এ বি জি’র পর ডি ভি সি?

কাটোয়ায় রাষ্ট্রায়ত্ত এন টি পি সি-র প্রস্তাবিত তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রক্রিয়া অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। এবার বন্ধ হতে চলেছে পুরুলিয়ার রঘুনাথপুরে নির্মীয়মাণ অপর রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ডি ভি সি-র বিদ্যুৎ কেন্দ্র। সৌজন্যে মা মাটি মানুষের সরকারের নিষ্ক্রিয়তা এবং অসহযোগিতা। প্রকল্পের জমি সংক্রান্ত প্রশ্নে রাজ্য সরকার দায় ঝেড়ে ফেলায় এবং শাসক দলের মদতে ও উসকানিতে জমিদাতাদের ক্ষুদ্র একটা অংশ কাজে বাধা সৃষ্টি করায় কাটোয়ায় এন টি পি সি কাজই শুরু করতে পারেনি। আর রঘুনাথপুরে ডি ভি সি প্রথম পর্যায়ের নির্মাণ কাজ শেষ করে ফেলার পর অনেকটা একই কারণে কাজ বন্ধ করে দিয়ে পাশের রাজ্য ঝাড়খণ্ডে চলে যেতে চাইছে। এই দুটি প্রকল্পই পূর্বতন বামফ্রন্ট সরকারের আমলে প্রস্তাবিত ও পরিকল্পিত। রাজ্যের ক্রমবর্ধমান শিল্প বিকাশের কারণে আগামীদিনে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধির সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বামফ্রন্ট প্রকল্প দুটির ছাড়পত্র দিয়েছিল এবং প্রকল্প রূপায়ণে দুই সংস্থাকে সবরকমের সাহায্যও দিয়ে যাচ্ছিল। কাটোয়ায় জমি অধিগ্রহণের কাজ যখন প্রায় নিঞ্ঝাটে শেষ হয়ে আসছিল তখনই মূর্তিমান আতঙ্কের মতো হাজির হয় মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বে তথাকথিত জমি অধিগ্রহণ বিরোধী হিংস্রাশ্রয়ী আন্দোলন। তার ধাক্কা লাগে কাটোয়াতেও। স্থানীয় তৃণমূলীরা দ্বিগুণ উৎসাহে জমিদাতাদের ভুল বুঝিয়ে বিভ্রান্ত করে গোটা প্রক্রিয়াটাই ভেস্তে দেবার ব্যবস্থা। এরপর তৃণমূল ক্ষমতায় এসে ঘোষণা করে কাটোয়ায় জমি অধিগ্রহণে সরকার কোন ভূমিকা পালন করবে না। প্রকল্প করতে হলে এন টি পি সি-কেই জমির মালিকদের কাছ থেকে সরাসরি জমি কিনতে হবে। অর্থাৎ স্থানীয় তৃণমূলী ও দালালদের হাতে তুলে দেওয়া হলো গোটা প্রকল্পের ভবিষ্যৎ। স্থানীয়রা যে যার খেয়াল খুশি ম‍‌তো জমির দাম হাঁকতে শুরু করে এবং চাকরিসহ হাজারও সুযোগ-সুবিধা দাবি করে বসে। এন টি পি সি অনেক চেষ্টা করেও স্থানীয়দের সঙ্গে কোন বোঝাপড়ায় আসতে পারেনি। সরকারী নিষ্ক্রিয়তা ও অসহযোগিতার অভিযোগে শেষে এন টি পি সি-কে প্রকল্প ঠাণ্ডা ঘরে পাঠিয়ে দিতে হলো।

রঘুনাথপুরের অভিজ্ঞতা আরও ভয়ঙ্কর। এই প্রকল্পে ডি ভি সি দুই পর্যায়ে ১২৬০ মেগাওয়াটের ৪টি ইউনিট নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। বামফ্রন্ট প্রয়োজনীয় প্রায় সব জমিই অধিগ্রহণ করে ডি ভি সি-র হাতে তুলে দেয়। সমস্যা ছিল না কোথাও। জমি পেয়ে ডি ভি সি নির্মাণ কাজ শুরু করে দেয়। ইতোমধ্যে প্রথম পর্যায়ের দুটি ইউনিট নির্মাণ কাজ প্রায় শেষ। তার একটি ইউনিটে আগামী জানুয়ারিতেই পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু হবার কথা। নির্মাণ কাজ চলার সময় রাজ্যে সরকার বদল হয়। জলের লাইন ও কয়লার জন্য রেললাইন পাতার জন্য অল্প কয়েক একর জমি তখনও অধিগ্রহণ বাকি। ফলে আটকে যায় সেই কাজ। শাসক দলের মদতে জমিদাতাদের ক্ষুদ্র একটা অংশকে সামনে রেখে শুরু হয় প্রকল্প বিরোধিতার আন্দোলন। সরকারের কাছে বার বার সমস্যার কথা জানিয়েও কোন লাভ হয়নি। জেলাশাসক, মহকুমা শাসক, বিডিও, এমনকি পঞ্চায়েত প্রধানের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা করেও কোন সমাধান মেলেনি। তাই একরকম হতাশ হয়েই ডি ভি সি তাদের দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ ঝাড়খণ্ডের সরিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে। কিন্তু তাতে নিস্তার নেই প্রথম পর্যায়ের দুটি ইউনিট নির্মাণ করেও সেগুলি লাভজনকভাবে চালানো অসম্ভব হয়ে পড়বে। যেখানে অন্য রাজ্য একটা প্রকল্প আনার জন্য মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে সেখানে এরাজ্য দুটি বৃহৎ শিল্প প্রকল্পকে হেলায় বিতাড়িত করছে। মুখ্যমন্ত্রী শিল্প করার জন্য বেসরকারী শিল্পপতিদের রাজকোষ থেকে কোটি কোটি টাকা খরচ করে তোয়াজ-তোষামোদ করছেন, উপহারের ডালি পাঠাচ্ছেন। অথচ আটকে যাচ্ছে শিল্পস্থাপনের কাজ। নিরাপত্তার অভাবে রাজ্য ছেড়েছে হলদিয়া বন্দরের এ বি জি সংস্থা। এবার কি এ বি জি’র পর ডি ভি সি’র পালা?