আজকের দিনে



 

ছবির খাতা

জনতার ব্রিগেড

আরো ছবি

ভিডিও গ্যালারি

Video

শ্রদ্ধাঞ্জলি

আন্তর্জাতিক

কলকাতা

 

শতবর্ষে শ্রদ্ধা

আপনার রায়

গরিবের পাশে থেকেছে বামফ্রন্টই

হ্যাঁ
না
জানি না
 

ই-পেপার

Back Previous Pageমতামত

স্বাস্থ্যও ঠিকায়, ডেঙ্গু সামলাতে কর্পোরেশন তাই ব্যর্থ

নিজস্ব প্রতিনিধি

কলকাতা, ২২শে আগস্ট— সময়টা ২০১০ সালের নভেম্বর। কলকাতা কর্পোরেশনে তৃণমূলী প্রশাসনের মেয়াদ ৬মাস পেরিয়েছে। তখন এই কলকাতা মহানগরে ম্যালেরিয়া সংক্রমণে ৮জন নাগরিকের মৃত্যুর খবর এসেছিল। সেই সময়েই পৌর প্রশাসনের উদাসীনতায় শহরে ৫৩৫জন নাগরিক ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। অথচ ক্ষমতার অলিন্দে বসে থাকা তৃণমূলী প্রশাসকরা সেই সময় নেত্রীর নির্দেশে ব্যস্ত ছিলেন শহরে উৎসব কমিটিগুলিতে দেদার টাকা বিলোতে। তারপর দিনে দিনে দুটো বছর পার হয়েছে। আর স্বাস্থ্য সহ যাবতীয় নাগরিক পরিষেবাই শহর থেকে মুছে যাচ্ছে একে একে।

সর্বশেষ একটা বছরে রাজ্যের প্রশাসনিক ক্ষমতায় এবং কলকাতা কর্পোরেশনের মসনদে যখন একই রাজনৈতিক দলের দাপাদাপি, তখন ক্রমশই এই কলকাতা কর্পোরেশনের সমস্ত পরিষেবা ক্ষেত্রের পরিকাঠামোকে ভেঙেচুরে ঠিকা প্রথার দাঁড়িপাল্লায় চাপানোর কাজ চলছে। তারই অনিবার্য পরিণতিতে এই মুহূর্তে শহরে কয়েক হাজার নাগরিক ডেঙ্গু সংক্রমণের শিকার, যদিও ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু সংক্রমণ নিয়ে কর্পোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য পরিসংখ্যানে কারচুপি চলছেই। আর এই কারচুপি চালাতে গিয়েই শহরে এখন ডেঙ্গু সংক্রমণ নিয়ে রাজ্য সরকারের দেওয়া তথ্যের সঙ্গেও কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না কর্পোরেশনের তথ্যের।

শুধু উত্তর কলকাতাতেই ২নম্বর ওয়ার্ড এলাকায় সাউথ সিঁথি রোড আর কেদারনাথ দাস লেনের ছোট্ট গলির মেরেকেটে শ’দেড়েক নাগরিকের মধ্যেই ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দুই অঙ্ক ছুঁয়েছে। সংশয় থাকলে ৬ এইচ/৩ কেদারনাথ দাস লেন, ২১/এ কেদারনাথ দাস লেন, সাউথ সিঁথি রোডের ৭৬/এ, ৭৬/১, ৭৬/২, ৮৮ ও ১০৩ নম্বর ঠিকানাগুলিতে খোঁজ নিতে পারেন কর্পোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগের পরিদর্শকরা। শুধু উত্তর কলকাতা কেন, দক্ষিণ কলকাতাতেও বিশেষ করে ৯১ নম্বর, ৯২ নম্বর, ১০৭ নম্বর, ১০৫ নম্বর এবং ৯৬ নম্বর ওয়ার্ডেও প্রতিদিন ছড়িয়েছে, ছড়াচ্ছে ডেঙ্গু সংক্রমণ। আর খোদ কর্পোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য বলছে, গত ১৪ই আগস্ট পর্যন্ত কলকাতা মহানগরে নাকি ডেঙ্গু সংক্রমণ ঘটেছে সাকুল্যে এন এস ১-এ ৩০০জন এবং আই জি এম-এ ১৮১জন। কিন্তু রাজ্য সরকারের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে আদৌ মিল নেই কর্পোরেশনের ডেঙ্গু সংক্রান্ত এই তথ্যের।

