আজকের দিনে



 

ছবির খাতা

জনতার ব্রিগেড

আরো ছবি

ভিডিও গ্যালারি

Video

শ্রদ্ধাঞ্জলি

 

লোকসভা নির্বাচন ২০১৪

আপনার রায়

গরিবের পাশে থেকেছে বামফ্রন্টই

হ্যাঁ
না
জানি না
 

ই-পেপার

Back Previous Pageমতামত

খুচরো ব্যবসায়ে বিদেশী বিনিয়োগের অনুমতি

নিজস্ব প্রতিনিধি

নয়াদিল্লি, ১৪ই সেপ্টেম্বর- উদারনীতির সওয়ালকারীরা, কর্পোরেট মহল অভিযোগ করছিল ইউ পি এ সরকার ‘পক্ষাঘাতে’ ভুগছে। বিদেশী পত্রিকায় কটাক্ষ করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং একজন ‘ট্র্যাজিক বীর’। হঠাৎ জেগে উঠে কেন্দ্রীয় সরকার উদারনীতির যাত্রায় থমকে থাকা একের পর এক বেপরোয়া সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করে দিল।

ডিজেলের চড়া হারে মূল্যবৃদ্ধি, রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী ক্ষোভের মুখেই ২৪ঘন্টার মধ্যে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা সিদ্ধান্ত নিয়েছে বহু ব্র্যান্ডের খুচরো ব্যবসায় ৫১শতাংশ বিদেশী বিনিয়োগের অনুমতি দেওয়া হবে। যার সহজ অর্থ দাঁড়াচ্ছে ওয়ালমার্টের মনোবাসনা পূর্ণ হয়েছে। তারা এবং তাদের মতো খুচরো বাণিজ্যের বহুজাতিক রাঘববোয়াল ভারতের খুচরো ব্যবসায়ে অবাধে ঢুকে পড়বে। একই সঙ্গে এদিনের মন্ত্রিসভার বৈঠকে অসামরিক বিমান পরিবহনে বিদেশী বিমান সংস্থাকে ৪৯শতাংশ বিনিয়োগের অধিকার দেওয়া হয়েছে। টেলিভিশনের সংবাদ চ্যানেল বাদ দিয়ে সম্প্রচার ক্ষেত্রে ৭৪শতাংশ বিদেশী বিনিয়োগের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অয়েল ইন্ডিয়া, নালকো-সহ চার বড় আকারের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার বিলগ্নীকরণের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শুক্রবারের মন্ত্রিসভার বৈঠকে মন্তব্য করেছেন, ‘যদি হারতেই হয় যুদ্ধ করে হারবো।’ তাঁর এই ঘোষিত যুদ্ধ তথাকথিত অর্থনৈতিক সংস্কারের অবশিষ্ট পদক্ষেপ প্রয়োগ করা। গা ঝেড়ে ওঠা প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর মন্ত্রিসভার এই ‘যুদ্ধ’ জনগণের বিরুদ্ধে বলেই এদিন মন্তব্য করেছেন বিরোধীরা। দেশব্যাপী বড় প্রতিবাদের পথে যাচ্ছেন বামপন্থীরা। সমাজবাদী পার্টি, বি জে পি-র মতো দলও আন্দোলনের রাস্তায় যাচ্ছে। শরিক তৃণমূল কংগ্রেস এই সিদ্ধান্তের কড়া বিরোধিতা করবে বলে হুমকি দিয়েছে। অন্যদিকে সংস্কারের এই ‘মহাবিস্ফোরণ’ দেখে কর্পোরেট মহলের উল্লাস ফেটে পড়েছে।

খুচরো বাণিজ্যে একক ব্র্যান্ডে ১০০শতাংশ বিদেশী বিনিয়োগের অনুমতি আগেই ছিল। বিধিনিষেধও ছিল। বিদেশী বহুজাতিকরা চাইছিল বহু পণ্যের খুচরো ব্যবসায়ে বিনিয়োগের অনুমোদন। ঘুরপথে ওয়ালমার্টের মতো সংস্থা ভারতের সহযোগীকে নিয়ে সীমিত মাত্রায় ব্যবসা এখনই করছে। কিন্তু ভারতীয় সহযোগীকে নিয়ে অন্তত সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশীদারিত্বের ব্যবসার অনুমতি দীর্ঘদিন ধরে দাবি করছিল তারা। গত বছরের নভেম্বরে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা ৫১শতাংশ বিদেশী বিনিয়োগের অনুমতির সিদ্ধান্ত নিয়ে সংসদে এসেছিল। প্রবল ধাক্কাও খেয়েছিল। অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের তীব্র বিরোধিতার মুখে সরকার পিছু হঠে, সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়। গত কয়েক মাস ধরে আবার বাণিজ্য মন্ত্রী আনন্দ শর্মার নেতৃত্বে তৎপরতা শুরু হয়। শুক্রবার শর্মা সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘এই সিদ্ধান্তে সকলের সম্মতি না থাকতে পারে, ঐকমত্য আছে। সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত করতে গেলে অনন্তকাল অপেক্ষা করতে হবে।’

