ধর্ষণ কাণ্ডে দুষ্কৃতীরা অধরাই

নিজস্ব প্রতিনিধি

কলকাতা, ১৮ই আগস্ট — যাদবপুরে ধর্ষণের ঘটনার তদন্তে শনিবার খুব বেশি এগোতে পারেনি পুলিস। ধর্ষণের মূল অভিযুক্তকে গলফ গার্ডেনের মানুষ পুলিসের হাতে শুক্রবার তুলে দিয়েছিলেন। গত রাতে ধর্ষণকাণ্ডে অসুস্থ গৃহবধুকে এলাকার মানুষই কলকাতার ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসে চিকিৎসার জন্য। পুলিস শুধু এদিন উপর্যুপরি ধর্ষণের মূল অভিযুক্ত শরিফ আলি মোল্লাকে আলিপুর আদালতে পেশ করেছে। পুলিস আদালতে ঐ মহিলার ‘ইনজিওরি রিপোর্ট’—এর সঙ্গে পেশ করেছে ধর্ষণের ঘটনার ডাক্তারি কাগজ। তদন্তকারী আধিকারিকরা দাবি করছেন, ঐ মহিলার দেহে ধর্ষণজনিত অত্যাচারের চিহ্ন তেমন করে পাওয়া যায়নি। সেই সঙ্গে আরো যে বিষয়টি নিয়ে পুলিস আরো ধন্দে পড়েছে তা হলো ঐ মহিলা আর মূল অভিযুক্তকে যে ঘরটি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে তা ছিল বাইরে থেকে তালা দেওয়া।

পুলিস প্রাথমিক অভিযোগের ভিত্তিতে অবশ্য বিষয়টি ৩৭৬, ২জি ধারায় উপর্যুপরি ধর্ষণ বলে মামলা করেছে। তদন্তকারী আধিকারিক আদালতকে শনিবার গোটা বিষয়টি জানানোর পর বিচারক অভিযুক্ত শরিফ আলি মোল্লাকে ২৭শে আগস্ট পর্যন্ত পুলিসী হেফাজতে রাখারই নির্দেশ দিয়েছেন। ঘটনায় আর কারা জড়িত তা দ্রুত খোঁজার নির্দেশও দিয়েছেন দায়রা বিচারক। কিন্তু উল্লেখযোগ্য দিক হলো অভিযোগকারীর বয়ান আর যাদবপুর থানার তদন্তকারীদের বক্তব্যের সঙ্গে মিলছে না।

বছর ছাব্বিশের ঐ ধর্ষিতা মহিলা পুলিশকে জানিয়েছেন, স্বামী বাইরে থাকায় অসুস্থ মেয়ের জন্য ওষুধ কিনতে বড় রাস্তায় আসতেই ঐ শরিফ আলি মোল্লা তাঁকে জোর করে নিয়ে যায় ফাঁকা মাঠের দিকে। সেখানে একটি বড় আবাসন তৈরির জন্য ফাঁকা জমি রয়েছে। সেখানে নিরাপত্তা রক্ষীদের জন্য তৈরি একটি ছোট ঘরে নিয়ে তাঁকে তোলা হয়। ঘরটির বাইরে লেখা রয়েছে রাধা বিল্ডার্স। সেখানে আগে থেকেই জনা পাঁচেকে ছেলে উপস্থিত ছিল। তাদের মধ্যে দুইজন তাঁকে উপর্যুপরি ধর্ষণ করার সময়ই তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। এরপরে তাঁকে উদ্ধার করে পাড়ার লোকজন। বাইরে তালা থাকলেও স্থানীয় মানুষদের অভিমত, উপর্যুপরি ধর্ষণের পর কোন কারণে শরিফ আর ঐ মহিলাকে হয়তো ঘরে রেখে বাইরে থেকে তালা মেরে বাকিরা পালিয়ে যায়। তবে পুলিস বিষয়টিকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করলেও ঘটনাটি সম্পর্কে স্থানীয় মানুষের ধারণা এবং ঐ মহিলা পুলিশকে যা বলেছেন তার মধ্যে মিল রয়েছে।