সমস্যা বাড়ছে কর্পোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগের সদিচ্ছার অভাবেই। কারণ, শহরে বেড়ে চলা ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়া সংক্রমণ মোকাবিলার প্রশ্নে স্রেফ ঠিকাদারির উপর নির্ভরশীলতাই এই মুহূর্তে কলকাতা কর্পোরেশনকে ডোবাচ্ছে। দু’বছর ধরে যে হারে এই কলকাতার স্বাস্থ্য পরিষেবাকে বেহাল করার মতলবে ঠিকা প্রথার ঢালাও প্রয়োগ চলছে, তাতে এই মুহূর্তে কর্পোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগে ৮১জন মেডিক্যাল অফিসার চুক্তির ভিত্তিতে নিযুক্ত। তার ফলে পূর্ণ সময় ও দায়িত্ব নিয়ে এই মেডিক্যাল অফিসাররা শহরে সংক্রমণ প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করছেন না। শুধু তা নয়, এই মুহূর্তে কর্পোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগে ১২৭জন ল্যাব টেকনিসিয়ান চুক্তির ভিত্তিতে নিযুক্ত। ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু সংক্রমণ মোকাবিলায় ভেক্টর কন্ট্রোল বা নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ নেওয়ার বিভাগটিও সটান চলে গেছে ঠিকাদারের হাতে। আর তার সঙ্গেই শহরের মানচিত্র বাড়িয়ে বেহালার লাগোয়া জোকা পঞ্চায়েত অঞ্চলকেও জুড়ে নেওয়া হয়েছে, যা স্বাস্থ্য পরিষেবার বেহাল দশার প্রসার ঘটিয়েছে। তাই দিল্লি, মুম্বাই, চেন্নাইয়ের সঙ্গে উচ্চারিত মহানগর কলকাতায় এখন ন্যূনতম স্বাস্থ্য পরিষেবাটাই উধাও।

আর কলকাতার স্বাস্থ্য পরিষেবার এমন ভাঙা হালের সঙ্গে শহরের জঞ্জাল সাফাইয়ের প্রতিদিনের করুণ চিত্রও যে জড়িত, উঠে আসছে সেই তথ্যও। শহরের নানা জায়গার ভ্যাটগুলি থেকে না কি সকাল দশটার মধ্যেই জঞ্জাল উঠে যাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তব চিত্র কী? পরদিন সকাল দশটাতেও সেই জঞ্জাল যে ভ্যাট থেকে উঠবে, তেমন আশ্বাস মিলছে না কোথাও কোথাও। উত্তর কলকাতায় এ পি সি রোডে খান্না সিনেমার সামনে, এ জে সি বোস রোডের উপর এন্টালি মার্কেটের সামনে, কর্পোরেশনেরই সেন্ট্রাল গ্যারেজের পিছন দিকে, আমহার্স্ট স্ট্রিট এলাকা সহ দক্ষিণ কলকাতার কালীঘাট পার্ক, গল্‌ফ গ্রিন, এলগিন রোড প্রভৃতি নানা জায়গাতেই ভ্যাটগুলির দিকে নজর দিলে সেই দৈন্যদশাই চোখে পড়বে।

