অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে
আন্দোলনে নামছে বামফ্রন্ট

নিজস্ব প্রতিনিধি   ২৮শে আগস্ট , ২০১৩

কলকাতা, ২৭শে আগস্ট—নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের অস্বাভাবিক ও ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে সেপ্টেম্বর মাসের প্রথমার্ধে ব‌্যাপক প্রচার আন্দোলন গড়ে তোলার ডাক দিলো বামফ্রন্ট। আগামী ৯-১৪ই সেপ্টেম্বর রাজ্যের ১৯টি জেলার সর্বত্র শহরে-গ্রামে, হাটে-বাজারে, জনবহুল মোড়ে মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে প্রচার করবে বামফ্রন্টকর্মীরা। এরমধ্যে একদিন ৪-৫ঘণ্টা ধরে অবস্থান-বিক্ষোভ কর্মসূচীও পালন করবেন তাঁরা। মঙ্গলবার এখবর জানালেন বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান এবং সি পি আই (এম) পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির সম্পাদক বিমান বসু। এদিন সকালে মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ ভবনে এবিষয়ে বৈঠকে বসেন রাজ্য বামফ্রন্ট নেতৃবৃন্দ। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দেন বিমান বসু।

এদিন বিমান বসু বলেন, প্রতি বছরই ঈদ এবং পুজোর সময় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়ে। কিন্তু পরে আবার তা কমে যায়। এবারও রমজান মাসের সময় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বেড়েছিল। কিন্তু যা বেড়েছিল, তা আর কমেনি। এমনকি কিছু কিছু দাম আরো বেড়েই চলেছে। শাক-সবজি, তরিতরকারির বাজারও অগ্নিমূল্য। এটা অস্বাভাবিক। বিমান বসু বলেন, বিভিন্ন এলাকায় হাট থেকে পাইকাররা যে দামে জিনিস কিনছে, পরে কয়েক হাত ঘুরে তা যখন খুচরো বিক্রেতাদের কাছ থেকে সাধারণ মানুষ কিনছেন, তখন তাঁদের অনেক বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় অবিলম্বে হস্তক্ষেপ করে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি রোধ করা প্রয়োজন। বিমান বসু জানান, আগামী ৯-১৪ই সেপ্টেম্বর ৬দিন ধরে প্রতিটি জেলায় দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে প্রচার আন্দোলন চলবে। এছাড়া জেলা বামফ্রন্টে আলোচনা করে নির্দিষ্ট একটি দিনে ৪ঘণ্টা অথবা তার বেশি সময় ধরে লাগাতার অবস্থান-বিক্ষোভ সভা করা হবে।



বামফ্রন্টে যোগ দিল বলশেভিক পার্টি

বামফ্রন্টের নতুন শরিক হলো ভারতীয় বলশেভিক পার্টি। এদিন বামফ্রন্টের বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানান বিমান বসু। তিনি বলেন, গত এক বছর ধরেই বলশেভিক পার্টি বামফ্রন্টের বিভিন্ন কর্মসূচীতে অংশ নিয়েছে। বিশেষ করে সাম্রাজ্যবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা-বিরোধী কর্মসূচীতে এই দল যোগ দিয়েছে। এই দলের পক্ষ থেকেও বামফ্রন্টে যোগ দেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছিল। আজ থেকে ভারতীয় বলশেভিক পার্টি বামফ্রন্টের ১১তম শরিক দল হলো।



সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী শান্তি মিছিল

আগামী ১লা সেপ্টেম্বর সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী শান্তি মিছিলের ডাক দিয়েছে বামফ্রন্টসহ রাজ্যের বামপন্থী দলগুলি। এদিন বামফ্রন্টের বৈঠকে এই মিছিলের প্রস্তুতি নিয়েও আলোচনা হয়। বিমান বসু বলেন, দুনিয়াজুড়ে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের প্রতিবাদে, এশীয় মহাসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক আধিপত্য বিস্তারের প্রতিবাদে এবং ভারতে ক্রমবর্ধমান মার্কিন হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে এই মিছিলে মানুষ শামিল হবেন। স্থানীয় ভিত্তিতে অথবা আধিপত্যকামী যুদ্ধের বিরুদ্ধেও এই মিছিলে প্রতিবাদ জানাবেন মানুষ। শান্তি মিছিলে অংশগ্রহণকারী দল ও সংগঠনগুলির পতাকা-ফেস্টুন ছাড়াও বেশ কয়েকটি ট‌্যাবলো থাকবে। ১লা সেপ্টেম্বর দুপুর ১টায় রানী রাসমণি অ‌্যাভিনিউতে জমায়েত হয়ে মিছিল শুরু হবে। মিছিলটি জওহরলাল নেহরু রোড, লেনিন সরণি, মৌলালি হয়ে এ জে সি বোস রোড, এ পি সি রোড, গ‌্যাস স্ট্রিট, রাজা দীনেন্দ্র স্ট্রিট হয়ে দেশবন্ধু পার্কে শেষ হবে। শিলিগুড়িতেও ওইদিন বিকেল ৩টায় বাঘাযতীন পার্ক থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা স্টেডিয়াম পর্যন্ত সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী শান্তি মিছিল হবে। সমস্ত শান্তিকামী শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকে এই মিছিলে শামিল হওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বিমান বসু এদিন বলেন, আমরা কোথায় জমায়েত হয়ে কোন্‌ কোন্‌ রাস্তা ধরে মিছিল নিয়ে যেতে চাই তার আগাম অনুমতি চেয়ে কলকাতা পুলিসের কাছে চিঠি দিয়েছি। পুলিসের পক্ষ থেকে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। ১লা সেপ্টেম্বর রবিবার, ছুটির দিন হওয়ায় আমরা ধরে নিচ্ছি অনুমতি পাওয়া যাবে।



সাম্প্রদায়িকতার বিপদ

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাম্প্রদায়িকতার বিপদ নতুন করে মাথাচাড়া দেওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে রাজ্য বামফ্রন্ট। এদিন বিমান বসু বলেন, বিভিন্ন ঘটনায় আমরা দেখতে পাচ্ছি সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলি আবার নতুন করে মাথাচাড়া দিচ্ছে। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি জায়গায় সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। অযোধ‌্যায় বিশ্ব হিন্দু পরিষদের কর্মসূচীকে ঘিরে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করা হচ্ছে। বিমান বসু বলেন, এই বিশ্ব হিন্দু পরিষদ কারা? এদের পিছনে রয়েছে আর এস এস এবং সর্বোপরি বি জে পি। এরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সারা দেশে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার পরিবেশ সৃষ্টি করতে চাইছে, যা এখনই বন্ধ হওয়া দরকার। বিমান বসু জনগণকে এই বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, রাজ্যের মানুষের মধ্যে যাতে শান্তি ও সম্প্রীতির পরিবেশ বজায় থাকে, ঐক্য ও সংহতি অটুট থাকে, তারজন্য সমস্ত গণতন্ত্রপ্রিয়, সচেতন, শান্তিকামী, শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের কাছে আবেদন জানাচ্ছি। কেউ যেন এই বিপজ্জনক শক্তির শিকার না হয়।



দার্জিলিঙ সমস‌্যা

দার্জিলিঙ নিয়ে যে অচলাবস্থা চলছে, তার অবিলম্বে মীমাংসার দাবি জানিয়েছে বামফ্রন্ট। এদিন বিমান বসু বলেন, পাহাড়ের সমস‌্যা নিয়ে রাজ্য সরকার এক ধরনের মনোভাব নিয়ে চলছে, গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা অন্য ধরনের মনোভাব নিয়ে চলছে। সমস‌্যা থেকেই যাচ্ছে, একটা অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। আমরা বামফ্রন্টের পক্ষ থেকে এই সমস‌্যার অবিলম্বে নিষ্পত্তি করার দাবি জানাচ্ছি। বামফ্রন্ট আগেই বলেছে, জি টি এ চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী তিনটি পক্ষ, কেন্দ্র, রাজ্য ও গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার অবিলম্বে বৈঠক হওয়া জরুরী। আলোচনার মধ্যে দিয়ে একটা বাস্তবসম্মত সমাধান বের করতে হবে। এছাড়া অবিলম্বে সর্বদলীয় বৈঠক করারও দাবি জানিয়েছে বামফ্রন্ট। বিমান বসু বলেন, দার্জিলিঙ শুধু আমাদের রাজ্যেরই নয়, দেশেরও সম্পদ। দার্জিলিঙের মানুষের প্রতি বৈরিতামূলক মনোভাব নিয়ে চলা কখনো উচিত নয়। রাজ্য সরকার দার্জিলিঙ নিয়ে যে অনড় মনোভাব নিয়ে চলছে, তার তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে বৈঠকে। বিমান বসু বলেন, এধরনের মনোভাব থাকা কখনই উচিত না।



