আজকের দিনে



 

ছবির খাতা

জনতার ব্রিগেড

আরো ছবি

ভিডিও গ্যালারি

Video

শ্রদ্ধাঞ্জলি

আন্তর্জাতিক

কলকাতা

 

শতবর্ষে শ্রদ্ধা

আপনার রায়

গরিবের পাশে থেকেছে বামফ্রন্টই

হ্যাঁ
না
জানি না
 

ই-পেপার

Back Previous Pageমতামত

আজকের লড়াই

নীলোৎপল বসু

দেশের রাজনীতিতে হঠাৎ করে উত্তেজনার পারদ চড়ে গেছে অনেকটাই। এটা অনিবার্য ছিল। দ্বিতীয় ইউ পি এ সরকার এবং তার গঠনের প্রকৃতি থেকেই এ ধরনের একটি সম্ভাবনা সমসময়ই ভারতীয় রাজনীতিতে অনুচ্চারে হাজির ছিল। যেহেতু নির্বাচনের পর দেশের নয়া-উদারবাদীদের এবং তাদের বিদেশী পৃষ্ঠপোষকদের শরীরী ভঙ্গিমা তাদের উল্লাসকে ধরে রাখতে পারছিল না; কারণ বামপন্থীদের পিছু হটা তাদের এই নিশ্চয়তা জোগা‍‌চ্ছিল যে, এবার বিগ ব্যাং সংস্কার শুধুই সময়ের অপেক্ষা।

(১)

প্রথম ইউ পি এ সরকারকে যথেষ্ট জ্বালিয়েছিল বামপন্থীরা। এন ডি এ সরকারে চূড়ান্ত দক্ষিণপন্থী নয়া-উদারনীতি এবং তার পরিণতিতে বেসরকারীকরণ, দুর্নীতি, কৃষিতে সরকারী বিনিয়োগ প্রত্যাহার, অগণিত কৃষকের মৃত্যুমিছিল, সাম্প্রদায়িক আগ্রাসন, গুজরাটের সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় সংখ্যালঘুদের গণহত্যা আর অর্থনীতির প্রায় সবক্ষেত্রেই উদারীকরণ—অসহ্য করে তুলেছিল আম-আদমির প্রাত্যহিক জীবনযাপন-জীবিকা। অগণিত সাধারণ মানুষ, আম-আদমি ভোটে পর্যুদস্ত করে দেয় এন ডি এ-কে। মূল স্রোতের কর্পোরেট গণমাধ্যমের ভবিষ্যদ্বাণী ছিল দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়েই ফিরে আসবে বাজপেয়ী সরকার। কিন্তু নতুন ইতিহাস তৈরি করেছিল ভারতবর্ষের কোটি কোটি অজানা-অচেনা মানুষ। পশ্চিমবঙ্গেও পর্যুদস্ত হয়েছিল এন ডি এ; তৃণমূল কংগ্রেসকেও তাদের নেত্রীর একটিমাত্র আসন নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল।

নয়া-উদারবাদী নীতি ও দৈনন্দিন জীবনে তার প্রভাবের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের সচেতন বিদ্রোহ ছিল ঐ নির্বাচনের মূল সশব্দ ইতিবৃত্ত। বামপন্থীরাও সংসদীয় ব্যবস্থার ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি উপস্থিত ছিল সেই ত্রয়োদশ লোকসভায়। ইতিহাসে প্রথমবার দিল্লিতে তৈরি হয়েছিল এমন একটা সরকার, যেটি বামপন্থীদের সমর্থনের উপর নির্ভরশীল। ফলে যা হওয়ার, তাই হয়েছিল। বামপন্থী নেতাদের দাবি— বিলগ্নীকরণমন্ত্রককে গুটিয়ে ফেলতে হবে, সামনে আসার পরেই ধস নেমেছিল শেয়ারবাজারে। আর কর্পোরেট মিডিয়ার গেলো গেলো রব। বামপন্থীরা কিন্তু স্পষ্ট ছিলেন। তাদের সমর্থনের উপর সরকার নির্ভরশীল হলেও, সরকারের চরিত্রে মৌলিক পরিবর্তন ঘটেনি। বামপন্থীদের কোনো মোহও ছিল না। কারণ গোটা দেশে তো তারা নির্ণায়কশক্তি নয়।

