মুখ্যমন্ত্রী মুখ খুলুন

যদি প্রশ্ন করা হয় গত ১৫ মাসে মা-মাটি-মানুষের সরকারের জমানায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ঘটনা কোনটি? উত্তরে যদি কেউ বলেন মহিলা মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বে পরিচালিত এই সরকারের আমলে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো নারীদের বিরুদ্ধে অপরাধ, বিশেষ করে নারী ধর্ষণের ঘটনা রাজ্যজুড়ে রেকর্ড হারে বেড়ে যাওয়া, তবে মুখ্যমন্ত্রী বা তাঁর দলের রোষানলে পড়া ছাড়া তার গত্যন্তর নেই। যে বিষয়ের সঙ্গে মহিলাদের মান-সম্ভ্রম-মর্যাদা সরাসরি জড়িত সে বিষয়টি এইভাবে উত্থাপিত হওয়া হয়তো সমীচীন নয়। কিন্তু মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধের ঘটনা বেপরোয়াভাবে বেড়ে যাওয়া এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের নিষ্ক্রিয়তা, উদাসীনতা ও নিষ্কর্মা মনোভাব সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। কারণ একটি সমাজ কতটা ভালো ও নিরাপদ তা ঠিক করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হলো মহিলাদের প্রতি ঐ সমাজের আচরণ ও মনোভাব। এই নির্মম নিষ্ঠুর বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আজ ভাববার সময় এসেছে বাংলার‍‌ শিক্ষা ও সংস্কৃতির গৌরব কি অস্তমিত হতে চলেছে? বর্তমান গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা কি অশ্লীলতা ও বর্বরতাকে আবাহন করতে চাইছে? সমাজবিজ্ঞানীরা নিশ্চয়ই এসব নিয়ে চর্চা করবেন। আপাতত আমরা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছি এরাজ্যে মহিলাদের প্রতি সম্ভ্রম তো দূরের কথা তাঁদের ন্যূনতম নিরাপত্তাটুকুও নেই। দুষ্কৃতী-সমাজবিরোধীদের কাছে নিশ্চয়ই কেউ সম্ভ্রম আশা করে না, কিন্তু জনসাধারণের নিরাপত্তার ব্যবস্থা যাদের সুনিশ্চিত করা কর্তব্য সেই পুলিসকর্মীদের কাছেও মহিলাদের সম্মান পদে পদে ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। থানায় অভিযোগ জানাতে গেলে মহিলাদের অনেকক্ষেত্রে অপমানিত হতে হচ্ছে, এমনকি অভিযোগ নথিভুক্ত পর্যন্ত করা হয় না।

ইতোমধ্যে জাতীয় ক্রাইম ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী গোটা দেশের মধ্যে মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধে মমতা ব্যানার্জির রাজ্য শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা অর্জন করেছে। ধর্ষণের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না কেউ। শিশু-কিশোরী থেকে শুরু করে সত্তরোর্ধ্ব মহিলারাও ধর্ষণকারীদের শিকার। বাদ যাচ্ছে না প্রতিবন্ধী, মানসিক ভারসাম্যহীনরাও। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সঙ্ঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হচ্ছে। ধর্ষণের তদন্তে ও অভিযুক্তদের সাজা দেবার ক্ষেত্রে পুলিসের নিস্পৃহতা ও ব্যর্থতা দুষ্কৃতীদের আরও উৎসাহিত করছে। তারা বুঝে গেছে ভয় পাবার কারণ নেই, পুলিস বেশিদূর এগোবে না। আবহাওয়া সংবাদের মতো এখন সংবাদপত্রে নারী নির্যাতনের সংবাদ স্থায়ী জায়গা নিয়ে নিয়েছে। এমন কোনো দিন যাচ্ছে না যেদিন এক বা একাধিক ধর্ষণ ও শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটছে না। এতো কিছুর পরও মুখ্যমন্ত্রী তথা পুলিসমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি নিরুত্তাপ। অনাবশ্যক বিতর্ক সৃষ্টি করে বাজার গরম করতে তিনি সদা ব্যস্ত। প্রথম দিকে ধর্ষণের ঘটনা শোনামাত্র সেগুলি অস্বীকার বা সাজানো বলে মন্তব্য করতেন। কিন্তু তদন্তে সত্য প্রমাণ হতে থাকায় তিনি মুখে কুলুপ এঁটেছেন। মুখ্যমন্ত্রী নিজেই যেখানে ধর্ষণের ঘটনায় নিরুদ্বিগ্ন সেখানে পুলিসের কি দায় ঠেকেছে ধর্ষণকারীদের পেছনে ছুটে ক্লান্ত হবার। অতএব রাজ্য সরকারের পূর্ণ নীরবতায় নারী নির্যাতন বাড়ছে। ঘরে ঘরে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা আর আতঙ্কের মেঘ ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে। প্রতিবাদ-প্রতিরোধে মুখর হলে দুষ্কৃতীদের হাতে প্রাণ সংশয়ের ভয়ে অনেকেই রুখে দাঁড়াতে দ্বিধা করছেন। সাধারণ মানুষ প্রতিবাদের পথে যেতে চাইলেও পুলিস-প্রশাসনের সহযোগিতা সমর্থন মেলে না। উলটে শাসকদলের রোষানলের ভয়। পরিবর্তনের স্লোগান এত দ্রুত এমন নির্মম নিষ্ঠুরভাবে বাস্তব হয়ে উঠবে তা কি কেউ ভেবেছিল?