কিন্তু কেন শহরের জঞ্জাল অপসারণ নিয়ে এমন চরম অব্যবস্থা? কর্পোরেশনের নিজস্ব যাবতীয় পরিকাঠামোই দিনে দিনে ভেঙে ফেলা হচ্ছে নানা পদ্ধতিতে। এই মুহূর্তে শহরে জঞ্জাল সাফাইয়ের জন্য সাড়ে তিনশো ঠিকাদারি লরি বরাদ্দ রয়েছে। কিন্তু ঠিকাদারি লরিগুলি প্রতিদিন জঞ্জাল তোলা তো দূর অস্ত, ক্রমশই পিছন দিকে হাঁটছে। এই ঠিকাদারদের সুপারভাইস করার বা তাদের কাজে নজরদারি চালনোর মতো পরিকাঠামোও গড়ে তোলা হয়নি। শুধু তা-ই নয়, কর্পোরেশনের গ্যারেজগুলিকে শুকিয়ে মেরে ফেলার চেষ্টায় নেমেছে তৃণমূলী প্রশাসন। কর্পোরেশনের নিজস্ব লরিগুলি অকেজো করার লক্ষ্যেই নিত্য জরুরী যাবতীয় যন্ত্রাংশের সরবরাহ বন্ধ করা হয়েছে সুচতুরভাবে। ঠিকাদারির পক্ষে সাফাই গাওয়ার এক নির্লজ্জ দৃষ্টান্ত উঠে এসেছে সম্প্রতি। মাস তিনেক আগেই বিস্তর টাকা ঢেলে দু’টি বুলডোজার কিনেছে কর্পোরেশন। ধাপা ডাম্পিং গ্রাউন্ডে আবর্জনা বসানোর কাজেই ব্যবহৃত হয় এগুলো। কিন্তু এক একটি ৩ কোটি টাকা মূল্যের এই বুলডোজার এখনও কাজ শুরুই করেনি। ফুল, মালা দিয়ে পুজো করিয়ে এগুলিকে রেখে দেওয়া হয়েছে। কেননা স্থায়ী পৌরকর্মীরা এই বুলডোজার চালাতে পটু হলেও তাঁদের দিয়ে এগুলি চালানো হবে না বলেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঠিকাদারদের স্বার্থবাহী বর্তমান পৌর প্রশাসন। লক্ষ্য, বর্ষা মিটলে এই বুলডোজার চালানো হবে ঠিকাদারদের দিয়ে। শুধু ভ্যাটের জঞ্জালেই নয়, দিনে দিনে ভেঙে পড়া নিকাশি পরিকাঠামোর ভাঙা কার্ভ চ্যানেলেও জল জমে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গুর মশার আঁতুড়ঘর তৈরি হচ্ছে।

কার্যত শহরের নাগরিক পরিষেবা থেকেই হাত গুটিয়ে নিচ্ছে কলকাতার তৃণমূলী পৌর প্রশাসন। আর তাই শহরজুড়ে আজ ডেঙ্গুর ব্যাপক সংক্রমণ, যদিও কলকাতার তৃণমূলী প্রশাসকদের এসবে ভ্রূক্ষেপ নেই বিন্দুমাত্র। কেননা তাঁদেরই নেত্রীর কাছ থেকে ‘ম্যানমেড বন্যা’-র শিক্ষা নিয়ে মাসতিনেক আগে তাঁরা চড়া জলকষ্টে শুকিয়ে যাওয়া নাগরিকদের বলতে শুরু করেছিলেন যে, ‘ম্যানমেড ক্রাইসিস’। এবার হয়তো কিছুদিনের মধ্যে কলকাতার নাগরিকদের শুনতে হবে ‘ম্যানমেড’ ডেঙ্গু সংক্রমণের গল্পও।

মতামত
এই খবরটি সম্পর্কে আপনার মতামত
 

আমাদের এই খবরটি সম্পর্কে আপনার মতামত পেলে বাধিত থাকব। তবে যথাযথ যাচাই না করে ২৪ঘন্টার আগে আপনার মতামত ওয়েবসাইটে দেখা যাবে না।

Top
 
Name
Email
Comment
For verification please enter the security code below