বামপন্থীরা একটি প্রশ্নেই অগ্রাধিকার দিয়েছিল। জনমতের প্রতিফলন ঘটাতে হবে সরকার পরিচালনায়। সরকারে যারা যোগ দিলো— আর শাসকজোটে, সেই ইউ পি এ-কে নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক আলোচনা করে একটি ন্যূনতম সাধারণ কর্মসূচী প্রণয়ন করতে হবে। আলাপ-আলোচনার পর এই কমন-মিনিমাম প্রোগ্রাম যখন গৃহীত হলো, তখন বামপন্থীরা স্পষ্ট জানিয়ে দিল যে, এই কর্মসূচীর উপরে ভিত্তি করেই তারা ইউ পি এ সরকারকে সমর্থন করবে। তারা হবে এই কর্মসূচীর সজাগ পাহারাদার।

কোনো কিছুর বিনিময়ে নয়। কারণ ৬১ জনের লোকসভার বামপন্থী সাংসদদের মধ্যে ৫৪ জন নির্বাচিত হয়েছিলেন একইসঙ্গে কংগ্রেস এবং বি জে পি-কে হারিয়ে। দেশের মানুষ চেয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষ সরকার। দেশের মানুষ চেয়েছিল নয়া-উদারবাদী নীতির ভয়ঙ্কর পরিণতি থেকে কিছুটা রিলিফ। মানুষের এই চাহিদাকে মর্যাদা দিতেই বামপন্থীদের এই নতুন ভূমিকা—জনস্বার্থের অতন্দ্র-প্রহরী। কত ঠাট্টা, কত অপমান ছিল সেদিন। কর্পোরেট মিডিয়া প্রতিদিন কটূক্তি বর্ষণে কোনো কার্পণ্য করেনি। আর্থিক ব্যবস্থার উদারীকরণ, লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার বেসরকারীকরণ, নয়া-উদারবাদী বিশ্বায়ন অভিমুখী প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্তই আটকে গিয়েছিল বামপন্থীদের প্রতিরোধে। মানুষের স্মৃতিকে ঝালিয়ে তুলবার জন্য জরুরী— এটা উল্লেখ করা যে, বারে বারে পেট্রোপণ্যের দাম বাড়াতে গিয়ে ধাক্কা খেয়েছিল সরকার। এন ডি এ-র আমলে পেট্রোলিয়ামের দামের ওপর সরকারী নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাহার করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এন ডি এ সরকার। তৃণমূল কংগ্রেস এবং তার নেত্রীও ছিল সেই সিদ্ধান্তের শরিক। কিন্তু প্রয়োগ করা যায়নি। যুক্তিতথ্য হাজির করে বামপন্থীরা দেখিয়েছিল, আমাদের দেশের পেট্রোপণ্যের দাম পৃথিবীর অধিকাংশ দেশের থেকে অনেক বেশি। তার কারণ এখানে সরকার সামঞ্জস্যহীনভাবে এই একটি ক্ষেত্র থেকেই অসম্ভব উচ্চহারে ট্যাক্স সংগ্রহ করে।

একইভাবে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ২০০৫ সালে প্রথম বহু-পণ্যের খুচরো ব্যবসায় বিদেশী প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ নিয়ে আসার প্রস্তাব নিয়ে আসেন। বামপন্থীরা ২০০৬ সালে যুক্তি এবং তথ্য দিয়ে দেখিয়ে দেয় কর্মনাশা এই প্রস্তাব। শুধু খুচরো ব্যবসায় ৪ কোটি রোজগেরে মানুষের জীবিকাই বিপন্ন হবে না, কৃষি এবং ছোট শিল্পে কাজ করেন, এরকম মানুষও বিপন্ন হয়ে পড়বেন ওয়াল মার্ট-ক্যারফোর-টেক্সোর আগ্রাসী উপস্থিতিতে। মনমোহন সিং, কংগ্রেস পিছিয়ে যেতে বাধ্য হয়।

কয়ালখনির নতুন বণ্টননীতিও স্থির হয়েছিল এন ডি এ জমানায় শেষের দিনগুলিতে। আজকের বাংলার মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং সেদিন কয়‌লামন্ত্রী ছিলেন। বামপন্থীদের চাপে কয়লা রাষ্ট্রীয়করণ আইনকে যেহেতু এন ডি এ সরকার পাস করাতে পারেনি, তাই এই চোরাগোপ্তা আক্রমণ। গৌরবজনক লড়াই করেছিলেন কয়লা-শ্রমিকরা। বামপন্থীরা ছিলেন সেই লড়াইয়ের পুরোভাগে। শত চেষ্টাতেও কয়লাখনির বেসরকারীকরণ করা যায়নি। সেটা ছিল পিছনের দরজা দিয়ে কয়লাখনির বেসরকারীকরণের প্রয়াস।