যাদবপুর থানার তদন্তে শনিবার সকাল থেকে তদারকি করতে দেখা গেছে কলকাতা পুলিসের ডেপুটি কমিশনার (সাউথ সুবার্বান) সুজয় চন্দকে। তিনি জানান, মহিলাকে যে ঘরে নিয়ে ধর্ষণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে সেই এলাকা থেকে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা নমুনা সংগ্রহ করেছেন। হরি প্রসাদ দত্ত লেন সংলগ্ন প্রিন্স গোলাম শা রোডের ঘটনাস্থলটি একটি নির্মীয়মাণ আবাসনের জমি বলে জানা গেছে। যে ঘরটিতে গৃহবধূকে নিয়ে গিয়ে অত্যাচার করা হয়েছে বলে অভিযোগ সেটির বাইরে লেখা রয়েছে ‘রাধা বিল্ডার্স’। এই ঘর খুলে সকালেই পুলিস নানা ধরনের নমুনা সংগ্রহ করেছে। এখানে মিলেছে ধর্ষিতা মহিলা পোশাকের অংশবিশেষ, চুলের বাহারি গার্ডারসহ এক পাটি চটি। ঘরের ভিতর নানা ধরনের শক্তি বর্ধক ক্যাপসুলের প্যাকেট মিলেছে বলে জানিয়েছেন তদন্তকারী অফিসাররা। ঐ ঘরের পাশের ঘেরা জমিতে পাওয়া গেছে বিভিন্ন ধরনের মদের বোতল।

এদিকে, গলফ গার্ডেনের ঘটনায় বিভিন্ন মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। মহিলাদের ওপর অপরাধের ঘটনা যেভাবে বেড়েই চলছে তাতে উদ্বিগ্ন সকলেই। বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অনেকেই প্রশাসনের উদাসীনতাকে দায়ী করছেন। শনিবার দুপুরে পশ্চিমবঙ্গ গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতির প্রতিনিধিরা গলফ গার্ডেনের ধর্ষিতা মহিলাকে দেখতে ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজে যান। তাঁর সঙ্গে কথা বলেন। শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন ঐ মহিলা। এরপরে প্রতিনিধিদল যায় যাদবপুর থানায়। পশ্চিমবঙ্গ গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতির রাজ্য সম্পাদিকা মিনতি ঘোষের নেতৃত্বে ঐ প্রতিনিধিদল যাদবপুর থানায় ডেপুটেশন দেয়। ঐ দলে ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতির কলকাতা জেলার সম্পাদিকা লক্ষ্মীমণি ব্যানার্জি, কুমকুম চক্রবর্তী, অর্চনা ভট্টাচার্য, ছবি চ্যাটার্জি, দীপা রায় প্রমুখ। বিক্ষোভও দেখানো হয়।

রাজ্য সরকারে থেকেও শাসকদলের অন্যতম শরিক কংগ্রেসের তরফেও উপর্যুপরি ধর্ষণের ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি প্রদীপ ভট্টাচার্য বলেছেন, বর্তমানে যে সব ঘটনা ঘটছে তা উদ্বেগজনক। কলকাতায় মহিলাদের সম্মান বেশি রক্ষিত হয় বলে দেশে যা প্রচার ছিল সেই সুনাম ক্রমশ নষ্ট হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন রাজ্য মহিলা কমিশনের চেয়ারম্যান সুনন্দা মুখার্জি। তিনি স্থানীয় মানুষ ও পুলিসের তৎপরতার প্রশংসা করলেও রাজ্যে বাড়তে থাকা মহিলাদের ওপর হিংসার তীব্র নিন্দা করেছেন। সাহিত্যিক আবুল বাশার জানিয়েছেন, যে সমাজে মহিলাদের নিরাপত্তা নেই সেটাকে সভ্য সমাজ বলা যায় না। পরিবর্তিত সময়ে কল্লোলিনী কলকাতায় যে হারে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে চলেছে তাতে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।