একই সঙ্গে একক ব্র্যান্ডে বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও আগের নিয়মকানুন শিথিল করে দেওয়া হয়েছে। শর্ত ছিল ভারতের ক্ষুদ্র ও মাঝারি সংস্থাগুলির কাছ থেকে ৩০শতাংশ কেনাকাটা করতে হবে। এখন তা শিথিল করে বলা হয়েছে তা যদি না করে তবে বিদেশী সংস্থাকে ভারতে একটি উৎপাদন কেন্দ্র খুলতে হবে।

পূর্বের ধাক্কা খাওয়ার অভিজ্ঞতায় সরকার কৌশলও বদলেছে। রাজ্য সরকারগুলির সঙ্গে আলোচনার একটি প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন শর্মা। সেই আলোচনার হাল হকিকৎ বুঝে কেন্দ্রের সিদ্ধান্তে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে একটি নতুন ধারা। এই সিদ্ধান্ত কেন্দ্রের, কিন্তু প্রয়োগ করার অধিকার থাকবে রাজ্যগুলির। যে রাজ্য সরকার চাইবে তাদের রাজ্যে অনুমতি দেবে। যারা চাইবে না, তারা করবে না। এই কৌশলের প্রস্তুতিতে কংগ্রেস-শাসিত রাজ্যগুলির সঙ্গে কথা সেরে রাখা হয়েছে। সরকারী সূত্রে দাবি করা হচ্ছে দিল্লি, মহারাষ্ট্র, আসাম, অন্ধ্র প্রদেশ, রাজস্থান, হরিয়ানা, উত্তরাখণ্ডের রাজ্য সরকার কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত। সবই কংগ্রেসের সরকার। একমাত্র কেরালার কংগ্রেস সরকারের আপাতত আপত্তি রয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস এই সিদ্ধান্তের প্রকাশ্য বিরোধিতা করলেও আরেকটু সময় নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারকেও রাজি করানো যাবে বলে সরকারী সূত্রের ধারণা। তেমনই বি জে পি-র সর্বভারতীয় রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে তাদের রাজ্য সরকারগুলি এই প্রস্তাবে রাজি না হলেও গুজরাটের নরেন্দ্র মোদীর ওপরে ভরসা রাখছে কেন্দ্র।

রাজ্যগুলির স্বাধীনতা থাকছে, এই যুক্তিকে খারিজ করে পর্যবেক্ষকরা অবশ্য বলেছেন, বিদেশী লগ্নি কোম্পানি কিনে নেয়, সংযুক্তিকরণ করে। ঠিক সময়ে তারা এমন এমন কোম্পানি কিনে নেবে যাদের একাধিক রাজ্যে ব্যবসা আছে। ফ্রানচাইজির মাধ্যমেও সব রাজ্যে তারা ঢুকবে। ‘প্রবেশ নিষেধ’ কথার আর কোনো অর্থই থাকবে না। এমনকি ছোট শহর বা বড় গ্রামেও ফ্রানচাইজি খুলতে পারে তারা।

বিদেশী লগ্নি এলে কর্মসংস্থান বাড়বে, এই যুক্তি নস্যাৎ করে পর্যবেক্ষকরা বলেছেন, কিছু লোক কাজ পাবেন। কিন্তু তার বদলে এখন খুচরো ব্যবসায়ের নানা স্তরে কর্মরত প্রচুর মানুষ কাজ হারাতে পারেন। সাধারণভাবে ভারতে অর্থনৈতিক বৃদ্ধিতে পরিষেবার বৃদ্ধিই সবচেয়ে বেশি। তারও মধ্যে সবচেয়ে বেশি খুচরো ব্যবসা। মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ১৪শতাংশই খুচরো বাণিজ্যে। প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ এই ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ এবং আরো প্রায় ৯কোটি পরোক্ষে যুক্ত। দেশে সংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি খুবই কম। অসংগঠিত খুচরো ব্যবসার নানা স্তরে যুক্ত মানুষের বিপুল অংশই বাধ্য হয়ে এই ক্ষেত্র থেকে জীবিকার সংস্থান করছেন।