ভোটার তালিকা সংশোধন

আগামী ২রা সেপ্টেম্বর থেকে ২৩শে সেপ্টেম্বর রাজ্যে ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ হবে। ওই সময় রাজ্যের ভোটার তালিকায় নতুন নাম সংযোজন, বাতিল ও সংশোধন করা যাবে। এদিন বিমান বসু বলেন, এই সময়ের মধ্যেই ২১শে সেপ্টেম্বর রাজ্যের ১২টি পৌরসভায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনের সময় যে উত্তেজনার পরিবেশ থাকে, সেই সময় এই ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ সম্ভব নয়। এজন্য আমরা বামফ্রন্টের পক্ষ থেকে ওই ১২টি পৌর এলাকায় আগামী ১৯শে সেপ্টেম্বর থেকে ২৪শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নির্বাচনের দু’দিন আগে থেকে ফলপ্রকাশ পর্যন্ত এই সংশোধনের কাজ স্থগিত রাখার দাবি জানাচ্ছি। তার বদলে ওই ১২টি পৌরএলাকায় ২৫শে সেপ্টেম্বর থেকে ৩০শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভোটার তালিকা সংশোধনের সময়সীমা বাড়ানোর দাবি জানাচ্ছি।



রাজনৈতিক নির্যাতিতদের ভাতা পুনরায় চালুর দাবি

তৃণমূল সরকারের পক্ষ থেকে তেভাগা আন্দোলনের সময় থেকে জরুরী অবস্থা পর্যন্ত স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক নির্যাতিতদের যে ভাতা দেওয়ার ব‌্যবস্থা ছিল, তা বাতিল করে দেওয়ার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বামফ্রন্ট। এদিন বিমান বসু বলেন, তেভাগা আন্দোলনসহ অন‌্যান্য আন্দোলনে এবং পরবর্তী সময়ে নকশালপন্থীদের অনেকে কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার পর মূলস্রোতে রয়েছেন, তাঁরা যে রাজনৈতিকভাবে নির্যাতিত হয়েছিলেন, তারজন্য একটা ভাতা দেওয়ার প্রকল্প চালু ছিল। ভাতার পরিমাণ সামান্যই ছিল। কিন্তু এটা আচমকা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিমান বসু বলেন, আমরা বামফ্রন্টের পক্ষ থেকে এর তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং পুনরায় এই ভাতা চালু করার দাবি জানাচ্ছি।

এদিন রাজ্য বিধানসভায় ‘জেল কোড’-এ নতুন ধারা যুক্ত করার লক্ষ্যে যে বিল অনুমোদন করা হয়েছে, তারও প্রতিবাদ জানিয়েছে বামফ্রন্ট। বিমান বসু বলেন, এখন ‘জেল কোড’ যা রয়েছে, আমরা মনে করি তা যথেষ্ট। নতুন ধারা যুক্ত করার কোনো প্রয়োজন নেই।



গণআন্দোলনের শহীদ দিবস

প্রতি বছরের মতো এবারও ৩১শে আগস্ট গণআন্দোলনের শহীদ দিবস পালন করবে বামফ্রন্ট। ১৯৫৯সালের ৩১শে আগস্ট ঐতিহাসিক খাদ্য আন্দোলনে কলকাতার রাজপথে খাদ্যের দাবিতে মিছিলরত ৮০জন বুভুক্ষু নিরীহ মানুষকে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে হত‌্যা করেছিল কংগ্রেস সরকারের পুলিস। আরো বহু মানুষ আহত হয়েছিলেন। মোট নিহতের সংখ‌্যা ১০০ জনেরও বেশি হয়েছিল বলে জানা যায়। এদিন বিমান বসু বলেন, প্রথমদিকে আমরা ৩১শে আগস্ট দিনটিকে খাদ্য আন্দোলনের শহীদ দিবস হিসাবে পালন করতে থাকলেও পরবর্তীকালে বামফ্রন্টের পক্ষ থেকেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, এই দিনটি গণআন্দোলনের শহীদ দিবস হিসাবে পালন করা হবে। সেইভাবে এই দিবস রাজ্যের সর্বত্র পালন করা হয়ে থাকে। ৩১শে আগস্ট সকালে কেন্দ্রীয়ভাবে রাজ্য বামফ্রন্টের পক্ষ থেকে সকাল সাড়ে ১০টায় সুবোধ মল্লিক স্কোয়ারে শহীদবেদীতে মালা দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হবে। ওইদিন বিকাল ৫টায় প্রমোদ দাশগুপ্ত ভবনের প্রেক্ষাগৃহে এই উপলক্ষে জনসভা হবে। জনসভায় বামফ্রন্ট নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখবেন।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement