প্রত্যাহার, নাহলে ইস্তফা

ঘরে-বাইরে চাপের মধ্যে রয়েছে কংগ্রেস। দ্বিতীয় ইউ পি এ সরকারের সাম্প্রতিক জনবিরোধী সিদ্ধান্তগুলির চরম প্রতিক্রিয়া ঘটেছে জনমানসে। ফলে ইউ পি এ-তে কংগ্রেসের শরিক ও সহযোগীরাও বিরোধিতা শুরু করতে বাধ্য হয়েছে। অপরদিকে দেশজুড়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি মানুষকে সংগঠিত করছে আন্দোলন-সংগ্রামে। এই পরিস্থিতিতে কংগ্রেস নিজেদের রাজনৈতিক দিক থেকে আড়াল করতে নতুন কৌশল নিয়েছে। কংগ্রেস নেতৃত্ব তাদের শাসিত রাজ্যগুলিতে রান্নার গ্যাসে ভরতুকিপ্রাপ্ত সিলিন্ডারের সংখ্যা ৯ পর্যন্ত বৃদ্ধি করার পরামর্শ দিয়েছে। অর্থাৎ ডিজেল এবং রান্নার গ্যাসের দাম বাড়ানোর আন্দোলনকে কৌশলে ঠেকাতে ভরতুকি বাড়ানোর পথে যাচ্ছে কংগ্রেস। কংগ্রেস নেতৃত্বের এই পরামর্শ থেকেই প্রমাণিত হচ্ছে রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডারে ভরতুকি কমিয়ে দেওয়া কতটা অযৌক্তিক। রাজ্য সরকার যদি রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডারে ভরতুকি দিতে পারে, তাহলে কেন্দ্রীয় সরকার তা পারবে না কেন? সাধারণ মানুষের সরাসরি ক্ষোভের হাত থেকে বাঁচতে এবং রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে কংগ্রেস-শাসিত রাজ্যগুলি একাজ করতে চলেছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার ডিজেলের চড়া হারে দাম বৃদ্ধি এবং রান্নার গ্যাসের ভরতুকি কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় থাকছে। বহু পণ্যের খুচরো বাণিজ্যে বিদেশী পুঁজির অনুমোদনের সিদ্ধান্ত থেকেও সরছে না কংগ্রেস। এক্ষেত্রেও রাজ্যের ওপর দায় বা দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে কংগ্রেস। কেন্দ্রীয় সরকার বোঝানোর চেষ্টা করছে, বহুপণ্যের বাণিজ্যে বিদেশী পুঁজির প্রবেশাধিকার স্থির করবে সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকার। কেন্দ্রীয় সরকার নাকি শুধুমাত্র নীতিগত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে বিনিয়োগ সংক্রান্ত গৃহীত নীতি গোটা দেশের ওপর প্রযোজ্য।

এই নীতিগত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। বহুপণ্যের বাণিজ্যে বিদেশী পুঁজির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে জনমত গড়ে তুলেছে বামপন্থীরা। ১৯৯৭ সালে একক ব্র্যা‍‌ন্ডে ৫১ শতাংশ বিদেশী পুঁজি এবং পাইকারি ব্যবসায় ১০০ শতাংশ বিদেশী পুঁজির অনুমোদন দেওয়া হয়। এই নীতি গোটা দেশেই কার্যকর হয়েছে। ২০০২ সালে বি জে পি পরিচালিত এন ডি এ সরকারের আমলে বহুপণ্যে ৫১ শতাংশ বিদেশী পুঁজির অনুমোদনের উদ্যোগ শুরু হয়। কিন্তু বামপন্থীদের বিরোধিতায় এন ডি এ এই নীতি গ্রহণ করতে পারেনি। এন ডি এ-র শরিক তৃণমূল কংগ্রেস কখনই এই নীতির বিরোধিতা করেনি। ২০০৬ সালে ইউ পি এ আবার বিদেশী পুঁজি প্রবেশের অনুমতি দিতে উদ্যোগী হয়। বামপন্থীরা এই উদ্যোগের সর্বাত্মক বিরোধিতা করে। এই খুচরো ব্যবসার অধিকাংশই অসংগঠিত ক্ষেত্রে। ভারতে খুচরো দোকানের সংখ্যা ১ কোটি ৩০ লক্ষ। যেখানে কাজ করেন ৫ কোটি মানুষ। স্বভাবতই সরকারী নীতির ফলে ওয়াল মার্টের মতো সংস্থার হাতের মুঠোয় আসবে দেশের ২৫ লক্ষ কোটি টাকার বিশাল বাজার। ২০১১ সালের নভেম্বরে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিন্তু বামপন্থীরা ছাড়া আর কেউ এর প্রতিবাদ করেনি। তৃণমূল নেত্রীও ছিলেন সম্পূর্ণ নীরব। অধিবেশন চলাকালীন সংসদকে এড়িয়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠের মত না নিয়ে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার চেষ্টা করছে দ্বিতীয় ইউ পি এ সরকার। ডিজেল, কেরোসিন, রান্নার গ্যাসের দামও একইভাবে বারে বারে বৃদ্ধি করেছে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার। বামপন্থীদের ধারাবাহিক আন্দোলনের ফলেই খুচরো বাণিজ্যে বিদেশী পুঁজির বিপদ সম্পর্কে সাধারণ গরিব মানুষ সচেতন হয়েছেন। কেন্দ্রীয় সরকারের এই জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেছে সমাজের কৃষিজীবী অংশ। এই সংগঠিত জনমতকে উপেক্ষা করে কংগ্রেসের নেতৃত্বে ইউ পি এ সরকার কোনোভাবেই এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে পারে না। কেন্দ্রের উচিত এই সিদ্ধান্তগুলি অবিলম্বে প্রত্যাহার করা। প্রত্যাহার না করলে মনমোহন সিংয়ের প্রধানমন্ত্রীর পদে থাকার কোনো অধিকার থাকবে না।