সংশ্লিষ্ট মহলের অভিমত, কাজ হারানোর দ্বিতীয় প্রক্রিয়াটি আরো মারাত্মক। শুধু খুচরো ব্যবসায়ে সরাসরি যুক্তরাই নয়, উৎপাদন ক্ষেত্রেও কাজ কমতে থাকবে। সবচেয়ে ভালো উদাহরণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই। সেদেশে ওয়াল মার্ট খুচরো বাণিজ্যে পুরোপুরি আধিপত্য করে। ওয়াল মার্ট ১৯৯৫-তে ৬% পণ্য আমদানি করতো, এখন ৬০%-র বেশি আমদানি করে। তার ফলে বহু মার্কিন কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেছে অথবা ওয়াল মার্টকে সরবরাহ করতে গিয়ে তারাও বাইরে থেকে জিনিস তৈরি করে আনছে। কর্মী ছাঁটাই হয়ে গেছে। বড় বড় কোম্পানির ক্ষেত্রেও তা ঘটেছে। স্থানীয় উৎপাদনের বারোটা বাজতে থাকবে।

কৃষকদের উপকারের তত্ত্বও খারিজ করেছেন সমীক্ষকরা। ভারতে সমীক্ষায় প্রমাণিত, সুপারমার্কেট চেন মোটেই ছোট কৃষকের সঙ্গে সরাসরি কারবার করে না। বরং হয় নির্দিষ্ট কিছু খুব বড় কৃষক অথবা পাইকারদের সঙ্গেই তাদের কারবার। বরং ওয়ালমার্টের মতো সংস্থা একবার অবাধে বাণিজ্যের অধিকার পেলে কৃষকরা ক্রমশ পণ্য বিক্রির জন্য এইসব সংস্থার ওপরে নির্ভরশীল হয়ে পড়বেন। কৃষিপণ্যের দাম নির্ধারণের প্রকৃত ক্ষমতা হস্তান্তরিত হবে তাদের কাছে। কৃষিপণ্যের বিপণন, প্রক্রিয়ণ, ফসলের দাম নির্ধারণ, ফসল সংগ্রহ যদি দেশী-বিদেশী বড় পুঁজির হাতেই ছেড়ে দেওয়া হয় তাহলে সরকারের নিয়ন্ত্রণ আরো মার খাবে। কৃষক দারুণ ভাবে মার খাবেন। সেই সূত্রে খাদ্য নিরাপত্তার সর্বনাশ হবে। শুধু কৃষক নন, অ-কৃষক মানুষও বিপদে পড়বেন।

এদিন নয়াদিল্লিতে সি পি আই (এম) পলিট ব্যুরোর সদস্য সীতারাম ইয়েচুরি জানিয়ে দিয়েছেন এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বড় লড়াইয়ে নামবে পার্টি। প্রধানমন্ত্রীর ‘যুদ্ধ’ সংক্রান্ত মন্তব্য নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে ইয়েচুরি বলেন, বিদেশী পুঁজি আর কর্পোরেটদের হয়ে যুদ্ধ না করে দেশের মানুষের স্বার্থরক্ষায় দেশের প্রধানমন্ত্রী যুদ্ধ করলে ভালো হতো। ইয়েচুরি বলেন, খুচরো বাণিজ্যে এই সিদ্ধান্ত কোটি কোটি মানুষের রুটি-রুজিকে বিপন্ন করবে। সংস্কারের যে পথ নিয়েছে কেন্দ্র, তাতে সঙ্কট মোটেই কাটবে না। দেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির কোনো চেষ্টা নেই। ৫লক্ষ কোটি টাকার বেশি ছাড় দেওয়া হয়েছে কর্পোরেট ক্ষেত্রকে।

মতামত
এই খবরটি সম্পর্কে আপনার মতামত
 

আমাদের এই খবরটি সম্পর্কে আপনার মতামত পেলে বাধিত থাকব। তবে যথাযথ যাচাই না করে ২৪ঘন্টার আগে আপনার মতামত ওয়েবসাইটে দেখা যাবে না।

Top
 
Name
Email
Comment
For verification please enter the security code below