধানে নিজের বিশ্বরেকর্ড ভেঙেছিলেন দু’বার। তার দুই বছর পর আরেক আগস্টে খোদ ওলিম্পিক্সের আসর সাক্ষী থাকলো তাঁর নয়া কীর্তির। ৮০০মিটারে বিশ্ব রেকর্ড গড়ে সোনা জেতার সর্বশেষ কীর্তিটি ৩৬বছর আগের। তাই ৮০০মিটারের ফাইনালটাই ‘সর্বকালের সেরা’ হয়ে গেল কি না, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। কারণ, ফাইনালে দৌড়ানো আটজনের প্রত্যেকেই হয় নিজের সেরা টাইমিং কিংবা মরসুমের সেরা কিংবা জাতীয় রেকর্ড গড়েছেন। এক মিনিট ৪১.৭৩ সেকেন্ড টাইমিং নিয়ে রুপো জিতেছেন বোতসোয়ানার নাইজেল অ্যামস। ব্রোঞ্জ গিয়েছে রুদিশারই সতীর্থ টিমোথি কিটুমের দখলে।

ঐতিহাসিক সোনা জয়ের পর রুদিশা জানান, ইভেন্টের দিন সকাল থেকেই নাকি তাঁর মন বলছিল, কিছু একটা হবে। ‘আমি যে জিতব, এ নিয়ে কোনো সংশয় আমার মনে ছিল না। শুধু বিশ্বরেকর্ড ভাঙার জন্য ভালো একটা কন্ডিশনের অপেক্ষায় ছিলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলাম আবহাওয়া দুর্দান্ত। মনে হলো, স্পেশাল কিছু করেও ফেলতে পারি,’ বলছেন নায়ক।

এমনিতেই কেনিয়ার মাসাই গোষ্ঠীর দৌড়ের ট্র্যাকে যথেষ্ট সুনাম আছে। তা ছাড়া দৌড় তাঁর রক্তেই। বাবা ড্যানিয়েল রুদিশা ১৯৬৮-র ওলিম্পিক্সে ৪x৪০০ মিটার রিলেতে রুপো জিতেছিলেন। মা নাওমিও ছিলেন ৪০০মিটারের হার্ডলার। বাবাই তাঁর গুরু। ট্র্যাকে নামার আগে ঘুরেফিরে বাবার কথাই ভাবছিলেন অনুগত ছেলে। বলছেন, ‘রেস শুরুর আগে মনে হয়েছিল, দেশে বাবা টিভিতে কিভাবে আমাকে দেখছেন। তিনি তো আর এখানে আসতে পারেননি। তিনি সব সময়ই আমাকে উৎসাহ জুগিয়েছেন। তিনি না থাকলে আজ এ পর্যন্ত আসতেই পারতাম না। তিনি আমার কাছে অনেক বড় অনুপ্রেরণা। সব সময়ই স্বপ্ন দেখেছি ওলিম্পিক্সে তাঁর চেয়ে ভালো কিছু করার। তাঁর চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার।’

বাবার অধরা স্বপ্নপূরণের তৃপ্তিও ধরা পড়ল তাঁর কথায়, ‘বাবাকে সব সময়ই বলতে শুনেছি, ষাটের দশকে তিনি ৪০০ মিটারের বিশ্বরেকর্ড ভাঙার স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু পারেননি। তাঁরই ছেলে হিসেবে বিশ্বরেকর্ড ভাঙতে পারাটা আমার কাছে তাই অনেক বড় সম্মানের।’

বোল্টের সঙ্গে তাঁর সরাসরি দ্বৈরথ নেই। কিন্তু কিছুক্ষণের জন্য হলেও বোল্ট-রাজত্বে ভাগ বসানোর তৃপ্তিও ফুটে উঠলো রুদিশার কণ্ঠে, ‘বোল্ট আমার দেখা সেরা স্প্রিন্টার। মানুষ ওকে ভালোবাসে ওর দুর্দান্ত সাফল্য অর্জনের জন্যই। আমি জানতাম, ৮০০মিটারে স্পেশাল কিছু করতে পারলে সাময়িকভাবে হলেও লোকে আমাকে বিশেষ মর্যাদার আসন বসিয়ে দেবে।’

রুদিশার বাবা ড্যানিয়েল রীতিমতো উচ্ছ্বসিত। ছেলের কৃতিত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে চোখের কোণে জল ভরে যাচ্ছিল প্রাক্তন অ্যাথলিট বাবার। তাঁর কথায়, ‘আজ আমার জীবন ধন্য হয়ে গেলো। নিজের খেলোয়াড়ী জীবনের অপূর্ণ স্বপ্ন পূর্ণ হলো ছেলের হাত ধরে। এই আনন্দ ভাষায় বোঝানো যাবে না। আমি এবং ওর মা জীবনের সেরা পুরস্কারটা পেয়ে গেলাম।’ একটু থেমে তিনি যোগ করলেন, ‘রুদিশার গতির ব্যাপারে আমি বরাবর প্রত্যয়ী ছিলাম। জানতাম ওলিম্পিক্সে সোনা জিতবে। তবে বিশ্বরেকর্ড গড়াটা যেন সব প্রত্যাশাকে ছাপিয়ে গিয়েছে।’ ড্যানিয়েলের বিশ্বাস, রেকর্ড ভাঙাগড়ার খেলায় তাঁর ছেলেও একদিন নিজের ইভেন্টে কিংবদন্তী হয়ে উঠবে।

Featured Posts

Advertisement