ভারতজুড়ে ধর্মঘটেই কড়া বার্তা কেন্দ্রকে

নিজস্ব প্রতিনিধি

নয়াদিল্লি, ২০শে সেপ্টেম্বর- বার্তা স্পষ্টই। হয় জনগণের ওপরে বোঝা চাপানোর এবং দেশের অর্থনীতির পক্ষে বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করো, অথবা সরকার থেকে চলে যাবার জন্য প্রস্তুত হও। বৃহস্পতিবার দেশব্যাপী তুমুল প্রতিবাদের তরঙ্গে এই বার্তাই গেল মনমোহন সিংয়ের সরকারের কাছে। মনমোহন সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলিকে অভিহিত করা হয়েছিল তথাকথিত সংস্কারের মহাবিস্ফোরণ বা ‘বিগ ব্যাং রিফর্মস’ বলে। এদিন প্রতিবাদের মহাবিস্ফোরণ দেখল কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারিকা।

ধর্মঘট, হরতাল আইন অমান্য-সহ প্রতিবাদের ডাক ছিল বামপন্থীরা-সহ আট দলের। ভারত বন্‌ধের ডাক ছিলো এন ডি এ-রও। একের পর এক রাজ্যে ধর্মঘট হয়েছে সর্বাত্মক। কংগ্রেস শাসিত রাজ্যেও ধর্মঘট এবং বিক্ষোভের তীব্রতা ছিলো নজরকাড়া। এবং এও দেখা গেছে বামপন্থীরা-সহ ওই আট দলের কর্মীরাই ছিলেন সামনের সারিতে। রাজধানীতে আট দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ আইন অমান্য করে গ্রেপ্তার হয়েছেন। সি পি আই (এম) পলিট ব্যুরো এদিন আন্দোলনকে আরো প্রসারিত করার আহ্বান জানিয়েছে।

এদিনের প্রতিবাদের ঢেউয়ে স্বতঃস্ফূর্ততার উপাদান ছিলো লক্ষণীয়। শুধুমাত্র রাজনৈতিক দলগুলিই প্রতিবাদে শামিল হয়নি, ব্যবসায়ীদের সংগঠনগুলি, পরিবহন কর্মীরা বিপুল শক্তিতে তাদের প্রতিবাদ জানিয়েছে।

প্রায় স্তব্ধ হয়ে থাকলো উত্তর প্রদেশ। রাজ্যে ধর্মঘটের ডাক দেয় ক্ষমতাসীন সমাজবাদী পার্টি এবং বামপন্থীরা। মথুরা, বারাণসী, আগ্রা, এলাহাবাদ এবং লক্ষ্ণৌতে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখান সমাজবাদী পার্টির সমর্থকরা। খুচরো ব্যবসায় বিদেশী বিনিয়োগের বিরুদ্ধে স্লোগান তুলে পিকেটিং হয় প্রায় সর্বত্র। রেল অবরোধের ফলের থেমে যায় ট্রেন চলাচল।

কংগ্রেসের বিরুদ্ধে স্লোগান তুলে বিভিন্ন জায়গায় পোড়ানো হয় মনমোহন সিং এবং সোনিয়া গান্ধীর কুশপুতুল। তবে, ধর্মঘটকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ হয়নি কোথাও। রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বি এস পি ধর্মঘটে অংশ না নিলেও তার বিরোধিতাও করেনি। লক্ষ্ণৌ-সহ বেশ কিছু শহরে বিক্ষোভ জানিয়েছে বি জে পি। উত্তর প্রদেশে ধর্মঘটের চেহারা ছিল সর্বাত্মক। দোকান-বাজারও চলেনি। বেশ কিছু এলাকায় মিছিল করেছেন বামপন্থীরাও। বারাণসীর সোনারপুরা এলাকা থেকে সি পি আই (এম)’র ডাকে মিছিল শুরু হয়ে গোধুলিয়া হয়ে তা পৌঁছায় চিত্তরঞ্জন পার্কে। সেখানে সভা হয়। বারাণসীর জনবহুল দশাশ্বমেধ ঘাট সংলগ্ন এলাকা এদিন সুনসান ছিল।