(২)

কাজেই বামপন্থীরা যখন পরমাণু চুক্তি নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনলো যে, ন্যূনতম সাধারণ কর্মসূচী ভেঙে মার্কিন সাম্রাজ্যের সঙ্গে স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ গড়ে তোলা হচ্ছে, তখন সচকিত হয়ে পড়লো আমাদের দেশের নয়া-উদারবাদের পদাতিক সেনারা। মার্কিন মুলুকেও উঠলো গেলো গেলো রব। উইকিলিকসের ফাঁস করে দেওয়া মার্কিন কূটনৈতিক ধারাভাষ্যে তার প্রমাণ স্পষ্ট। পরমাণু চুক্তি ছিল জটিল বিষয়। বামপন্থীরা বোঝাতে পারেননি মানুষকে—আর স্বভাবতই মানুষও বুঝতে পারেননি। কিন্তু বামপন্থীদের কাছে পরমাণু চুক্তি ছিল উপলক্ষ—মূল আশঙ্কার জায়গা ছিল—স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপের ঘনিষ্ঠ আলিঙ্গন দেশের জাতীয় জীবনের কোনো ক্ষেত্রকেই আক্রমণাত্মক হস্তক্ষেপ থেকে নিরাপত্তা দিতে পারবে না। সামরিক-স্ট্র্যাটেজিক-অর্থনৈতিক কোনো ক্ষেত্রই বাদ যাবে না সাম্রাজ্যবাদী গৃধ্নুদের শ্যেনচক্ষু থেকে।

কাজেই আজকে যে ঘটনা ঘটছে— সেই ঘটনাস্রোতের প্রেক্ষাপট রচিত হয়েছিল সেদিনই। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না, আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজির ফাটকাবাজদের চোখে বামপন্থীরা হয়ে উঠলো বিপজ্জনক—চক্ষুশূল। এরও প্রমাণ আছে উইকিলিকস-এর প্রকাশ্যে আনা মার্কিন কূটনীতিকদের বিবরণে।

বামপন্থী মুক্ত হলো ইউ পি এ সরকার। কিন্তু কাকস্য পরিবেদনা! মার্কিন অর্থনীতিতে অগ্ন্যুৎপাত ঘটে গেলো ২০০৮-এই। গোটা লগ্নিপুঁজির দুনিয়ায় দাবানল। ডেঙ্গু হ্যামারেজিক ফিভার দ্রুতগতিতে সংক্রমণের মতো আক্রান্ত হলো গোটা ইউরোপে। ক্রেমলিনের চূড়া থেকে নেমে-আসা লালপতাকা যে জয়োল্লাস সৃষ্টি করেছিল— আর উচ্চকিত হয়েছিল যে উদ্ধত ঘোষণা— ‘পুঁজিবাদই ইতিহাসের শেষ অধ্যায়’— তা চাপা পড়ে গেছে বর্তমানের আর্তনাদে। ডাভোসে পৃথিবীর তাবড় লগ্নিপুঁজির মাতব্বররা অনিশ্চয়তায় ম্লান—ডাভোসে তাদের আলোচনা-পুঁজিবাদের ভবিষ্যৎ কী?

বামপন্থী-ইউ পি এ-র আনন্দ মাঠে মারা গেলো। ২০০৯ সালে গড়ে-ওঠা বামপন্থীহীন মন্ত্রিসভার জনপ্রিয়তার শীর্ষ শিখরে মনমোহন সিং আর নির্বাচনে ভূপতিত বামপন্থীরা। কিন্তু সরকার অভিমুখহীনতায় ভুগছে। দক্ষিণপন্থীরা বললেন, সরকার পক্ষাঘাতগ্রস্ত। সংস্কারের কর্মসূচী অতলস্পর্শী গহ্বরে।

