ঘরের শত্রু বিভীষণ

বৃহস্পতিবার ভোরের দিকে পাকিস্তানের মিনহাস বিমানঘাঁটিতে বড় ধরনের সশস্ত্র হামলা চালা‍‌‍‌লো সন্ত্রাসবাদীরা। বিমানঘাঁটিটি কামরায় অবস্থিত। এই জায়গাটিতে পৌঁছাতে ইসলামাবাদ থেকে সড়কপথে দু’ঘণ্টা সময় লাগে। সেনারা অবশ্য সফলভাবে এই হামলার মোকবিলা করেছে। দু’পক্ষের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষে ন’জন সন্ত্রাসবাদীরই মৃত্যু হয়েছে। বলা হয়ে থাকে ঐ বিশাল বিমানঘাঁটির এক ধারে পরমাণু অস্ত্রের মজুতভাণ্ডার আছে। পাকিস্তান সরকার অবশ্য তা স্বীকার করতে চায় না। এই হামলার দায়িত্ব স্বীকার করে তেহরিক—ই—তালিবান পাকিস্তান (টি টি পি) বলেছে, আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনের হত্যাকাণ্ডের বদলা নিতেই এই আক্রমণ। তাদের দাবি, এই আক্রমণে এক ডজনেরও বেশি নিরাপত্তারক্ষীর মৃত্যু হয়েছে। ধ্বংস করা হয়েছে তিনটি জঙ্গী বিমান। পাকিস্তান বিমান বাহিনী অবশ্য বলেছে, একজন মাত্র সেনার মৃত্যু হয়েছে। মিনহাসের মতো কড়া নিরাপত্তার বিমানঘাঁটিতে এইভাবে সন্ত্রাসবাদীদের ঢুকে পড়ে অক্রমণ চালানোর ঘটনায় পাক সরকার ও সেনাবাহিনী বিচলিত হয়ে পড়েছে। পাক সেনা ঘাঁটিতে তালিবানী হামলা অবশ্য এই প্রথম নয়। গত বছরই করাচিতে পাক নৌ-সেনাদের ঘাঁটি আক্রমন করে তালিবান জঙ্গীরা। উত্তর পাঞ্জাবের অ্যাটক জেলায় কামরার এই বিমানঘাঁটির কাছে ২০০৭ এবং ২০০৯ সালে আক্রমণ চালানো হয়েছিল। তবে মিনহাস বিমানঘাঁটিতে নিরাপত্তা বলয় ভেদ করে তালিবানী সন্ত্রাসবাদীদের ঢুকে পড়া এই প্রথম। পাকিস্তানে নিরাপত্তাব্যবস্থায় যে দুর্বলতা আছে তা আবার প্রমাণিত হলো। এখন সংশয় প্রকাশ করা হচ্ছে এর পিছনে ঘরের শত্রু বিভীষণেরা নেই তো?

পাকিস্তানের শত্রু যে পাকিস্তানের মধ্যে আছে তা বলাই বাহুল্য। এবার নিয়ে বেশ কয়েকবার তার প্রমাণও মিলেছে। এখন প্রশ্ন উঠবে, পাক সেনাবাহিনী কেন তাদের শৈথিল্য দূর করছে না? কেন তাঁরা শিক্ষা নিচ্ছে না? ক’দিন আগে পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে কাকুল মিলিটারি একাডেমিতে ভাষণ দিতে গিয়ে পাক সেনাপ্রধান আশফাক পারভেজ কায়ানি বলেছেন, দেশের নিজের স্বার্থেই সন্ত্রাসবাদী ও জঙ্গীদের বিরুদ্ধে লড়াই জরুরী। কায়ানি যা উপলব্ধি করেছেন সেই অনুযায়ী সেনাবাহিনীকে কি পরিচালিত করতে পারবেন? পাক সেনাবাহিনীতে সন্ত্রাসবাদীদের প্রভাব আছে বলে অভিযোগ আছে। ২০১১ সালের মে মাসে পি এন এস মেহরান ঘাঁটিতে সন্ত্রাসবাদী হানার পর পাকিস্তানের এক সাংবাদিক পাক নৌবাহিনীর সঙ্গে সন্ত্রাসবাদীদের ব্যাপক যোগাযোগের কথা ফাঁস করে দিয়েছিলো। শেষপর্যন্ত তাঁকে তাঁর ‘অপরাধের’ মাসুল হিসাবে প্রাণ দিতে হয়। পাক সাংবাদিককে খুন করার জন্য পাকিস্তানের গণমাধ্যম খোলাখুলিভাবে পাক সামরিক গোয়েন্দাবাহিনী (আই এস আই)-কে দোষী বলে চিহ্নিত করেছিল। সাম্প্রতিক ঘটনা থেকে সন্দেহ হয়, সন্ত্রাসবাদীরা ঐ বিমানঘাঁটি সম্পর্কে ভিতর থেকে বিশদ তথ্য পেয়েছিল। পাকিস্তানের একটি সংবাদপত্র কয়েকদিন আগে গোয়েন্দা রিপোর্ট উদ্ধৃত করে লিখেছিল, ১৬ই কিংবা ১৭ই আগস্ট তেহরিক-ই-তালিবান পাক বায়ুসেনার ঘাটিতে হামলা চালাতে পারে। অর্থাৎ পাক গোয়েন্দা সংস্থার কাছে আগাম খবর ছিল। তা সত্ত্বেও এই হামলা কেন ঠেকানো গেল না, সেই প্রশ্ন উঠেছে। আসলে ‘ভালো’ ও ‘খারাপ’ সন্ত্রাসবাদীর তত্ত্বে জড়িয়ে পড়ে পাকিস্তানের আজ এই হাল হয়েছে। পাকিস্তান গঠনের সময়েই বিভিন্ন দিকে যে অস্পষ্টতা ছিল তা আজ পর্যন্ত দূর হয়নি ফলে গণ্ডগোল আরো বাড়ছে।