ত্রিপুরা: বামপন্থীদের ডাকে সফল ধর্মঘট সংগঠিত করেই কেন্দ্রের ভ্রান্তনীতির বিরোধিতা করলেন ত্রিপুরার মানুষ। বৃহস্পতিবার রাজ্যে ১২ঘণ্টার ধর্মঘট পালিত হয়। সকাল থেকে রাজ্যের সর্বত্র ধর্মঘটের প্রভাব ছিল স্পষ্ট। রাজধানী আগরতলার সদা ব্যস্ত পথ ছিল শুনশান। সরকারী, বেসরকারী পরিবহন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, দোকান বাজার, অফিস সর্বত্রই ধর্মঘটের প্রভাব দেখা গেছে। বোধজঙ শিল্প তালুকের কোথাও কর্মব্যস্ততা ছিল না। রাজ্যের উত্তর, দক্ষিণ এবং উনকোটি চা বাগানে কাজ হয়নি। রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে ধর্মঘটের সমর্থনে রেল অবরোধ হয়।

তামিলনাডু : তামিলনাডুতে বামপন্থীদের সঙ্গে ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল ডি এম কে। রাজ্যের ছোট ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সংগঠনও ধর্মঘটের ডাক দেয়। রাজ্যের বড় বাজার এলাকা, ব্যবসার বিভিন্ন কেন্দ্র এবং শিল্পাঞ্চলে ব্যাপক সাড়া পড়েছে। সি পি আই (এম) বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ দেখিয়েছে। সি আই টি ইউ এবং এ আই টি ইউ সি বিভিন্ন এলাকায় পিকেটিং করে। কয়েক হাজার কর্মীকে গ্রেপ্তার করে প্রশাসন। অটো শ্রমিকদের বড় অংশ যোগ দিয়েছেন ধর্মঘটে। রাজ্যের প্রায় দু’শো এলাকা থেকে ৫০হাজার বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিস।

রাজ্যের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালনের ডাক দিয়েছিল এস এফ আই। স্কুল-কলেজে ক্লাস হয়নি। ধর্মঘটের সমর্থনে বড় জমায়েত করেছে বিভিন্ন বামপন্থী সংগঠন। রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল ডি এম কে ধর্মঘট সমর্থন করেছে। ডি এম কে কেন্দ্রে কংগ্রেসের শরিক। কিন্তু, দলের প্রধান এবং প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এম করুণানিধি কেন্দ্রের কড়া সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, বিদ্যুতের দামে নাজেহাল মানুষের উপর ফের বোঝা চাপানো হয়েছে। দুধের দাম এবং বাসভাড়া বাড়ানোর জন্য রাজ্যের জয়ললিতা সরকারেরও সমালোচনা করেন তিনি। ধর্মঘট ভাঙতে বিভিন্ন এলাকায় প্রচুর পুলিস মোতায়েন করেন মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতা। মাদুরাই স্টেশনে অবরোধ করার সময়ে সি পি আই (এম) বিধায়ক আর আন্নাদুরাইয়ের সঙ্গেই পার্টিকর্মীদের গ্রেপ্তার করে পুলিস। চেন্নাইয়ের ব্যস্ত টিনগর বা রঙ্গনাথন এলাকা ছিল জনশূন্য। চেন্নাইয়ে সেন্ট্রাল রেল স্টেশন, আন্না রোড ডাকঘর এবং গুইন্ডি জংশনে কেন্দ্রীয়ভাবে জমায়েত করে সি পি আই (এম), সি পি আই এবং ফরওয়ার্ড ব্লক। বিক্ষোভে যোগ দিয়েছে জনতা দল (এস), ডি এম ডি কে, এম ডি এম কে, এম এম কে’র মতো বিভিন্ন দল। কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পুদুচেরিতেও ধর্মঘট ছিল সর্বাত্মক। বন্ধ ছিল দোকান-পাট, ব্যবসা কেন্দ্র।