কোনো মহৎ মনীষী বলেছিলেন— যারা ইতিহাসের শিক্ষা নিতে অপারগ, তারাই হয়ে ওঠে ইতিহাসের নির্মম শিকার। প্রশ্নটা ব্যক্তি মনমোহন সিং বা নয়া-উদারনীতির নয়, দুনিয়াজোড়া ঘটনা ২০০৮ সালে লগ্নিপুঁজির পৃষ্ঠপোষকতায় চলা বিশ্বায়ন এবং দেশে দেশে অনুসারী নয়া উদারবাদ আজ বিরাট প্রশ্নচিহ্নের সম্মুখীন। মহামন্দার তীব্রতা কমলেও, পৃথিবীর শ্লথগতি কাটেনি। অদৃষ্টের এমনই পরিহাস যে, গালমন্দ করা বামপন্থীদের বিরোধিতায় আটকে যাওয়া আর্থিক উদারীকরণই দেশকে পুঁজিবাদের এই সর্বব্যাপী সঙ্কটের থেকে কিছুটা পরিত্রাণ দিতে পেরেছিল। সঙ্কটের প্রত্যক্ষ ঝাপটা থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল।

ভারতবর্ষে অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে স্বস্তিতে থাকলেও, লগ্নিপুঁজির সঙ্কট ভারতীয় অর্থনীতিকেও পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে তুলেছিল। নতুন উদ্যোগ নেওয়া ছিল অসম্ভব। কারণ বিনিয়োগ নেই। নেই লগ্নিপুঁজির অবাধ যাতায়াত। মনে করা হয়েছিল, আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদে—চীনের সাথে ভারতও অক্সিজেন জোগাবে। কিন্তু তা হয়নি। ভারতের অর্থনীতিও শ্লথগতি। উৎপাদন নিম্নমুখী, টাকার দাম পড়েছে, রপ্তানিও বাড়ছে না, কর্মসংস্থানেও টান আর সবচেয়ে মারাত্মক জিনিসপত্রের দাম অগ্নিমূল্য। খাবি খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। আর গায়ে জ্বালা ধরিয়ে দিচ্ছে কেলেঙ্কারির ক্লেদাক্ত ইতিবৃত্ত। কর্পোরেট প্রেমে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ জলের দরে বেচে দেওয়ার গা-ঘিনঘিন করা বাস্তবতা। লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা যা আসার কথা সরকারের ঘরে— যা দিয়ে খোলা যেতো হাজার হাজার প্রাইমারি স্কুল— প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র, তা চলে গেছে রাজ‍‌নৈতিক নেতা-আমলা-কর্পোরেটদের শক্তিশালী চক্রের প্রভাবে। হয়তো গোপন সুইস ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে।

(৩)

এটাই আজকের রাজনৈতিক সঙ্কটের পটভূমি। বামপন্থীরা দাবি করছিলেন মূল্যবৃদ্ধিতে লাগাম পরাতে, খাদ্য-নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে, রেশন ব্যবস্থাকে সর্বজনীন করতে। কিন্তু কিছুই হয়নি। কারণ গরিব-গুর্বোদের জন্য সরকারী পয়সা দেওয়াটা তো ভরতুকি। দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই সংস্কার। তেলা মাথায় তেল দিতে হবে। কর-ছাড় দিতে হবে কর্পোরেটদের। দেওয়াও হয়েছে এই বাজেটেই। ৫ লক্ষ ১১ হাজার কোটি টাকা। তাহলে টাকা আসবে কোথা থেকে? পেট্রোপণ্য সহজ ঠাঁই। কী এসে যায়? কৃষক ব্যবহার করে ডিজেল-সার। জন-পরিবহনে লাগে ডিজেল। দাম বাড়ালে, কর বাড়ালে মানুষের হাত পুড়ে যাবে। কুছ পরোয়া নেই। ১ লক্ষ ৮০ হাজার কোটি টাকা আয় হয় পেট্রোপণ্যের ট্যাক্স থেকে। আর ভরতুকি— তাও কমিয়ে দাও বাজেটে। মাত্র ৪৫ হাজার কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় সরকারের কর থেকে আয়ের শতকরা ২০ ভাগই আসে এখান থেকে। আর রাজ্যগুলোর ১০ ভাগ। কিন্তু তাও এখান থেকেই টাকা তুলতে হবে। তাই ডিজেলের দামও বাড়বে ৫টাকা, রান্নার গ্যাস ৬ টার বেশি সিলিন্ডার কিনতে হবে সাড়ে সাতশো টাকা দিয়ে।

শুধু রামে রক্ষা নাই সুগ্রীব দোসর! এই সময়টাই বেছে নিতে হবে খুচরো ব্যবসায় বিদেশী বিনিয়োগকে খুলে দেওয়ার জন্য। পার্লামেন্টে অধিকাংশের সমর্থন নেই—কী এসে যায়? বিদেশী বিনিয়োগকে তো লাল গালিচা বিছিয়ে অভ্যর্থনা করা গেলো। প্রধানমন্ত্রী বললেন—‘যদি ডুবি, লড়াই করতে করতেই ডুববো।’ কী উন্মাদনা কর্পোরেট মাধ্যমের দেশে-বিদেশে। কয়েকদিন আগেই যে টাইম ম্যাগাজিন আর ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল বলছিল ফেল করা ছাত্র—দুর্বল, তাদের মুখেই জয়জয়কার।

(৪)

কিন্তু মানুষ কেন মেনে নেবেন? আর এটা তো কোনো জটিল বিষয় নয়। সরাসরি তাদের পেটে লাথি। চারিদিকে বিদ্রোহের আবহাওয়া। রক্তে রক্তে আঁকা প্রচ্ছদপট লিখছে ধর্মঘট, লিখেছে। সরকারের সঙ্গে জনস্বার্থের এই ব্যবধান এতটাই, যে সংঘাত অনিবার্য ছিল। জনরোষের এই ধাক্কা যে সরকারের অভ্যন্তরকে নাড়িয়ে দেবে, এটাই তো স্বাভাবিক। পেট্রোপণ্যের দাম, খুচরো ব্যবসায় বিদেশী বিনিয়োগ নিয়ে লড়াই চলছে গত দেড় দশক ধরে। নয়া উদারবাদের সূতিকাগারে যে দুর্নীতি কেলেঙ্কারির পূতিগন্ধ, তার বিরুদ্ধেও লড়াই চলছে বহুদিন। মনমোহন সিংয়ের সরকার মানুষের ক্ষোভের ধিকধিক করা আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছে। ফলে মানুষ রাজপথে।

(৫)

আর রইলো পশ্চিমবঙ্গ। দেশেও অনেকে বলছে—তৃণমূল নেত্রী বামপন্থী হয়ে গেছেন। সত্যিকারের ব্যাঘ্রশাবক। সত্যি কি তার অন্য কোনো রাস্তা ছিল? সরকারের যে জনবিচ্ছিন্নতা—জনবিরোধী আগ্রাসনের মুখে তা আরও প্রকট হয়ে গেছে। আর পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট ভোটে হেরে যেতে পারে, কিন্তু পরাধীনতার সময় থেকে তিল তিল করে গড়ে-ওঠা যে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী চেতনা, সামন্তবাদের বিরুদ্ধে জমি দখলের লড়াই—শ্রমিক-কর্মচারী, ছাত্র-যুবদের ন্যায়সঙ্গত দাবিতে বুকের রক্ত উজাড় করে দেওয়া সেইসব কি অর্থহীন? ৩৪ বছর পর একটি ভোটের ফলাফলে কি পুরো ইতিহাসটাকেই মুছে ফেলা যাবে?

তাই কোনো উপায় ছিল না। তাই তৃণমূলকে, তার নেত্রীকে সরকারের থেকে আলাদা হতে হয়েছে। কিন্তু আলাদা হলেই কি বামপন্থী হওয়া যায়? দিল্লির সরকার অমানবিক। কিন্তু সেই সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলবেন শুধু নেত্রী, তার দল— আর জীবন-জীবিকা বিপন্ন গরিব-গুর্বোরা তাঁদের অধিকার নেই প্রতিবাদ জানানোর? ধর্মঘট করার? এটাই কি বামপন্থা?

না, এটা বামপন্থা নয়। কখনও হতেই পারে না। বামপন্থা রচিত হয় মাঠে-ময়দানে, কলে-কারখানায়, জনতার মুখরিত সখ্যে। ধর্মঘটে, ব্যারিকেডে। এই উত্তরাধিকার পশ্চিমবাংলার মানুষ কিছুতেই ছেড়ে দেবেন না। কর্পোরেট গণমাধ্যম সরকার থেকে পশ্চাদপসরণকে যতই বামপন্থা বলে প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করুক না কেন, ইতিহাস যুক্তিবোধ আমাদের এটাই শিখিয়েছে।

মতামত
এই খবরটি সম্পর্কে আপনার মতামত
 

আমাদের এই খবরটি সম্পর্কে আপনার মতামত পেলে বাধিত থাকব। তবে যথাযথ যাচাই না করে ২৪ঘন্টার আগে আপনার মতামত ওয়েবসাইটে দেখা যাবে না।

Top
 
Name
Email
Comment
For verification please enter the security code below