বিচার বিভাগীয় তদন্ত

পুলিস হেফাজতে সুদীপ্ত গুপ্তের মৃত্যু হয়েছিল গত ২রা এপ্রিল। সেই নির্মম মৃত্যুর পর ৮ই নভেম্বর সুদীপ্ত’র প্রথম জন্মদিন। শত সহস্র ব্যথা বুকে নিয়ে সুদীপ্তর সাথীরা তাঁর জন্মদিন পালন করেছে। সুদীপ্ত জন্মদিন আবার একবার যন্ত্রনা দিয়েছে সন্তানহারা পিতাকে। শুধু তাঁর বন্ধু, সহকর্মী বা পরিবার পরিজনেরাই নয়, আমরা কেউই ভুলতে পারিনি সুদীপ্ত’র জীবনদান। রাজ্যে একটি নির্বাচিত সরকার থাকা সত্ত্বেও পুলিস হেফাজতে এই অমানবিক মৃত্যুর কোনো ন্যায়বিচার হয়নি। ৬ মাস পেরিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও শাস্তি পায়নি এই মৃত্যুর জন্য দায়ী ব্যক্তি তথা পুলিস বিভাগ। মানবাধিকার কমিশন সুদীপ্ত’র মৃত্যুর জন্য পুলিস বিভাগকে দায়ী করে। সরকারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য সুপারিশ করে রাজ্য মানবাধিকার কমিশন। কিন্তু রাজ্য সরকার সেই ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সুপারিশ অগ্রাহ্য করেছে। অবশ্য বর্তমান রাজ্য সরকারের পক্ষে এই মনোভাব দেখানোই স্বাভাবিক। কারণ এই সরকারেরই মুখ্যমন্ত্রী এই মৃত্যুকে বলেছিলেন দুর্ঘটনা। বলেছিলেন, ‘স্মল অ্যান্ড পেটি ম্যাটার।’ কি করে মৃত্যু হলো সুদীপ্তর? সুদীপ্ত মিছিলে পা মিলিয়েছিল কেন? কি চেয়েছিল সুদীপ্ত?

ক্ষমতায় আসার পরেই শাসক দল গায়ের জোরে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ দখল শুরু করে। নির্বাচন হয় নামকাওয়াস্তে। বহিরাগত তৃণমূল দুষ্কৃতীরাই দখল করতে শুরু করে শিক্ষার ক্যাম্পাস। সত্যিকারের নির্বাচনের মুখোমুখি হতে ভয় পেয়েছিল তৃণমূল। এই ক্যাম্পাস আক্রমণে সাধারণ ছাত্রদের কাছ থেকে বাধা পায় তৃণমূল। তাই সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিকভাবে ছাত্র সংসদ নির্বাচন স্থগিত করে দেয় সরকার। ছাত্র সংসদ ছাত্রছাত্রীদের গঠনমূলক কাজের জন্য, অধিকার রক্ষার জন্য নির্বাচিত একটি সংস্থা। গরিব ছাত্রদের সাহায্য, পড়াশোনা, পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা, কলেজের পরিবেশ রক্ষা, লাইব্রেরি উন্নয়ন, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চা এসবই ছাত্র সংসদের কাজ। এই সঙ্গে ছাত্র সংসদের মধ্য দিয়ে ‍‌দেশের ভবিষ্যৎ নাগরিক তার গণতান্ত্রিক চেতনাকে বিকশিত করতে পারে। একজন ছাত্রের এই মানসিকতার বিকাশ দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার পক্ষে সহায়ক।

সেই ছাত্র সংসদের অধিকার কেড়ে নেওয়াকে মেনে নিতে পারেনি তরুণ ছাত্রনেতা সুদীপ্ত গুপ্ত। শুধু সুদীপ্তই নয় আরো অনেক ছাত্রই সেদিন যোগ দিয়েছিল মিছিলে। ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধের আইনের প্রতিবাদে আইন অমান্য করেছিল সুদীপ্ত ও তার সাথীরা। শাসক দলের নির্দেশে ঐ আইন অমান্য ভাঙতে নিষ্ঠুর হয়ে উঠেছিল পুলিস। শান্তিপূর্ণ ঐ আন্দোলনের ওপর চলেছে অন্যায়ভাবে লাঠিচার্জ। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী কোনো প্রতিবাদ সহ্য করতে পারেন না। তাই তার পুলিসও নির্মম হয়ে উঠেছিল তরতাজা ছাত্রদের প্রতি। জেলে নিয়ে যাওয়ার পথে পুলিস হেফাজতে মৃত্যু হলো সুদীপ্তর। আহত অবস্থায় দীর্ঘক্ষণ চিকিৎসার ব্যবস্থা করলো না পুলিস। মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হলো সুদীপ্তকে। এই চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের কি শাস্তি কেউ পাবে না? অপরাধীরা বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াবে? শাসক দল মনে করেছে সুদীপ্তকে হত্যা করে ছাত্র আন্দোলন স্তব্ধ করে দেবে। শাসক দলের ভুল ভাবনা ভেঙে দেবে এরাজ্যের ছাত্ররা। গণতান্ত্রিক ছাত্র আন্দোলনের ঐতিহ্যবাহী পশ্চিমবঙ্গ সংগ্রামের পথেই তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করবে।

বিচারবিভাগীয় তদন্তের সাহায্য সুদীপ্ত’র মৃত্যুর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে হবে। অবিলম্বে অপরাধীদের শাস্তি দিতে হবে।