জম্মু-কাশ্মীর: প্রতিবাদে শামিল হয়েই কেন্দ্রের জনবিরোধী নীতির বিরোধিতা করলেন জম্মু-কাশ্মীরের মানুষ। খুচরো ব্যবসায়ে বিদেশী বিনিয়োগ, ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে বৃহস্পতিবার রাজ্যে প্রতিবাদ দিবসের ডাক দিয়েছিল সি পি আই (এম)। এদিন শ্রীনগরে সি পি আই (এম) ডাকে এক বিশাল মিছিল হয়। শহরের প্রতাপ পার্ক থেকে হওয়া মিছিল থেকে কেন্দ্রের নীতির বিরুদ্ধে স্লোগান ওঠে। মিছিল শুরু আগে সভায় সি পি আই (এম) জম্মু-কাশ্মীর রাজ্য কমিটির সম্পাদক মহম্মদ ইউসুফ তারিগামি জানান, খুচরো ব্যবসায়ে বিদেশী বিনিয়োগের ফলে বহু মানুষ কাজ হারাবেন। জম্মুতেও প্রেস ক্লাবের সামনে থেকে সি পি আই (এম) ডাকে মিছিল হয়। অন্যদিকে, বি জে পি-র ডাকা বন্‌ধের কারণে রাজ্যের বিভিন্ন অংশে জনজীবন ছিল স্তব্ধ।

আসাম: আসামের বিভিন্ন জেলায় আটটি রাজনৈতিক দলের ডাকা ধর্মঘটে জনজীবন প্রভাবিত হয়েছে। গুয়াহাটিতে দোকান বাজার খোলেনি। বন্ধ ছিল স্কুল কলেজ। রাস্তায় কিছু সরকারী বাস থাকলেও ছিল না বেসরকারী যান। পাশাপাশি ব্যাঙ্ক, বাণিজ্য সংস্থা এবং বেসরকারী অফিস ছিল বন্ধ। প্রসঙ্গত, বৃহস্পতিবার আসামে বন্‌ধ ব্যর্থ করতে তৎপর ছিল রাজ্যের কংগ্রেস সরকার। সর্বত্রই সরকারী কর্মীদের বৃহস্পতিবার কাজে যোগ না দিলে বেতন কাটা, ব্রেক অব সার্ভিসসহ একগুচ্ছ শাস্তির হুমকি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈয়ের গাজোয়ারি মনোভাবের কাছে মাথা নত করেননি মানুষ। এদিন বিভিন্ন সরকারী দপ্তরের অবস্থাই ছিল যার প্রমাণ।

অন্ধ্র প্রদেশ: বৃহস্পতিবার হায়দরাবাদে সরকারী বাস ডিপোয় অবরোধ করেন সি পি আই (এম), সি পি আই, টি ডি পি কর্মীরা। আন্দোলনে যোগ দিয়ে গ্রেপ্তার হন সি পি আই (এম)-র নেত্রী পি মধু এবং সি পি আই-র সম্পাদক কে নারায়ণন। শহরের আর টি সি সড়কে পথ অবরোধের সময় বি জে পি নেতা শাহনওয়াজ হুসেন ও ভেঙ্কাইয়া নাইডুকে গ্রেপ্তার করে পুলিস। ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে বন্‌ধের কারণে পরীক্ষা হয়নি।





ওড়িশা: ধর্মঘটের ব্যাপক প্রভাব পড়েছে ওড়িশায়। বামপন্থীদের ডাকে যোগ দিয়েছেন বিভিন্ন অংশের মানুষ। বিক্ষোভে আটকে যায় সড়ক ও ট্রেন চলাচল। রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় যদিও স্থানীয় উৎসবের কারণে ছুটি ছিল। ধর্মঘটের আওতা থেকে এই এলাকাকে বাদ দেওয়া হয়। রাজ্যের সরকারে আসীন বি জে ডি ২০শে’র দেশজুড়ে বিক্ষোভের ডাক দেওয়া দলগুলির অন্যতম। বামপন্থীদের সঙ্গেই কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছে এই দল। তবে, রাজ্যে ধর্মঘটের ডাক দেয়নি বি জে ডি। ধর্মঘটের সমর্থনে ভুবনেশ্বর, কটক, খুরদা রোড, ভদ্রক, বালেশ্বরে রেল লাইনের উপর ধরনা হয়। পুরী, ভুবনেশ্বর, কটকের মতো রাজ্যের প্রধান শহরগুলিতে বাস নামেনি রাস্তায়। দোকান-বাজার, ব্যবসার এলাকা প্রায় বন্ধই ছিল। রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় পৃথকভাবে পথে নামে বি জে পি।

ছত্তিশগড়: ছত্তিশগড়ের বিভিন্ন এলাকায় বামপন্থীদের ডাকে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন মানুষ। রাজ্যের সরকারে ক্ষমতাসীন বি জে পি বন্‌ধের ডাক দেওয়ায় সাধারণভাবেই তার প্রভাব ছিল। ডিজেলের দামবৃদ্ধি বা গ্যাসে ভরতুকি কমানোর পাশাপাশি খুচরো ব্যবসার ক্ষেত্র ওয়াল মার্টের মতো দৈত্যাকার বহুজাতিকের হাতে তুলে দেওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ছিলই। তার সঙ্গেই লাভজনক বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের বিলগ্নীকরণের বিরুদ্ধে বামপন্থীদের ডাকে সরব হয়েছেন বিভিন্ন এলাকার মানুষ। রাজ্যে বামপন্থী দলগুলির নেতারা এক বিবৃতিতে বলেছেন, সারা দেশের সঙ্গে ছত্তিশগড়েও সফল হয়েছে ধর্মঘট। সি পি আই (এম) রাজ্য সম্পাদক এম কে নন্দীসহ পার্টিনেতা ধর্মরাজ মহাপাত্র, সুজিত শর্মা, প্রদীপ গভতে প্রমুখকে গ্রেপ্তার করে পুলিস। ধর্মঘটের সমর্থনে রায়পুর থেকে আটটি জাঠা বের হয় গত ১৮-১৯শে সেপ্টেম্বর। বিভিন্ন এলাকায় হয় বসতি সভা। বৃহস্পতিবার বিক্ষোভে যোগ দেয় সমাজবাদী পার্টিও।

সি পি আই (এম)’র ডাকে বিক্ষোভ সংগঠিত হয়েছে হিমাচল প্রদেশেও। রাজ্য রাজধানী সিমলার ভিকট্রি টানেলে বড় আকারের বিক্ষোভ সভা হয়। বহু মানুষের সঙ্গে বিক্ষোভের পুরোভাগে ছিলেন পার্টির রাজ্য এবং জেলা নেতৃত্ব।

বৃহস্পতিবার বি জে পি-র ডাকা ধর্মঘটে মেঘালয়ের জনজীবন ছিল স্তব্ধ। শিলঙে ব্যাঙ্ক, বাজার, দোকান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলেনি। সরকারী দপ্তরে উপস্থিতি ছিল কম। শহরের বিভিন্ন পথে বি জে পি এবং অন্য রাজনৈতিক দলের তরফে অবরোধ করা হয়। পূর্ব খাসি পাহাড়ে বন্‌ধের সাড়া ছিল। এদিনের ধর্মঘটকে সমর্থন করেছিল ন্যাশনাল পিপলস পার্টি এবং ফেডারেশন অব খাসি জয়ন্তিয়া অ্যান্ড গারো পিপলসের মতো বিরোধী দলও।

এদিন খুচরো ব্যবসায়ে বিদেশী বিনিয়োগের অনুমতিসহ কেন্দ্রের বিভিন্ন জনবিরোধী পদক্ষেপের প্রতিবাদে কেরালার ১৪০টি বিধানসভার কেন্দ্রীয় সরকারী দপ্তরের সামনে এল ডি এফ-র ডাকে মিছিল হয়। বহু মানুষ এই মিছিলে যোগ দেন। ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে এর আগে গত ১৫ই সেপ্টেম্বর কেরালায় ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল এল ডি এফ।